Collector
নজরুলের গান গেয়ে ভাইরাল সেই ‘দুখু বুবু’র পাশে প্রশাসন | Collector
নজরুলের গান গেয়ে ভাইরাল সেই ‘দুখু বুবু’র পাশে প্রশাসন
Somoy TV

নজরুলের গান গেয়ে ভাইরাল সেই ‘দুখু বুবু’র পাশে প্রশাসন

প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম; যাকে আমরা চিনি দুখু মিয়া নামে। এ যুগে যেন সেই দুখু মিয়াই ফিরে এসেছে ‘দুখু বুবু’ হয়ে, নজরুলের সুরের ঝংকার বুকে নিয়ে। শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, শ্মশান ঘাট, রেল স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও হাটবাজারে ঘুরে গান গেয়ে বেড়ান তিনি।যে কবি সারাজীবন লিখেছেন মেহনতি আর জীর্ণ পোশাকের মানুষের কথা, ঠিক তেমনই উসকোখুসকো চুল আর জীর্ণ পোশাকে সেই কবি নজরুলের গান গেয়ে মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন লাইলী বেগম। কারো কাছে তিনি লাইলী পাগলী, কারো কাছে লাইলী বাউল, আবার কারো কাছে লাইলী খালা হিসেবে পরিচিত। গানই তার ধ্যান, গানই তার জীবন। এই গানকে ভালোবেসেই বহু বছর আগে শিশু সন্তানদের রেখে সংসার ছেড়েছিলেন তিনি। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দি এলাকায় ছোট্ট টিনের ঘরে বসবাস তার ছেলে-মেয়েদের। তবে সেখানে থাকেন না লাইলী। ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ান এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। কোথাও গানের অনুষ্ঠানের খবর পেলেই ছুটে যান সেখানে। কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না তিনি। তাই চাইলেই তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু মন চাইলে মাঝে মাঝে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করে যান। জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (২৫ মে) বিকেলে ফরিদপুর শহরের ময়েজ মঞ্জিলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই নজরুল গীতি পরিবেশন করেন লাইলী বেগম। সেই গান মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হাজারো মানুষ আবেগে লিখেছেন-দুখু মিয়াই যেন ফিরে এসেছে দুখু বুবু লাইলী হয়ে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ওই অনুষ্ঠানে পরনে জীর্ণ শাড়ি, খালি পা। তিনি মাইকের বুম ধরে মনের আনন্দে সাবলীলভাবে খালি গলায় গাইছেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘নয়নভরা জল গো তোমার...। তার গায়কি ও কণ্ঠে মুগ্ধ দেশের নামি-দামি শিল্পী ও সুধীজনরা। অনেকেই তার পোস্টটি শেয়ার করে লিখছেন নানা মুগ্ধতার কথা। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া লোকসংগীত শিল্পী লাইলী বেগমের পাশে দাঁড়িয়েছে ফরিদপুর জেলা প্রশাসন। মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ব্যবহার অনুপযোগী বসতবাড়ি পুনঃনির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম।আরও পড়ুন: উৎসব ফুরোলেই নিস্তব্ধ ত্রিশাল, দুখু মিয়ার দুঃখ কাটেনি আজও বুধবার (২৭ মে) দুপুরে জেলা প্রশাসকের বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লাইলী বেগমের হাতে আর্থিক সহায়তার অর্থ তুলে দেন জেলা প্রশাসক।এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মিন্টু বিশ্বাস, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সোহবর হোসাইন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সুস্মিতা সাহাসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম বলেন, লাইলী বেগম আমাদের জেলার গর্ব। তার কণ্ঠে গ্রামীণ সংস্কৃতির যে আবেগ ও ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে, তা ইতোমধ্যে মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। একজন শিল্পীর জীবনমান উন্নয়নে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, লাইলী বেগমের বসতবাড়িটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বাড়ি পুনঃনির্মাণে সহযোগিতা করা হবে।এসময় জেলা প্রশাসক জানান, লাইলী বেগমের বিষয়টি সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ঈদের পরে যে কোন সময়ে তার জন্য সরকারি ভাবে সহযোগিতা করা হবে। সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত লাইলী বেগম জেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি কখনও ভাবিনি আমার গান এত মানুষের ভালোবাসা পাবে। জেলা প্রশাসন আমার পাশে দাঁড়ানোয় আমি অনেক খুশি। লাইলী বেগম জানান, ছোট বেলা মায়ের হাত ধরেই গান শেখা হয় তার। সে সময় একটি হারমোনিয়ামও কিনে দিয়েছিলেন তার মা। তিনি নৃত্যেও পারদর্শী ছিলেন। খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয় তার। বিয়ের পরও গান গেয়ে যান, তবে কিছুটা বাধাও ছিল তার। এরপর তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে যান। সেখান থেকেই সংসার বিরাগীর পথ বেছে নেন।আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ও নজরুল এক অবিভাজ্য সত্তা: প্রধানমন্ত্রী তবে ২০১৫ সালে স্বামী মারা গেলে ওই দিনেই বাড়িতে ছুটে এসেছিলেন। এরপর থেকে বিভিন্ন গানের আসের ছুটে গিয়ে গান গেয়ে আয় রোজগারও করেন। সে সময় থেকেই পুরোদস্তুর একজন গায়কী হয়ে উঠেন। তবে কখনও মূল্যায়ন পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এমনকি গান গাওয়ায় ছেলেদের কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। লাইলী বেগম বলেন, আমাদেরকে কেউ মূল্যায়ন করে না, আমাদের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমি মূল্য কারও কাছে পেতে চাই না, পাওয়া লাগবেও না। আল্লাহ যদি মূল্য দেয় কিংবা আমার গুরু কৃপাবল হয়। আমি লালনের বড় স্টেজে গান গেয়েছি। আমি কখনও ভাবিনা যে- আমি খুব পারদর্শী একজন গায়ক। শুধু আমি একজন আধ্যাত্মিক মানুষ। গানই আমার জীবন, কেউ কষ্ট দিলে গান ধরে আমি চলে যাই। গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না; কারণ, গানই মানুষের আত্মার খোরাক। গান গাইলে নিজেরও ভাল লাগে, অন্যেরও ভালবাসা পাওয়া যায়। গানের মধ্য দিয়েই আমি চলে যেতে চাই। ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম ছিদ্দিকী বলেন, আমাদের প্রাণের কবি, দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের যে সঙ্গীত একজন হতদরিদ্র লাইলী বেগমের সুরের মূর্ছনায় আমরা অভিভুত হই। আমি আশা করি ফরিদপুরের মানুষ, সরকার এবং সুধীজন তাকে সার্বিক সহযোগিতা করে এই শিল্পীকে আমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানাই। লাইলী বেগম ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দি এলাকার মৃত শেখ ইসলামের প্রথম স্ত্রী। ২০১৫ সালের দিকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার স্বামী। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে বড় ছেলে আপুত মনা পেশায় রং মিস্ত্রি এবং ছোট ছেলে টুটুল শেখ মাংস ব্যবসায়ী। এছাড়া দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও কাজী নজরুল ইসলামের গান গাওয়ার পাশাপাশি নিজেই লিখেছেন ও সুর করেছেন পাঁচটি গান। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত গান নিয়েই বেঁচে থাকতে চান চার সন্তানের জননী লাইলী বেগম।

Go to News Site