Somoy TV
ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে স্বল্প খরচে ঘুরে আসার জন্য আদর্শ একটি গন্তব্য হতে পারে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শহর কুমিল্লা। প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ধর্মীয় স্থাপনা, সবুজ প্রকৃতি ও আধুনিক বিনোদনের অনন্য সমন্বয়ে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন জেলা হিসেবে পরিচিত কুমিল্লা।ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সড়ক ও রেলপথে সহজেই কুমিল্লায় পৌঁছানো যায়। ঢাকা থেকে বাসে জনপ্রতি ভাড়া পড়তে পারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। এছাড়া চট্টগ্রামগামী অধিকাংশ আন্তঃনগর ট্রেন কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। শ্রেণিভেদে ট্রেনের ভাড়া ১৭০ থেকে ৪৬৬ টাকার মধ্যে। বিশেষ করে কোটবাড়ি ও ময়নামতি এলাকার পর্যটন স্পটগুলো একইসঙ্গে ঘুরে দেখা যায় খুব অল্প খরচে। কোটবাড়ি বিশ্বরোড থেকে অটোরিকশা কিংবা স্থানীয় পরিবহনে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যেই বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়া-আসা করা সম্ভব। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী শালবন বৌদ্ধ বিহার শালবন বৌদ্ধ বিহার কুমিল্লার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর একটি। অষ্টম শতকে দেববংশের রাজাদের আমলে নির্মিত এই বিহার একসময় ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শিক্ষা ও সাধনার অন্যতম কেন্দ্র। চারদিকে শালগাছ বেষ্টিত থাকায় এর নাম হয় শালবন বিহার। প্রায় বর্গাকার এই বিহারে রয়েছে ১৫৫টি কক্ষ। খননকাজে এখানে পাওয়া গেছে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, ব্রোঞ্জের মূর্তি, তাম্রলিপি, পোড়ামাটির ফলক ও অসংখ্য প্রত্ননিদর্শন। ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে এটি এক অনন্য আকর্ষণ। ময়নামতি জাদুঘর-প্রাচীন সভ্যতার দলিল শালবন বিহারের পাশেই অবস্থিত ময়নামতি জাদুঘর। ৪২টি গ্যালারি সমৃদ্ধ এ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে প্রাচীন মূর্তি, মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি, পোড়ামাটির ফলক, অলংকার ও মৃৎশিল্পের নিদর্শন। প্রতিদিন অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ইতিহাসের ছোঁয়া নিতে ভিড় করেন। নীরবতা আর শ্রদ্ধার প্রতীক ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের কাছে অবস্থিত এই কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ৭৩৭ জন বীর সৈনিকের স্মৃতি বহন করছে এই স্থানটি। এর চারপাশের সবুজ বাগান এবং পিনপতন নীরবতা দর্শনার্থীদের মনে এক অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। নগর জীবনের প্রশান্তির ঠিকানা ধর্মসাগর কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই বিশাল দীঘি প্রায় আড়াইশো বছর আগে রাজা ধর্মমাণিক্য খনন করান। দীঘির শান্ত জল, পাড়ের সবুজ গাছপালা এবং চমৎকার হাঁটার পথ একে কুমিল্লার ফুসফুসে পরিণত করেছে। এর উত্তর কোণে রয়েছে মনোরম ‘সিটি পার্ক’। ঈদের ছুটিতে এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। ইতিহাসের সাক্ষী শাহ সুজা মসজিদ গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত শাহ সুজা মসজিদ মোগল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো এ মসজিদটি এখনো স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। এর কারুকাজ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব পর্যটকদের আকর্ষণ করে। শান্তির বার্তা ছড়ায় নব শালবন বিহার নব শালবন বিহার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে শান্তি বিহার হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার দৃষ্টিনন্দন সোনালি বুদ্ধমূর্তি, যা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। প্রত্নতত্ত্বের আরেক বিস্ময় ইটাখোলা মুড়া ইটাখোলা মুড়া সপ্তম বা অষ্টম শতকের একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এখানে পাওয়া গেছে বিভিন্ন স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। সবুজে ঘেরা বার্ড বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) শুধু একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় স্থান। বিশাল সবুজ এলাকা, লেক ও শান্ত পরিবেশ পিকনিক কিংবা অবসর কাটানোর জন্য আদর্শ। সূর্যাস্তের মোহনায় রূপবান মুড়া রূপবান মুড়া লোককাহিনির রহিম-রূপবানের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত। টিলার ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী ভিড় করেন। উপমহাদেশের শেষ বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় আনন্দ বিহার আনন্দ বিহার ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। ধারণা করা হয়, এটি ছিল উপমহাদেশের সর্বশেষ বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। রহস্যঘেরা রানি ময়নামতির প্রাসাদ ধারণা করা হয়, চন্দ্র বংশের রাজা মানিক চন্দ্র তার স্ত্রী রানি ময়নামতির জন্য এটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৮৮ সালে খননের মাধ্যমে এর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। নওয়াব ফয়জুন্নেসা জমিদার বাড়ি কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁও এলাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী নবাব ও নারী শিক্ষার অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ১৮৩৪ সালে এখানে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত আছে। পশ্চিমগাঁওয়ে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি প্রাচীন স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। রূপসাগর পার্ক কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি মনোরম ও নিরাপদ বিনোদন কেন্দ্র। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একদম পাশেই অবস্থিত এই পার্কটি এর শান্ত পরিবেশ, বিশাল দিঘি, পরিকল্পিত বাগান এবং সুন্দর আলোকসজ্জার জন্য দারুণ জনপ্রিয়। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। পরিবার নিয়ে আনন্দের ঠিকানা ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক বর্তমানে কুমিল্লার অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র। ওয়াটার পার্ক, থ্রিল রাইড, ডাইনোসর জোন, রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট থাকায় শিশু থেকে বড় সবাই এখানে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। কুমিল্লার অনন্য ঐতিহ্য খাদি ও রসমলাই কুমিল্লার নাম নিলেই যে দুটি জিনিস চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হলো খাদি কাপড় এবং মাতৃভাণ্ডারের রসমলাই। এগুলো কেবল পণ্য নয়, কুমিল্লার শত বছরের সংস্কৃতির অংশ। খাদি বা খদ্দর শিল্প: মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশি আন্দোলনের হাত ধরে কুমিল্লায় খাদি শিল্পের বিকাশ ঘটে। সম্পূর্ণ হাতে বোনা এই সুতি কাপড় তার আরাম ও স্থায়িত্বের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত। চান্দিনা এবং দেবিদ্বারের খাদি শিল্পীদের তৈরি পোশাক কুমিল্লার একটি অন্যতম ব্রান্ড। মাতৃভাণ্ডারের রসমলাই: কুমিল্লায় এসে রসমলাই না খাওয়া মানে ভ্রমণটাই অপূর্ণ থেকে যাওয়া। ১৯৩০ সালের দিকে মনোহরপুরে শুরু হওয়া ‘মাতৃভাণ্ডার’-এর রসমলাই এর স্বাদ অতুলনীয়। ক্ষীরের ছোট ছোট রসালো মিষ্টির এই স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। কীভাবে যাবেন ও থাকবেন? যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ঢাকা থেকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টায় এবং চট্টগ্রাম থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টায় বাসে বা ট্রেনে কুমিল্লা পৌঁছানো সম্ভব। শহরের মনোহরপুর, কান্দিরপাড় বা কোটবাড়ি এলাকায় থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। প্রাচীন সভ্যতার ছোঁয়া পেতে, প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে কিংবা ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন এই প্রাচীন চত্বর থেকে। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুমিল্লা জোনের অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মোস্তফাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঈদের দিন থেকে আমাদের কয়েকটি টিম পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করবে। বিশেষ করে কোটবাড়ি, ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, ধর্মসাগর ও আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার থাকবে।’ এদিকে, কুমিল্লা ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টডিয়ান শাহীন আলম বলেন, ‘কুমিল্লার প্রত্ননিদর্শনগুলো সংরক্ষণ ও পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে নিয়মিত উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’ ঐতিহ্য, ইতিহাস, প্রকৃতি ও বিনোদনের এমন সমন্বয় খুব কম জেলাতেই দেখা যায়। তাই ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে স্বল্প খরচে স্মরণীয় ভ্রমণের জন্য কুমিল্লা হতে পারে যে কারও প্রথম পছন্দ।
Go to News Site