Collector
৪৭ ট্রফির মহাকাব্য, মেসি যেন ভিন্ন কোনো গ্রহের | Collector
৪৭ ট্রফির মহাকাব্য, মেসি যেন ভিন্ন কোনো গ্রহের
Jagonews24

৪৭ ট্রফির মহাকাব্য, মেসি যেন ভিন্ন কোনো গ্রহের

ফুটবল বিশ্বে তাকে বলা হয় ‘দ্য অ্যাটমিক ফ্লি’। পৃথিবীর মাটিতে তার অর্জনগুলো যেন মহাজাগতিক। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি আকাশের দিকে উঁচিয়ে ধরার পর অনেকেই বলেছিলেন, লিওনেল মেসি ফুটবলকে ‘সম্পূর্ণ’ করে ফেলেছেন। কিন্তু গল্পটা সেখানেই থেমে থাকেনি। এখনও চলছে তার পায়ের জাদু, আর সে সঙ্গে চলছে বিতর্ক- মেসি আসলে মানুষ, নাকি ভিন গ্রহের কেউ! বার্সেলোনার হয়ে ১৭টি অবিশ্বাস্য মৌসুমে ৩৪টি শিরোপা জিতেছেন মেসি। এরপর প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) হয়ে টানা দুটি লিগ ওয়ান শিরোপা জয় করেন। পরে ইন্টার মিয়ামিকে এনে দেন তাদের ইতিহাসের প্রথম এমএলএস কাপ। সব মিলিয়ে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার ট্রফির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭টিতে, যা বিশ্ব রেকর্ড। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতেও অর্জনের কমতি নেই। জিতেছেন ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক, ফাইনালিসিমা এবং দুটি কোপা আমেরিকা। তবে তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখর আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। ৩৫ বছর বয়সে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতানোর মূল নায়ক ছিলেন মেসি। মেসিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ড্রিবলার বলা হয়। প্রতিপক্ষকে কাটানোর সময় তার শরীরের সূক্ষ্ম নড়াচড়া, অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ এবং নাটমেগ করার দক্ষতা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শুধু ড্রিবল নয়, পাসিংয়েও তিনি অতুলনীয়। ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ড তার দখলে। গোল করার ক্ষেত্রেও তিনি দুর্দান্ত- বার্সেলোনা ও ইন্টার মিয়ামির হয়ে প্রায় প্রতি ম্যাচেই গড়ে একটি করে গোল করেছেন। বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কারও ব্যালন ডি’অর জিতেছেন রেকর্ড আটবার। মেসিকে নিয়ে কিংবদন্তিদের মন্তব্য ক্রোয়েশিয়ান কিংবদন্তি হ্রিস্টো স্টইকভ বলেন, ‘একসময় বলা হতো আমাকে থামাতে পিস্তল লাগবে। আজ মেসিকে থামাতে মেশিনগান দরকার।’ ইতালিয়ান কিংবদন্তি জিয়ানলুইজি বুফন বলেন, ‘মেসির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার পর আমি তাকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম। নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম, সে আমাদের মতো মানুষ কি না।’ আর্জেন্টাইন তারকা অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া বলেন, ‘তার সঙ্গে বহুবার খেলেছি, তবুও সে যা করে তা আমি এখনও বুঝতে পারি না। সে মানুষ না, এলিয়েন। ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় লিও। আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গর্ব হলো তার সঙ্গে খেলতে পারা।’ ওয়েইন রুনি বলেন, ‘মেসি একটা রসিকতা। আমার চোখে দেখা সবচেয়ে অসাধারণ রসিকতা।’ রোনালদিনহো বলেন, ‘আমি যখন ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকাব, সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি হবে ছোট্ট মেসিকে বেড়ে উঠতে দেখা। সে অবসর নিলে শুধু বার্সেলোনা নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বেরই ১০ নম্বর জার্সি অবসর নেওয়া উচিত।’ হ্যাভিয়ের মাচেরানো বলেন, ‘সে হয়তো মানুষ নয়, তবে ভালো বিষয় হলো মেসি এখনও নিজেকে মানুষই ভাবে।’ মেসিকে নিয়ে কিছু অজানা তথ্য > মেসির নাম রাখা হয়েছিল বিখ্যাত সংগীতশিল্পী লিওনেল রিচির নাম অনুসারে। মেসির মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি রিচির ‘ড্যান্সিং অন দ্য সিলিং’ অ্যালবামের বড় ভক্ত ছিলেন। পরে মিয়ামিতে দুই লিওনেলের দেখা হয়। > ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের ঘাটতিতে ভুগতেন মেসি। ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় ট্রায়াল দিতে গেলে তার উচ্চতা ছিল মাত্র ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। বার্সেলোনার সাবেক ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকে পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সে বল ছোঁয়ার আগেই আমরা ভেবেছিলাম, এই ছেলেকে বাদ দেওয়া হবে; কিন্তু বল ছোঁয়ার পর সব সন্দেহ শেষ হয়ে যায়।’ > মেসিকে দলে নিতে প্রথমে দ্বিধায় ছিল বার্সেলোনা। কারণ, তার চিকিৎসার খরচ ছিল অনেক বেশি। তবে ক্লাবের টেকনিক্যাল ডাইরেক্টর চার্লি রেক্সাচ নিয়ম ভেঙে এক রেস্টুরেন্টে বসে ন্যাপকিনের ওপর লিখেই মেসির সঙ্গে চুক্তি করেন। মেসির বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান * ১৮ বছর ৩৫৮ দিন বয়সে বিশ্বকাপে গোল করে ইতিহাসের সপ্তম সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন মেসি।* আন্তোনিও কারবাহাল, লোথার ম্যাথাউস, রাফা মার্কেজ, আন্দ্রেস গার্দাদো, মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো- এই ছয়জনই কেবল ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন।* পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করা একমাত্র ফুটবলার মেসি।* বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ড পেলের সঙ্গে যৌথভাবে তার- ৬টি।* ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে ২৬তম ম্যাচ খেলে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন। আগের রেকর্ড ছিল লোথার ম্যাথাউসের ২৫ ম্যাচ।* বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি মিনিট খেলার রেকর্ডও তার- ২,৩১৪ মিনিট।* বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন মেসি- ১৯টি।* এক বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল- সব ধাপে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড় তিনি।* বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি যৌথ গোল ও অ্যাসিস্টের রেকর্ডও তার ও পেলের- ২১টি।* আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি- ১৩ গোল।* কিশোর বয়স, বিশের কোঠা ও ত্রিশের কোঠা- তিন দশকেই বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার তিনি।* বিশ্বকাপে রেকর্ড ১১টি ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জিতেছেন।* বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরির রেকর্ডও তার ও ম্যারাডোনার- ৬৭টি।* বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবলের মালিক মেসি।* বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন রেকর্ড দুইবার। মেসির শিরোপা পরিসংখ্যান (৪৭টি) * এফসি বার্সেলোনা: ৩৫টি শিরোপা (যার মধ্যে ১০টি লা লিগা এবং ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ)* প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি): ৩টি শিরোপা (লিগ ওয়ান)* ইন্টার মিয়ামি: ৪টি শিরোপা (লিগস কাপ, এমএলএস সাপোর্টার্স শিল্ড এবং এমএলএস কাপ)* আর্জেন্টিনা জাতীয় দল: ৬টি শিরোপা (ফিফা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং অলিম্পিক গোল্ড) বিশ্বকাপে মেসির যাত্রা ২০০৬ বিশ্বকাপে সর্বপ্রথম বিশ্বকাপে খেলতে নামেন লিওনেল মেসি। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ১৫ মিনিটে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। সেবার মোট ২টি ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় রাউন্ডেও মেক্সিকোর বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন ৮৪তম মিনিটে। যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হারার ম্যাচে তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেললেও গোল পাননি। আবারও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন অসাধারণ। দুর্দান্ত ড্রিবল ও অবিশ্বাস্য গোল করে জেতেন গোল্ডেন বল। তবে ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের মারিও গোৎসের একমাত্র গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর অনেকে ভেবেছিলেন, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন হয়তো আর পূরণ হবে না মেসির। রাগে-ক্ষোভে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। যদিও পরে ফিরে আসেন আবার। কিন্তু ২০২২ সালে ইতিহাস গড়েন মেসি। ৭ গোল করে দুর্দান্ত এক টুর্নামেন্ট শেষ করেন, ফ্রান্সের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় ফাইনাল জেতান আর্জেন্টিনাকে। গোল্ডেন বলের পাশাপাশি এবার হাতে ওঠে বিশ্বকাপ ট্রফিও। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা ৬২ বছর ধরে কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। তবে আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস কমছে না। কোচ লিওনেল স্কালোনি এখনও দায়িত্বে রয়েছেন। গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, রক্ষণে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো তারকারা দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আক্রমণভাগে হুলিয়ান আলভারেজ ও লওতারো মার্টিনেজের সঙ্গে আছেন মেসি নিজে। যদিও অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া অবসর নিয়েছেন, তবে থিয়াগো আলমাদা, নিকো পাজ ও ১৮ বছর বয়সী ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর উত্থান আর্জেন্টিনাকে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। আইএইচএস/

Go to News Site