Jagonews24
ঈদুল আজহার পরিচয় ও তাৎপর্য মুসলমানদের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। এটি কেবল আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; বরং আত্মত্যাগ, তাকওয়া, আনুগত্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান শিক্ষা অর্জনের দিন। ঈদুল আজহা মূলত ত্যাগের উৎসব। এই ত্যাগ কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার, লোভ, হিংসা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষাও এতে নিহিত রয়েছে। মুসলমানরা প্রতি বছর এই দিনে পশু কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রতি নিজেদের আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের প্রতীকী প্রকাশ ঘটায়। ‘কোরবানি’ শব্দটি আরবি ‘কুরবান’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নৈকট্য অর্জন করা। অর্থাৎ, যে আমলের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে, তাকেই কোরবানি বলা হয়। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়। কোরবানির ইতিহাস কোরবানির ইতিহাস মানবজাতির ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এর যুগ থেকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ বা কোরবানির প্রথা চালু ছিল। পবিত্র কোরআনে হজরত আদমের (আ.) দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। হাবিল আন্তরিকতা ও তাকওয়ার সঙ্গে উত্তম পশু কোরবানি করেছিলেন, আর কাবিল কোরবানি করেছিলেন নিম্নমানের শস্য। ফলে আল্লাহ হাবিলের কোরবানি কবুল করেন এবং কাবিলের কোরবানি প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, আল্লাহ কেবল তাকওয়াবান ও আন্তরিক ব্যক্তির আমলই কবুল করেন। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই কবুল করেন।’ কোরআনে এই ঘটনার বর্ণনা থেকে বোঝা যায় কোরবানির মূল বিষয় হলো আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি। বাহ্যিক প্রদর্শন বা লোক দেখানোর জন্য কোরবানি করা হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। সুন্নতে ইবরাহিমি ও আত্মত্যাগের শিক্ষা তবে মুসলিম উম্মাহর বর্তমান কোরবানির সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িত আছেন হযরত ইবরাহিম (আ.)। তাঁর জীবন ছিল আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বারবার কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন, আর তিনি প্রতিটি পরীক্ষায় সফল হয়েছেন। জন্মভূমি ত্যাগ, অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়া, স্ত্রী হাজেরা ও শিশু পুত্র ইসমাইলকে জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে আসা—সবকিছুতেই তিনি আল্লাহর আদেশ মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার নির্দেশ। বহু বছর দোয়া ও অপেক্ষার পর প্রাপ্ত সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার আদেশ সত্যিই ছিল মানব ইতিহাসের এক অনন্য পরীক্ষা। হজরত ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন, তিনি তাঁর পুত্রকে জবাই করছেন। নবীদের স্বপ্ন ওহির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তিনি বুঝতে পারলেন এটি আল্লাহর নির্দেশ। তিনি পুত্র ইসমাইলের (আ.) সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করলেন। উত্তরে ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ পিতা ও পুত্রের এই সংলাপ মানবজাতির জন্য আত্মসমর্পণ ও ঈমানের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। অতঃপর তারা মিনার প্রান্তরে গেলেন। হযরত ইবরাহিম (আ.) ছুরি চালালেন, কিন্তু আল্লাহর কুদরতে ইসমাইল (আ.) এর গলায় ছুরি চলল না। মহান আল্লাহ তাঁর এই ত্যাগ কবুল করে ইসমাইলের (আ.) পরিবর্তে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তার পরিবর্তে দিলাম এক মহান কোরবানি।’ এই ঘটনাই মুসলিম জাতির জন্য কোরবানির চিরন্তন আদর্শে পরিণত হয়েছে। ঈদুল আজহার কোরবানি মূলত সেই সুন্নাতে ইবরাহিমির স্মৃতিবাহী। মুসলমানরা পশু কোরবানির মাধ্যমে ঘোষণা করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে তারা নিজেদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত। ইসলামে কোরবানির গুরুত্ব ইসলামে কোরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কোরবানি কর।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অবস্থানকালে প্রতি বছর কোরবানি করেছেন। তিনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করা ব্যক্তির প্রতি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘যার সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ এ থেকে বোঝা যায়, কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও মহান ইবাদত। তবে এই ইবাদতের মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া ও আল্লাহভীতি। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে কোরবানির গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।’ অর্থাৎ, কোরবানির আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যদি কেউ লোক দেখানো, অহংকার বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কোরবানি করে, তাহলে তার কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে সমাজে দেখা যায়, অনেকে বড় ও দামি পশু কিনে তা নিয়ে বাহাদুরি করে, মিছিল করে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে। অথচ কোরবানির মূল শিক্ষা বিনয়, আত্মত্যাগ ও তাকওয়া। ঈদুল আজহা সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিকতারও শিক্ষা দেয়। কোরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টন করার মাধ্যমে সমাজে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। ধনী-গরিব সবাই এই আনন্দে অংশগ্রহণ করতে পারে। ইসলামে কেবল নিজে ভোগ করা নয়; বরং অন্যের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। মুসলিম ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা কোরবানির শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের সম্পদ, সন্তান, ক্ষমতা ও দুনিয়াবি মোহের ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। হযরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্রের প্রতি ভালোবাসার চেয়েও আল্লাহর ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। এটাই প্রকৃত ঈমান ও তাকওয়ার পরিচয়। ঈদুল আজহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুসলিম উম্মাহর ঐক্য। এই সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলমান হজ পালনের জন্য মক্কায় সমবেত হন। তারা ইবরাহীমী আদর্শ অনুসরণ করে তাওহিদের চেতনায় উজ্জীবিত হন। হজ ও কোরবানি মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও ঐক্যের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে। আধুনিক সমাজে ঈদুল আজহার প্রাসঙ্গিকতা আজকের পৃথিবীতে মানুষ ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে নিমজ্জিত। ঈদুল আজহা আমাদের সেই অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ দেখায়। এটি শেখায়—ত্যাগ ছাড়া প্রকৃত সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। নিজের ভেতরের হিংসা, লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতাকে কোরবানি করতে না পারলে পশু কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য অর্জিত হয় না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় বলেছেন—‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ।’ এই আহ্বানই ঈদুল আজহার মূল আহ্বান। মানুষ যেন ভোগের মানসিকতা পরিহার করে ত্যাগের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। ঈদুল আজহা ও কোরবানির মাধ্যমে মানুষ যদি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, আত্মসমর্পণ, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা লাভ করে, নিজের ভেতরের পশুত্বকে দমন করে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শিক্ষা লাভ করে, তাহলেই তার ঈদ ও কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হয়। ওএফএফ
Go to News Site