Collector
সীমানার ওপারে ঈদ: কেমন কাটে প্রবাসী তরুণদের | Collector
সীমানার ওপারে ঈদ: কেমন কাটে প্রবাসী তরুণদের
Jagonews24

সীমানার ওপারে ঈদ: কেমন কাটে প্রবাসী তরুণদের

ঈদ মানেই পরিবার, প্রিয়জন আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আনন্দের কিছু মুহূর্ত। কিন্তু যারা পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় হাজার হাজার মাইল দূরে ভিনদেশে পাড়ি জমান, তাদের কাছে ঈদের দিনটি আসে অন্য রকম এক অনুভূতি নিয়ে। উৎসবের এই দিনে আনন্দ নয়, বরং তাদের বুকে ভর করে একরাশ শূন্যতা আর স্মৃতিকাতরতা। নিজের শখ আর আহ্লাদগুলো বিসর্জন দিয়ে তারা কেবল পরিবারের মুখেই হাসি ফোটান। কেমন কাটে সেই প্রবাসী তরুণদের ঈদের দিন? কয়েকজন তরুণ প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলে দূর প্রবাসের একাকীত্ব আর নীরব আত্মত্যাগের গল্পগুলো জানাচ্ছেন তানজিদ শুভ্র… স্মৃতির ভীড়ে নতুন ঈদ সফিউল ইসলাম, রিয়াদ, সৌদি আরব প্রবাসে এটা আমার প্রথম ঈদুল আজহা। চারপাশে মানুষ, ব্যস্ত শহর, কাজের চাপ-কিন্তু নিজের মানুষগুলো নেই। চাঁদ রাতেই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে দেশের কথা। মনে হয়, আগামীকাল হয়তো মা রান্নাঘরে সেমাই আর গরুর মাংসের আয়োজন করবেন, বাবা কোরবানির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন, আর ছোট ভাইবোনেরা নতুন কাপড় গুছিয়ে রেখে আনন্দে ঘুমাতে পারছে না। অথচ আমি হাজার মাইল দূরে, ব্যস্ততা শেষে এক ছোট্ট ঘরে নিঃশব্দে বসে সেই স্মৃতিগুলোই শুধু মনে করছি। ঈদের দিন সকাল! আমার শহরে কোনো চেনা কোলাহল নেই। নামাজ শেষে সবাই দ্রুত যার যার কাজে চলে যাবে। রাস্তায় নেই সেই তাকবিরের ধ্বনি, নেই আত্মীয়দের ঘরে ঘরে ঘোরার আনন্দ। ভিডিও কলে পরিবারের হাসিমুখ দেখি, কিন্তু পর্দার ওপাশের সেই ভালোবাসা ছুঁতে পারি না। কথা বলতে বলতে কখন যে চোখ ভিজে আসে, নিজেও বুঝতে পারি না। তবে জীবন থেমে থাকে না। তাই দেশি বন্ধুদের সঙ্গে ছোট্ট পরিসরে ঈদ উদযাপনের চেষ্টা করবো। কিন্তু মনের গভীরে একটা অভাব থেকেই যায় নিজের ঘর, নিজের মানুষ আর শৈশবের সেই পরিচিত ঈদের উষ্ণতা সব মিস করবো খুব। প্রবাসে এসে বুঝেছি, ঈদের আসল আনন্দ পরিবারের একসঙ্গে থাকার মাঝেই লুকিয়ে থাকে। উৎসবের দিনেও ডিউটি আর পুরোনো পোশাক আরমান জিহাদ, কাতার ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। কিন্তু প্রবাসীদের কাছে ঈদ মানে একাকীত্ব আর কাজের চাপ। দেশে যখন ঈদের ছুটির আমেজ চলে, প্রবাসে তখন আমরা কাজে ডুবে থাকি। এমন নয় যে এখানে ঈদের ছুটি নেই, তবে সেই ছুটি মেলে অন্য সময়ে। আমি কাতারের একটি বিলাসবহুল শপিং মলে কাজ করি। সাপ্তাহিক ছুটির দিন আর উৎসবের দিনগুলোতে এখানে ভিড় বাড়ে। আর ভিড় বাড়লে আমাদের কাজের চাপও বাড়ে। তখন আর ছুটি নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঈদের ছুটিটা নিতে হয় ঈদের আগে অথবা পরে। তবে আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও ভিন্ন-ঈদের দিনে আমার কোনো ছুটিই নেই! ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়তে যাওয়াটাও অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। কেউ বাধা দেয় না ঠিকই, কিন্তু সময়ের টানাটানি থেকে তো আর নিস্তার নেই। আমি রাতের ডিউটি করি বলে সমস্যাটা আমার জন্য আরও প্রকট। কাতারে ঈদের নামাজ শুরু হয় খুব ভোরে, আর সেই সময়টায় আমি থাকি কর্মস্থলেই। কোম্পানির গাড়ির ব্যবস্থা থাকলেও সেটা আসতে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। নামাজ পড়ে এসে তাড়াহুড়ো করে খেয়ে তাই আবার ডিউটির প্রস্তুতির জন্য ছুটতে হয়। ঈদের দিনে পছন্দের খাবার খাওয়াটাও এখানে যেন বিলাসিতা। চাইলে সবকিছুই পাওয়া যায়, তবে কিনে খেতে হয়। কোম্পানির ক্যাম্পে নিজেদের রান্না করা নিষেধ। কোম্পানি থেকেই খাবার দেওয়া হয়, তবে সেটা তাদের নিয়মিত মেন্যু, ঈদের জন্য বিশেষ কিছু নয়। তাই বাইরে থেকে বিরিয়ানি কিংবা গরুর মাংস কিনে এনেই ঈদের সাধ মেটাতে হয়। নতুন পোশাকের কথা আর কী বলব! প্রবাসে আমার মতো অনেকেই নতুন কাপড় কেনেন না, এমনকি ঈদেও না। ঈদের নামাজের মাঠে তাকালে দেখা যায়, অনেকেই বছরের পর বছর একই পাঞ্জাবি বা শার্ট পরে নামাজে আসছেন। দিন শেষে মোবাইলের ভিডিও কলে প্রিয়জনদের সঙ্গে একটু কথা বলেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে হয়। প্রবাসীর সুখ বলতে আসলে একটাই নিজের পরিবারের মুখে হাসি দেখা। পরের সুখে হেসেখেলে জীবন করে পার, বড্ড দুখে থেকেও মুখে হাসি থাকে যার। সেই প্রবাসী, সেই তো যোদ্ধা, আলো ফোটা রবি, সামনে আসুক বীরের বেশে তাদের আসল ছবি। বুকে হাহাকার, মুখে মিথ্যে হাসি মোহাম্মদ ফরহাদুল ইসলাম, মক্কা, সৌদি আরব প্রবাস জীবনে ঈদের সকালটা শুরু হয় নীরবে নিভৃতে। আমাদের দেশের মতো ফজরের নামাজের পর এখানকার চারপাশ আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে না। ছুটির দিন না হলে অনেককেই ছুটতে হয় কর্মক্ষেত্রে। ঈদের নামাজ পড়ে রুমে ফিরে আসার পর শুরু হয় ভিডিও কলের উৎসব। স্ক্রিনের ওপারে মা-বাবা যখন বলেন, ‘বাবা, তুই থাকলে আজ কত ভালো হতো!’ তখন বুকের ভেতর বোবা কান্না শুরু হয়। আনন্দের দিনে এই একাকীত্ব যেন নিজের মনের সঙ্গে এক নীরব যুদ্ধ। মা যখন পরম স্নেহে জিজ্ঞেস করেন, ‘বাবা, ঠিকমতো খেয়েছিস তো?’ তখন প্রবাস থেকে হেসে বলতে হয়, ‘হ্যাঁ মা, খেয়েছি।’ অথচ বুকের ভেতর তখন এক তীব্র হাহাকার মোচড় দিয়ে ওঠে। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে যখন দেশের বন্ধুদের কোরবানির পশু জবাই, মাংস কাটা বা বারবিকিউ পার্টির ছবি ও আমেজ ভেসে ওঠে, তখন দূর প্রবাসে এই শূন্যতা আরও গভীর হয়ে ওঠে। উৎসবের আড়ালে একাকীত্ব মো. জুবাইল আকন্দ, জোহর বাহরু, মালয়েশিয়া পরিবার আর প্রিয়জন ছাড়া প্রবাসের ঈদ যেন রংহীন এক ক্যানভাস, যেখানে উৎসবের কোনো আমেজ নেই। প্রবাসীদের কাছে ঈদ মানেই নিজের সবটুকু আনন্দ পরিবারের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া। হয়তো মাস শেষে তাদের হাতে উপার্জন আসে, কিন্তু ঈদের দিন নিজের জন্য নতুন একটা শার্ট কিনতে গেলেও মাথায় ঘোরে হাজারো হিসাব। আপনজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে না পারার এই বোবা কষ্ট কেবল একজন প্রবাসীই অনুভব করতে পারেন। উৎসবের দিনেও গায়ে ওঠে সেই পুরোনো কাপড়, আর পাতে থাকে প্রতিদিনের চেনা সাধারণ খাবার। অনেকের কাছে তো ঈদের দিনটাও আর দশটা কর্মব্যস্ত দিনের মতোই, ডিউটির তাগিদে ছুটতে হয় কর্মস্থলে। প্রবাস জীবন মানেই নিজের শখ আর আহ্লাদগুলোকে খাঁচায় বন্দি করে সাত সমুদ্রের ওপারে পরিবারের স্বপ্নগুলো সযত্নে লালন করা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে একজন প্রবাসী কতটা ধৈর্যশীল আর আত্মত্যাগী হতে পারেন, নিজে প্রবাসী না হলে তা হয়তো কখনোই উপলব্ধি করতে পারতাম না। ক্লান্তিকর জীবনের ফাঁকে ঈদের এই ছুটির দিনটিতে লম্বা ঘুমই যেন অধিকাংশ প্রবাসীর প্রধান রুটিন। সকালে ঈদের নামাজ পড়ে দেশে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর বুকের ভেতরের শূন্যতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। স্ক্রিনের ওপারে চেনা মুখগুলো দেখে অনেকেরই অজান্তে চোখ ভিজে ওঠে। বুকের ভেতর চেপে রাখা একরাশ কষ্ট নিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমানোর চেষ্টা করেন অনেকেই। এরপর দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে, সামান্য একটু আনন্দের খোঁজে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া। হয়তো অচেনা শহরের কোনো পার্কে বসে কিছুটা সময় পার করা। এভাবেই নিঃসঙ্গতা আর এক অদ্ভুত শূন্যতার মাঝেই নিঃশব্দে শেষ হয়ে যায় প্রবাসীদের বহুল প্রতীক্ষিত ঈদের দিন। আরও পড়ুনঈদুল আজহায় কোরবানির সঙ্গে থাকুক পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রতিশ্রুতিএকজন মা ও একটি রাতজাগা পাখি কেএসকে

Go to News Site