Jagonews24
১৯৬২ সালের ২ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের রজার্স নামের এক ছোট শহরে যাত্রা শুরু করেছিল একটি সাধারণ দোকান। উদ্বোধনের দিন সেই দোকানে কাজ করছিলেন মাত্র ২৫ জন কর্মী। উদ্যোক্তা এক তরুণ, নাম স্যাম ওয়ালটন। তিনি হয়তো সেদিন নিজেও কল্পনা করেননি, তার এই ছোট উদ্যোগ একদিন রূপ নেবে বৃহত্তম খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে, আর তারা হয়ে উঠবে বেসরকারি খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাকরিদাতা। হ্যাঁ, গল্পটি বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড ওয়ালমার্টের। মাত্র ২৫ জন নিয়ে শুরু, আজ ২১ লাখ কর্মীর বিশাল ‘পরিবার’–এ পরিণত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। ফরচুন ৫০০ তালিকার শীর্ষে থাকা ওয়ালমার্টের শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল, কীভাবে এটি ডালপালা মেলল এবং কীভাবে তারা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চাকরিদাতা হয়ে উঠল, সেই রোমাঞ্চকর উত্থানের গল্প আজ বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অনুপ্রেরণা। স্যাম ওয়ালটনের সেই ছোট্ট স্বপ্ন ওয়ালমার্টের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে ছিল এর প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটনের ব্যবসায়িক দর্শনের মধ্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্যাম ওয়ালটন যখন খুচরা ব্যবসায় নামেন, তখন তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—ক্রেতাদের কম দামে পণ্য সরবরাহ করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, পণ্যের দাম কম রাখলে ক্রেতারা বেশি সংখ্যায় আসবেন, আর তাতেই ব্যবসার আসল লাভ হবে। স্যাম তার কর্মীদের শুধু বেতনই দিতেন না, বরং কোম্পানির লভ্যাংশের অংশীদার করতেন। তিনি মনে করতেন, কর্মীরা খুশি থাকলে ক্রেতারাও খুশি থাকবেন। আরও পড়ুন>>এনভিডিয়া যেভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানি হলোলুই ভুটন থেকে টিফানি/ যেভাবে লাক্সারি সাম্রাজ্যের রাজা হলেন বার্নার্ড আর্নল্টটিকটক দিয়ে বিশ্ব মাত, ৩৮ বছরেই শীর্ষ ধনীর কাতারে রজার্স শহরের সেই প্রথম দোকানে স্যাম ওয়ালটন এই নীতিই প্রয়োগ করেন। ১৯৬২ সালের ২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের রজার্স শহরে প্রথম ওয়ালমার্ট ডিসকাউন্ট সিটি চালু হয়। তখন দোকানটি ছিল খুব সাধারণ। কর্মীসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ জন। শুরুর সময় ওয়ালমার্টের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, সে সময় বাজারে শক্ত অবস্থানে ছিল প্রতিষ্ঠিত খুচরা বিক্রেতারা। তাদের ছিল বড় শহরে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, পরিচিত ব্র্যান্ড এবং বড় সরবরাহ ব্যবস্থা। তবে ওয়ালমার্ট অন্য পথে হাঁটল। প্রতিষ্ঠানটি ছোট শহরে দোকান খুলতে শুরু করল। এমন অনেক এলাকায় তারা প্রবেশ করল, যেখানে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীরা ব্যবসার সম্ভাবনা কম দেখেছিল। এটাই পরে ওয়ালমার্টের বড় শক্তিতে পরিণত হয়। দাম কম রাখার কৌশল শুরু থেকেই ওয়ালমার্ট একটি বিষয়কে ব্যবসার কেন্দ্রে রাখে—দৈনন্দিন কম দাম। তখন অনেক দোকানে বিশেষ ছাড় বা নির্দিষ্ট সময়ের অফারের মাধ্যমে ক্রেতা টানা হতো। কিন্তু ওয়ালমার্ট বলল ভিন্ন কথা। তারা ক্রেতাদের বোঝাতে চাইল, সব সময়ই কম দামে পণ্য পাওয়া যাবে। এই কৌশল প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত পরিচিতি বাড়ায়। তবে শুধু কম দাম বললেই বিষয়টি শেষ হয়নি। দাম কম রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনে ওয়ালমার্ট। প্রতিষ্ঠানটি গুদাম ও পরিবহন ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ শুরু করে। তারা পণ্য সরবরাহের জন্য নিজস্ব কাঠামো তৈরি করে। ফলে দোকানে দ্রুত পণ্য পৌঁছানো সহজ হয়। এই প্রক্রিয়ায় খরচ কমে। খরচ কমলে পণ্যের দামও কম রাখা সম্ভব হয়। ওয়ালমার্টের ব্যবসা বাড়ার পেছনে এই সরবরাহ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওয়ালমার্টের একটি স্টোর/ ছবি: পেক্সেলস একের পর এক নতুন শহরে ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে ওয়ালমার্ট দ্রুত বিস্তার শুরু করে। প্রথম দোকানের কয়েক বছরের মধ্যেই একাধিক নতুন আউটলেট চালু হয়। ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে কর্মীসংখ্যাও। আরও পড়ুন>>শ্রমিক থেকে পানি ব্যবসায়ী, আজ চীনের শীর্ষ ধনীঅনলাইনে বইবিক্রেতা থেকে শত কোটির মালিকবাবার ক্যানসারে ভার্সিটি ছেড়েছিলেন, আজ সুইজারল্যান্ডের শীর্ষ ধনী ১৯৬৭ সালের মধ্যে ওয়ালমার্টের ২৪টি স্টোর চালু হয়। তখন বিক্রির পরিমাণ কয়েক কোটি ডলারে পৌঁছায়। এরপর ১৯৭০ সালে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এটি ছিল ওয়ালমার্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। কারণ, শেয়ারবাজার থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি নতুন নতুন এলাকায় সম্প্রসারণ শুরু করে। পরবর্তী এক দশকে ওয়ালমার্ট দক্ষিণ ও মধ্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। প্রযুক্তির ব্যবহারেও এগিয়ে ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে প্রযুক্তিকেও গুরুত্ব দিতে শুরু করে ওয়ালমার্ট। ১৯৮০-এর দশকে অনেক খুচরা বিক্রেতা এখনও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত পর্যায়ে রাখলেও ওয়ালমার্ট তুলনামূলক দ্রুত প্রযুক্তি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে। পণ্যের মজুত, বিক্রি এবং পরিবহন নজরদারিতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তারা কোন দোকানে কী চাহিদা রয়েছে, তা দ্রুত বুঝতে পারত। ফলে অতিরিক্ত পণ্য মজুতের ঝুঁকি কমে। এটি ব্যবসার গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে বিশ্বে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই থেমে থাকেনি ওয়ালমার্ট। ১৯৯০-এর দশকে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ শুরু করে। কানাডা, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়। পরে এশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বাজারেও প্রবেশ করে ওয়ালমার্ট। তবে সব জায়গায় সমান সাফল্য আসেনি। কিছু দেশে ব্যবসা গুটিয়েও নিতে হয়েছে। তবু বৈশ্বিক উপস্থিতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির পরিধি আরও বড় হয়েছে। আজ বিশ্বের বহু দেশে ওয়ালমার্টের কার্যক্রম রয়েছে। ওয়ালমার্টের দুজন কর্মী/ ছবি: ফেসবুক@ওয়ালমার্ট ২১ লাখের কর্মীবাহিনী ওয়ালমার্টের এই অবিশ্বাস্য উত্থানের পেছনে যে বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে, তা হলো এর কর্মী ব্যবস্থাপনা। ১৯৬২ সালে মাত্র ২৫ জন নিয়ে শুরু, আজ ২১ লাখ কর্মী থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বেসরকারি খাতের একক বৃহত্তম চাকরিদাতা। স্যাম তার কর্মীদের শুধু বেতনই দিতেন না, বরং কোম্পানির লভ্যাংশের অংশীদার করতেন। তিনি মনে করতেন, কর্মীরা খুশি থাকলে ক্রেতারাও খুশি থাকবেন। আজ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওয়ালমার্টের ১০ হাজারেরও বেশি স্টোর রয়েছে। আর এই বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন ২১ লাখেরও বেশি মানুষ। আজকের দিনে ওয়ালমার্টের কর্মীসংখ্যা বিশ্বের বহু দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এখানে যেমন রয়েছেন পার্ট-টাইম কাজ করা কলেজশিক্ষার্থী, তেমনি আছেন কয়েক দশক ধরে কাজ করা অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক। বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওয়ালমার্ট ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে ওয়ালমার্ট এখন শুধু আর শারীরিক বা বাস্তব স্টোরে সীমাবদ্ধ নেই। ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটাতেও তারা অ্যামাজনসহ অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে। ঘরে বসেই মাত্র কয়েক ক্লিকে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতাদের দুয়ারে। কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও ওয়ালমার্টের মূল শক্তি এখনো মানুষ। রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই আসুক না কেন, স্টোরে ক্রেতাদের হাসিমুখে স্বাগত জানানো এবং সেবা দেওয়ার জন্য মানুষের বিকল্প নেই—এটি ওয়ালমার্ট কর্তৃপক্ষ সবসময় মনে রাখে। একটি ছোট শহরের সাধারণ মুদি দোকান থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ বিশ্বের ব্যবসা ইতিহাসের অন্যতম সফল রূপকথা। ওয়ালমার্টের এই গল্প প্রমাণ করে, সঠিক দূরদর্শিতা, সততা এবং কর্মীদের মূল্যায়নের মানসিকতা থাকলে যে কোনো ছোট উদ্যোগ দিয়েই বিশ্বজয় করা সম্ভব। সূত্র: ওয়ালমার্ট, স্ট্র্যাটেজি জার্নি, ক্যানভাস বিজনেস মডেল, ব্রিটানিকাকেএএ/
Go to News Site