Jagonews24
শেয়ারবাজারে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু কোম্পানির আবির্ভাব ঘটে, যাদের শেয়ারদর আচমকা আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এগুলো তখন যেন হয়ে ওঠে ‘সোনার হরিণ’। দেখতে লোভনীয়, ছুঁতে পারলে লাভের নিশ্চয়তা; কিন্তু বাস্তবে যার পেছনে থাকে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির দীর্ঘ ছায়া। সাম্প্রতিক সময়ে মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ তেমনই এক আলোচিত নাম। মাত্র এক মাসে ১৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি, সংখ্যাটি নিজেই বিস্ময়কর। চার মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৩০০ শতাংশের ওপরে। গত ৫ এপ্রিল যেখানে কোম্পানিটির শেয়ারের দর ছিল ২৬ টাকা ৩০ পয়সা, সেখানে এক মাস পর ২৩ মে তা গিয়ে দাঁড়ায় ৭০ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ খুব অল্প সময়েই শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ৪৪ টাকা ২০ পয়সা বা ১৬৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। আর চার মাসের ব্যবধানে এই বৃদ্ধির হার ৩০২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত ১৫ জানুয়ারি কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ১৭ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ, চার মাসের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। ফলে বলা যায়, চার মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে চারগুণ হয়েছে। এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। কেউ কেউ অল্প সময়েই বড় অঙ্কের মুনাফা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৫ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ারে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে এবং ২৩ মে বিক্রি করলে পাওয়া গেছে ২৬ লাখ ৮০ হাজার ৬০৮ টাকা। অর্থাৎ দেড় মাসের ব্যবধানে প্রায় ১৭ লাখ টাকা মুনাফা। আবার এই বিনিয়োগ যদি আরও একটু আগে হয়ে থাকে তাহলে মুনাফার পরিমাণ আরও আকর্ষণীয়। গত ১৫ জানুয়ারি কোম্পানিটির প্রতটি শেয়ারের দাম ছিল ১৭ টাকা ৫০ পয়সা। যদি কোনো বিনিয়োগকারী সে সময় কোম্পানিটির ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন এবং ২৩ মে বিক্রি করেন, তাহলে তিনি পেয়েছেন ৪০ লাখ ২৮ হাজার ৫৭১ টাকা। অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা চার মাস বিনিয়োগ করে মুনাফা হয়েছে ৩০ লাখ ২৮ হাজার টাকার বেশি। এই মুনাফা অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। কিন্তু এই স্বপ্নের পেছনের বাস্তবতা কতটা শক্ত? এখানেই শুরু হয় প্রশ্ন। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। বছরের পর বছর ধরে কোম্পানিটি লোকসানে হাবুডুবু খাচ্ছে। সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৬৩ পয়সা। লোকসানে নিমজ্জিত হওয়ায় কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশও দিতে পারছে না। সর্বশেষ কবে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়েছে, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে খুঁজে পাওয়া যায়নি। লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে কোম্পানিটি বর্তমানে পচা ‘জেড’ গ্রুপে রয়েছে। এ ধরনের একটি কোম্পানির শেয়ারের এমন দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে কী আছে? বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দাম বাড়ার পেছনে কারসাজি চক্রের হাত রয়েছে। কোনো বিশেষ চক্র পরিকল্পিতভাবে এই দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। লোকসানে পতিত হওয়া একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম চার মাসে ৩০০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া কোনোভাবেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এরই মধ্যে কোম্পানিটিকে এ বিষয়ে নোটিশ দিয়েছে। তবে জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেয়ারের দর বৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে, যদি মৌলভিত্তিতে পরিবর্তন না ঘটে, তবে এই উত্থান কেন? আরও পড়ুনশেয়ারবাজারে বাড়ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ‘ঝাড়ু’ চলছে, দুর্গন্ধও আছে: যা দেখা গেলো হাতিরঝিলে সব মিলিয়ে মেঘনা পেট এখন শেয়ারবাজারে এক আলোচিত ধাঁধা। এর শেয়ারের দর বিনিয়োগকারীদের চোখে ‘সোনার হরিণ’- এর মতো ঝলমলে হলেও এর পেছনের আর্থিক ভিত্তি সেই আলোকে কতটা সমর্থন করে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শেয়ারবাজারে শুধু দামের পেছনে ছুটলে চলবে না, দেখতে হবে কোম্পানির ভিত্তি, আয়, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি। কারণ ‘সোনার হরিণ’ ধরতে গিয়ে অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা হারিয়ে ফেলেন নিজেদের সঞ্চিত পুঁজি। ডিএসইর এক সদস্য বলেন, যে কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয় না তার একটি শেয়ারের দাম ৭০ টাকা, এটা কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। আর এক মাসে প্রায় দুইশ শতাংশ দাম বাড়াও কোনো স্বাভাবিক লক্ষণ না। এটা স্পষ্ট, এই দাম বাড়ার পেছনে কোনো বিশেষ গ্রুপ রয়েছে। তিনি বলেন, মেঘনা পেটের শেয়ারের সংখ্যা খুব বেশি না। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১২ কোটি টাকা এবং শেয়ার সংখ্যা এক কোটির কিছু বেশি। এ ধরনের কোম্পানির শেয়ার গুটি কয়েক বিনিয়োগকারীর পক্ষ যোগসাজশ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং দাম বাড়ানো সম্ভব। এর জন্য খুব বড় ধরনের ফান্ডের প্রয়োজন হয় না। ডিএসইর আর এক সদস্য বলেন, শেয়ারবাজারে মাঝে মধ্যেই কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ে। তবে সেটি যদি মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার হয়, তাহলে প্রশ্ন কম ওঠে। কিন্তু লোকসানে নিমজ্জিত এবং লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানির শেয়ারের দাম হঠাৎ ২০০-৩০০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না। তিনি বলেন, এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে মুনাফা পাওয়ার যেমন সুযোগ থাকে, তেমনই বড় লোকসানের মধ্যে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। আমাদের দেশের শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রায় এ ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগ করে পুঁজি হারান। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক্সপার্ট না হলে এ ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগ করা উচিত না। ডিএসইর এ সদস্য আরও বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি বিষয় মনে রাখা উচিত— নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে গেলেও লভ্যাংশ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু যে কোম্পানি লভ্যাংশ দেয় না, তার থেকে কিছুই পাওয়া যায় না। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উচিত ভালো মৌলভিত্তির শেয়ার বাছাই করে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা। ২০০১ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১২ কোটি টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা এক কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে ৪৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার আছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এমএএস/কেএসআর
Go to News Site