Jagonews24
ইলিয়াস (আ.) বনী ইসরাইলের নবীগণের মধ্যে একজন নবী। তার বাবার নাম ছিল ইয়াসীন এবং তিনি মুসার (আ.) ভাই হারুনের (আ.) বংশধর। ইসরাইলি কিতাবসমূহে তাকে ‘ইলিয়া’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআন মজীদে নবী ইলিয়াসের (আ.) নাম দুই জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে: এক. কোরআনে নবীদের একটি দলের আলোচনার মধ্যে তাঁর নাম এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াস—তারা সকলেই ছিল সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা আনআম: ৮৫) দুই. কোরআনের আরেক জায়গায় তার দ্বীন প্রচারের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই ইলিয়াস ছিল রাসুলদের একজন। যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলল, তোমরা কি ভয় কর না? তোমরা কি বা\'আল দেবতার পূজা করবে এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিত্যাগ করবে! যিনি আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদের পালনকর্তা? তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। অতএব তারা অবশ্যই (শাস্তির জন্য) গ্রেফতার হয়ে আসবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার খাঁটি বান্দাগণ নয়। আমি তার জন্যে পরবর্তীদের মধ্যে এ বিষয়ে রেখে দিয়েছি যে, ইলিয়াসের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক! এভাবেই আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত। (সুরা সাফফাত: ১২৩-১৩২) পূর্ববর্তী কিতাবের অনুসারীদের বর্ণনায় ইলিয়াসের (আ.) ঘটনা পূর্ববর্তী ইহুদি ও খৃষ্টান ধর্মের পণ্ডিতদের সূত্রে ইলিয়াসের (আ.) ঘটনা বিভিন্ন তাফসিরের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে এভাবে: “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে নবী হিযকীলের (আ.) পর বনি ইসরাইলের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। বনি ইসরাইলের লোকেরা ‘বাআল’ নামক একটি মূর্তির পূজা করত। তিনি তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানালেন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদত করতে নিষেধ করলেন। তাদের রাজা প্রথমে তার প্রতি ইমান এনেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে যান। অন্য বেশিরভাগ মানুষ তাদের ভ্রষ্টতার ওপর অবিচল রইল। তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। ফলে তিন বছর তাদের ওপর বৃষ্টি বন্ধ রইল। এরপর তারা তাঁর কাছে এই কষ্ট দূর করার জন্য অনুরোধ করল এবং প্রতিশ্রুতি দিল যে, যদি তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হয় তবে তারা তার প্রতি ইমান আনবে। তিনি তাদের জন্য দোয়া করলেন এবং মুষলধারে বৃষ্টি এলো। কিন্তু তারা ইমান আনল না। তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যেন আল্লাহ তাকে নিজের কাছে তুলে নেন। আল্লাহ তাআলা ইলিয়াসকে (আ.) নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন অমুক স্থানে যান, সেখানে তাঁর সামনে যা-ই আসবে তিনি যেন তার ওপর সওয়ার হন এবং ভয় না পান। ইলিয়াস (আ.) নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গায় গেলে তাঁর কাছে আগুনের একটি ঘোড়া এলো এবং তিনি ঘোড়াটির ওপর সওয়ার হলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নূরের পোশাক ও ডানা পরিধান করিয়ে দিলেন এবং তিনি ফেরেশতাদের সাথে উড়তে লাগলেন। তিনি হয়ে উঠলেন ফেরেশতা ও মানুষ, আসমানি ও জমিনি সত্তা।” নবী ইলিয়াসের ঘটনাটি এভাবে ইবনে কাসির (রহ.) ও তাবারি (রহ.) ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাসির এই ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন, ওয়াহাব এটি আহলে কিতাবদের থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, আর এর সত্যতার ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। কোরআনের বর্ণনায় ইলিয়াস (আ.) কোরআনের বর্ণনা থেকে আমরা যা বুঝতে পারি তা হলো, আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের কাছে কোনো এক যুগে তাঁর নবী ইলিয়াসকে (আ.) পাঠিয়েছিলেন যখন তারা ‘বাআল’ নামক মূর্তির পূজা করত। ইলিয়াস (আ.) তাদের এই মূর্তিপূজার তীব্র সমালোচনা করেন এবং তাদের একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। তিনি তাদের জানান যে, আল্লাহই তাদের রব এবং তাদের পূর্বপুরুষদেরও রব। কিন্তু তারা তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। আল্লাহ তাআলা তাদের কেয়ামতের দিনের আজাবের ভয় দেখিয়েছেন, তবে দুনিয়াতে তাদের কোনো শাস্তির কথা উল্লেখ করেননি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও জানিয়েছেন যে, যাদের তিনি খাঁটি বান্দা হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং তাঁর নবীর অনুসরণের তৌফিক দিয়েছেন, তারা এই আজাব থেকে মুক্ত থাকবে এবং আল্লাহর কাছ থেকে মহাপ্রতিদান লাভ করবে। ঘটনার শেষে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের মাঝে দাওয়াতের এই মহান কাজ আঞ্জাম দেওয়ার কারণে ইলিয়াস আলাইহিস সালামের প্রশংসা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ও তাঁর বান্দাদের পক্ষ থেকে তার জন্য রয়েছে সালাম বা অভিবাদন। ইলিয়াসের (আ.) ব্যাপারে এইটুুকু ঘটনা আমরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতে পারি। এর বাইরের যেসব তথ্য বা বর্ণনা রয়েছে, তা পর্যালোচনার অবকাশ রাখে। ইলিয়াসের (আ.) ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ কোরআনের অন্যান্য ঘটনার মতো নবী ইলিয়াসের (আ.) ঘটনাও আল্লাহ তাআলা কেবল ঐতিহাসিক তথ্য বা নিছক গল্প বলার জন্য উল্লেখ করেননি; বরং এর উদ্দেশ্য হলো উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করা এবং পূর্ববর্তী যেসব জাতি ও সম্প্রদায় আল্লাহর বিধান অমান্য করেছিল ও রাসুলদের আনা হেদায়েত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তাদের পরিণতি থেকে সতর্ক হওয়া। হজরত ইলিয়াসের (আ.) ঘটনা থেকে এই শিক্ষণীয় বিষয়গুলো পাওয়া যায়: এক. সুরা সাফফাতে বেশ কয়েকজন নবীর ঘটনার সাথে নবী ইলিয়াসের ঘটনা আনা হয়েছে রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে, নবীগণ বছরের পর বছর দাওয়াত দেওয়ার পরও কাফেরদের কুফরের ওপর অটল থাকার প্রবণতা নতুন নয়। একই সাথে এটি মক্কার মুশরিকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা ও হুমকি যে—তারা যদি তাদের কুফরির ওপর অবিচল থাকে, তবে দুনিয়া অথবা আখেরাতে তাদের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। দুই. এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, দ্বীনের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো শিরক ত্যাগ করে তাওহিদের অনুসারী হওয়া, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের রব, আমাদের পূর্বপুরুষদেরও রব। মানুষের আদিপিতা আদম (আ.) আল্লাহর বিশ্বাসী বান্দা ও নবী ছিলেন। তার পরেও বহু কাল মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করত না। পরবর্তীতে শয়তানের প্ররোচনায় মানুষের মধ্যে কুফরি ও শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তিন. নবী ইলিয়াসের (আ.) ঘটনায় এই বার্তা রয়েছে যে, রাসুলের দায়িত্ব কেবল দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, তার দাওয়াতকে যারা মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে দুনিয়াতে তাদের শাস্তি বা ধ্বংস নিজের চোখে দেখা রাসুলের জন্য আবশ্যক নয়। নবীর দায়িত্ব মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়া এবং তা স্পষ্ট করে দেওয়া। তাদের হিসাব নেওয়া এবং তাদের ওপর আজাব নাজিল করার বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ তাদের ওপর আজাব তখনই নাজিল করবেন যখন তাঁর নির্ধারিত সময় আসবে। সেই সময় যখন আসবে, তখন তারা আর এক মুহূর্তও সুযোগ পাবে না। এই অর্থেই আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে (সা.) সম্বোধন করে অন্য আয়াতে বলেছেন, আমি তাদের যে ওয়াদা দিয়েছি তার কিছু অংশ যদি তোমাকে (তোমার জীবনেই) দেখিয়ে দিই অথবা (তার আগেই) তোমার মৃত্যু ঘটাই, পরিশেষে তারা তো আমার কাছেই ফিরে আসবে। (সুরা গাফির: ৭৭) কোরআনে বর্ণিত এই ঘটনার মূল নির্যাস হলো, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য যত উপাস্য রয়েছে, তা পাথর হোক কিংবা মানুষ, সবকিছুকে বর্জন করতে হবে। আল্লাহর সাথে যারা শিরক করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। দুনিয়াতে তারা শাস্তি না পেলেও আখেরাতে অবশ্যই তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে। ওএফএফ
Go to News Site