Collector
‘এই বুঝি কেউ ধরবে, মারবে’ | Collector
‘এই বুঝি কেউ ধরবে, মারবে’
Jagonews24

‘এই বুঝি কেউ ধরবে, মারবে’

কোনদিকে যাচ্ছি আমরা? বাঙালি হিসেবে, বাংলার মানুষ হিসেবে আমাদের ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে ধারণ করে কি আমাদের চলা সম্ভব হবে না? প্রশ্নগুলো অনেকের মনেই আসছে। কেউ কেউ বলছে, অধিকাংশই আবার আতঙ্কিত,ক্ষুব্ধ এবং আত্মরক্ষায় নীরব ভূমিকা পালন করছে। এরমধ্যেও সুযোগ পেলে  কেউ যে একটু আধটু মুখ খুলছে না তাও নয়। যেমনি খুলতে দেখা গেছে বাংলাদেশের নাট্য ব্যক্তিত্ব আবুল হায়াতকে। সদ্য প্রয়াত নাট্যকার আতাউর রহমানের স্মরণসভায় আবুল হায়াত নিজের কথা এবং আতাউর রহমানের জীবনের শেষপ্রান্তের অনুভূতির বিষয় প্রকাশ করছিলেন এভাবে, ‘আতাউর রহমান শেষ সময়ে ভালো ছিলেন না, ভয়ে থাকতেন, ডিপ্রেশনে থাকতেন। তিনি মনে করতেন, এই বুঝি কেউ ধরবে, মারবে। এই বুঝি আমি মরে গেলাম। নানা চিন্তায় ডিপ্রেশন চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।’   নাট্য জগতের বর্ষিয়ান এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব অপর অভিনেতা  ও লেখক আতাউর রহমানের আতঙ্কের কথা প্রকাশ করার পর মনে হতে পারে, এই অবস্থা হয়তো প্রয়াত ওই অভিনেতারই শুধু। কিন্তু একই বক্তৃতায় যখন নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করেন- ‘শিল্পকর্ম আমাদের পাপ, শিল্পচর্চা করে কি আমরা অপরাধী?’ তখন কিন্তু আমাদের ভাবতে হয়-গোটা শিল্প জগৎ এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে। কী এমন হয়ে গেছে যে একটা দেশের শিল্প সংস্কৃতি জগতে এমন হাহাকার চলবে? এখনকার চেয়ে হাজার গুণ বেশি অস্থিরতা অনিশ্চয়তা পারি দিয়ে আসার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। বাংলাদেশে তো একটা একাত্তর হয়েছিল, যখন মানুষকে অন্ধকারে ছেয়ে ফেলেছিল। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা ভর করেছিল গোটা দেশে। প্রাণের মায়ায় মানুষ হয়তো দেশত্যাগ করেছিল, না হয় দেশের ভিতরেই উদ্বাস্তুর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। বলা যায়, গোটা দেশই হয়ে পড়েছিল উদ্বাস্তু জীবনের বসতি। সেই আমলেও আবুল হায়াতদের মতো শিল্পীদের এমন আক্ষেপ কিংবা হতাশা ব্যাক্ত করতে হয়নি। বরং আমরা দেখেছি, আমাদের শিল্পী সমাজ বিদেশে উদ্বাস্তু অবস্থায়ও বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়েছেন সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে। সংগীত ও শিল্পের একেকটি অধ্যায় ব্যতিক্রমী বোমার মতো ঝলসে উঠেছিল। সৈয়দ হাসান ইমাম থেকে শুরু করে রথীন্দ্রনাথ কিংবা শাহীন মাহমুদ থেকে শুরু করে সমর দাশ সবাই সাংস্কৃতিক যোদ্ধা হয়ে গিয়েছিলেন। বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে তারা ধারণ করেছেন পাকিস্তানি বাহিনির গুলি প্রতিরোধে। তারা উচ্চারণ করেছেন ঐতিহ্যের কথা, সংগ্রামের কথা- গানে কবিতায় ও বক্তব্য-বক্তৃতায়। শুধু মুক্তিযুদ্ধ কেন, দেশের যে কোনো দোর্যোগ দুর্বিপাকে শিল্পী, লেখক, ক্রীড়াবিদরা যার যার পরিমণ্ডলে অবদান রেখে মানুষকে চাঙ্গা করেছেন। তারাও বৃহত্তর নাগরিক সমাজের হয়ে দেশরক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। আজকে সেই শিল্পীদেরই এমন হতাশা কেন প্রকাশ করতে হয়? কেন এই অবস্থা? মনে থাকার কথা,বছরকাল আগে আরেক গুণী শিল্পী মামুনুর রশীদকে ডিম ছুড়ে মারা  হয়েছিল। বাংলাদেশের শিল্পজগতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক মঞ্চে ঢুকে স্বয়ং শিল্পকলার ডিজিকে বলতে হয়েছিল, নিরাপত্তাজনিত কারণে নাটকটা বন্ধ করুন। যে মুহূর্তে নাট্যশিল্পীদের পাশে শিল্পকলার ডিজি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, বাইরে তখন চলছিল মব। মবকারীরা নাটক চলতে দেবে না। অতপর আর নাটক চলেনি ওইদিন। কেউ হয়তো বলতে পারেন, জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের চোখে যারা স্বৈরাচারের দোসর, তাদের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার থাকতে পারে না। সবার মনে থাকার কথা, মামুনুর রশীদ কিন্তু জুলাই যোদ্ধা। তিনিও তরুণ সমাজের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনে। তিনি কি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন? জুলাই অভ্যুত্থানে একাত্মতা ঘোষণাকারী শিল্পীদের মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। শুধু নাটক বন্ধই নয়, শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন ডিজি মৌখিকভাবে মামুনুর রশিদকে শিল্পকলা একাডেমিতে অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করেছিলেন। অথচ শিল্পকলার তৎকালীন ডিজি সৈয়দ জামিল আহমেদ নিজেও নাট্যজগতেরই একজন প্রথম সারির মানুষ। মনে থাকার কথা, নাট্যশিল্পী সিদ্দিকুর রহমানকে কিল-ঘুষি-থাপ্পর মেরে কাপড়চোপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। এখানেই শেষ নয়, এই শিল্পীকে হত্যা মামলায় ঢুকিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। যেমনি বলা যায়, শিল্পী অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এর কথা। তাকেও গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। হত্যা মামলায় আসামী করা হয়। হয়তো বলা হবে, তারা রাজনীতি করতেন, তাই তাদের শিল্পী পরিচয়ের বিষয়টা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। মামুনুর রশিদ প্রত্যক্ষ রাজনীতি করতেন এমনটা কি কেউ বলতে পারবেন? সারাদেশের মাজারগুলোতে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে হামলা করা হয়েছে। কারণ তারা বিদাতি গান বাজনা করে, নারায়ণগঞ্জে লালন মেলা অনুষ্ঠান তো প্রশাসনই বন্ধ করে  দিল। কারণ সেখানে উগ্রপন্থীরা হুমকি দিয়েছে। প্রখ্যাত শিল্পী রনবীকে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কী নাজেহালই না হতে হয়েছে। এই গুণী শিল্পী কি বাকি জীবনেও ভুলতে পারবেন, এই অপমাণের কথা? পরিণতি ভয়াবহ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে মব সন্ত্রাস মাধ্যমে সংগীতানুষ্ঠান নাটক ইত্যাদি প্রচারে যে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছিল, শিল্পীদের ওপর শারিরীক ও মানসিক যে চাপ তৈরি করা হয়েছিল,তার ধারাবাহিকতা কি চলছে এখনও? আতঙ্ক কিন্তু রয়ে গেছে। তার প্রমাণ ঢাকার মিলনায়তনগুলো। এই যে শীতকাল গেল, ওই সময় সাধারণত মিলনায়তনগুলো খালি পাওয়া যেতো না। কয়েক মাস আগে বুকিং দিতে হতো ছুটির দিনগুলোর জন্য। ঢাকায় সান্ধ্যকালীন সংগীত উৎসব এখন বিচ্ছিন্ন বিশেষণযুক্ত হয়ে পড়েছে। নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে নাটকপাড়ায়। কিন্তু উচ্ছাস নেই, সেই আবুল হায়াতের কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয় আতঙ্ক বিরাজ করছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। এক্ষেত্রে অনেকেই বলতে পারেন বর্তমান শাসকদল উগ্র নয়। হয়তো শাসক দল ওইভাবে বাধা নাও দিতে পারে। কিন্তু একটা রাজনৈতিক ক্ষত তৈরি হয়েছে শিল্পজগতে। সেই ক্ষত সারানোর দায়িত্বটা সরকারের। যারা এই মব মাধ্যমে সাংস্কৃতিক জগতকে তছনছ করে দিয়েছে, যারা বাউল শিল্পীদের হেনস্তা করেছে,বাউল সংগীত কিংবা বাউল মেলা হতে দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যারা নিগৃহীত শিল্পীদের পক্ষে কথা বলেছে তাদেরও মানসিক নির্যাতন সইতে হয়েছে। একটা দেশে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে শিল্প সংস্কৃতির মুক্ত আবহাওয়া নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি রাজনৈতিক সরকারকে তেমন মুক্ত চিন্তার কথা ভাবতে হবে। না হলে প্রবীণ শিল্পী আবুল হায়াতদের মতো গুণীজনদের হতাশা প্রকাশ করতে হবে এবং সেই হতাশা সংক্রমিত হবে গোটা সমাজে। আমাদের স্মরণ করতে হবে বিশ্বকবির কবিতার কথা- ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস’। লেখক-সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। এইচআর/জেআইএম

Go to News Site