Somoy TV
মধ্য লাওসের একটি দুর্গম অঞ্চলের প্লাবিত গুহায় আটকে পড়া পাঁচ গ্রামবাসীকে অবশেষে উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ ও জটিল উদ্ধার অভিযানের মধ্যেই স্থানীয় সময় শনিবার (৩০ মে) তারা অলৌকিকভাবে নিজেরাই গুহা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এ ঘটনায় উদ্ধারকর্মীরাও বিস্মিত হয়ে পড়েন, কারণ তাদের বের করে আনার জন্য তখনও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছিল।উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা জানান, আটকে পড়া পাঁচজনের মধ্যে প্রথম ব্যক্তিকে পানির নিচের সুড়ঙ্গপথ পেরিয়ে নিরাপদে বের করে আনা হয়। এরপর ধারণা করা হচ্ছিল, বাকি চারজনকে উদ্ধার করতে আরও কয়েক ঘণ্টা বা এমনকি কয়েক দিনও লেগে যেতে পারে। কিন্তু কয়েক দিন ধরে গুহার পানি নিষ্কাশনের প্রচেষ্টা সফল হওয়ায় পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বাকি চারজনসহ পুরো দলটি নিজেদের চেষ্টায় গুহা থেকে বেরিয়ে আসে। অস্ট্রেলিয়ান উদ্ধার ডুবুরি জশ রিচার্ডস বলেন, ‘আমি গুহার ভেতরে যাওয়ার জন্য ডাইভিং পোশাক পরছিলাম, ঠিক তখনই তারা নিজেরাই বেরিয়ে আসে।’ এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে (২০ মে) স্বর্ণের সন্ধানে গুহায় প্রবেশ করেছিলেন ওই পাঁচ ব্যক্তি। কিন্তু প্রবল বৃষ্টিতে পানি বেড়ে যাওয়ায় তারা ভেতরে আটকা পড়েন। তাদের পরিবারের জন্য এই উদ্ধার ছিল স্বস্তি ও আবেগের এক অসাধারণ মুহূর্ত। উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা থাও আওন নিজের বাবাকেও খুঁজছিলেন। বাবা গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি হাঁটু গেড়ে বসে তাকে জড়িয়ে ধরেন। পরে বাবাকে জরুরি তাপরোধী কম্বল জড়িয়ে স্ট্রেচারে তোলার সময় তিনি অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে সেই মুহূর্তে। তবে আনন্দের মধ্যেও রয়ে গেছে উদ্বেগ। ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধার হওয়া পাঁচজনের আগে আরও দুই ব্যক্তি একই গুহা ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিলেন। তারা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। আরও পড়ুন: প্রত্যন্ত মরুভূমিতে চীনের বিশাল সামরিক স্থাপনা, যা ‘কেউ দেখেনি আগে’ উদ্ধারকারীরা জানান, রোববার (৩১ মে) সকালে ডুবুরি দলকে আবার গুহায় ফিরে যেতে বলা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা গুহার নতুন একটি মানচিত্র দেওয়ার পর নিখোঁজ দুজনকে খুঁজতে আরও গভীরে অনুসন্ধান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ডুবুরি জশ রিচার্ডস বলেন, ‘আমাদের জানা তথ্য অনুযায়ী, আরও প্রায় ১০০ মিটার ভেতরে একটি বড় বায়ুথলি বা এয়ার পকেট রয়েছে। সেখানে পৌঁছাতে অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করতে হবে।’ তার ভাষায়, ওই পথ এখন পর্যন্ত ডুবুরিরা যতদূর গেছেন তারও বাইরে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিরা এখনও বেঁচে থাকলে সম্ভবত সেখানেই থাকতে পারেন। তবে অনুসন্ধান অভিযান এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। রাতভর বৃষ্টির কারণে গুহার পানির স্তর আবার বেড়ে গেছে। ২৯ মে প্রকাশিত এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, লাওসের জাইসোমবুন প্রদেশে একটি গুহায় আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে উদ্ধারকর্মীরা জড়ো হয়েছেন। ছবি: রয়টার্স উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক ডুবুরি দলটির কয়েকজন ২০১৮ সালে প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে সংঘটিত বিশ্বজুড়ে আলোচিত গুহা উদ্ধার অভিযানের অভিজ্ঞ সদস্য ছিলেন। তারা কয়েক দিন ধরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক ভূগর্ভস্থ পরিবেশে চলাচলের প্রশিক্ষণ দেন। গুহার ভেতরে ছিল খাড়া ঢালু পাথুরে পথ, কাদাময় ও ঘোলা পানিতে ভরা সুড়ঙ্গ এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ গিরিপথ। রিচার্ডস জানান, কিছু অংশের পানি এতটাই ঘোলা ছিল যে তা কফির মতো দেখাচ্ছিল। কোথাও কোথাও পথের প্রস্থ মাত্র ৬০ সেন্টিমিটারের মতো ছিল, যা একটি রেফ্রিজারেটরের প্রস্থের কাছাকাছি। আরও পড়ুন: মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে হ্লাইং আটকে পড়া কোনো ব্যক্তিরই ডাইভিংয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ তাদের পানিতে ডুবে থাকা জটিল ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসতে হচ্ছিল। উদ্ধার হওয়ার আগে তারা প্রায় এক সপ্তাহ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি ছাড়া গুহার ভেতরে ছিলেন। যদিও তারা মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন, ১০ দিনের বেশি সময় ভূগর্ভে অবস্থান করায় শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। স্যাঁতসেঁতে ও সংকীর্ণ পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকার ফলে তাদের শরীর কাদায় আচ্ছাদিত হয়ে যায় এবং কয়েকজনের ত্বক ও অন্ত্রজনিত সমস্যাও দেখা দেয়। উদ্ধারের প্রস্তুতির সময় অন্ধকার ও সংকীর্ণ গুহাকক্ষে হেডল্যাম্পের আলোয় ডুবুরিন নোরাসেদ পালাসিং এবং মিক্কো পাসি তাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার ও শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেন। শুক্রবার (২৯ মে) প্রথম ব্যক্তিকে সফলভাবে গুহা থেকে বের করে আনা হয়। বাইরে অপেক্ষমাণ লোকজন উল্লাস ও স্বস্তির সঙ্গে তাকে স্বাগত জানান। এদিকে বাকি চারজনকে উদ্ধারের প্রস্তুতি চলাকালে সারা রাত পানি নিষ্কাশনের কাজ অব্যাহত থাকে। এতে গুহার ভেতরের পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শনিবারের সম্ভাব্য ঝড়ের আগে এই কাজ উদ্ধার অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৮ সালের থাইল্যান্ড গুহা উদ্ধার অভিযানের অভিজ্ঞ সদস্য ফিনিশ ডুবুরি মিক্কো পাসি বলেন, উদ্ধারকর্মীরা মজা করে বলতেন, পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম যথেষ্ট সফল হলে হয়তো ডুবুরিদের আর দরকারই হবে না। শেষ পর্যন্ত সেটাই ঘটেছে। আরও পড়ুন: ভারত থেকে আম নেয়া কেন নিষিদ্ধ করল জাপান? তিনি বলেন, ‘এটাই ছিল সবচেয়ে ভালো ফলাফল। কারণ শুরু থেকেই পানি পাম্প করে বের করা ছিল মূল পরিকল্পনা এবং এটি ছিল সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। এতে কারও জীবন ঝুঁকিতে পড়েনি। আমরা খুশি যে আর ডুব দিতে হয়নি এবং পাম্পগুলো কার্যকর হয়েছে।’ স্থানীয় সূত্রের মতে, উদ্ধার হওয়া সবাই স্বর্ণের সন্ধানে গুহায় প্রবেশ করেছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাওসের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা, বিশেষ করে চুনাপাথর ও নদী অববাহিকা অঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক স্বর্ণখনি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জীবিকার সীমিত সুযোগ এবং দুর্বল নজরদারির কারণে অনেক মানুষ এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টার জানিয়েছে, মেকং অববাহিকাজুড়ে শত শত অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ ক্ষুদ্র খনির কার্যক্রম চলছে, যেগুলোর অধিকাংশই সরকারি তদারকির বাইরে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি নতুন নয়। ২০২১ সালে সিয়েং খোয়াং প্রদেশে অবৈধ স্বর্ণখনন চলাকালে প্রবল বৃষ্টির কারণে মাটি ধসে সাতজন নিহত হয়েছিলেন। মানবাধিকার সংগঠন ও আঞ্চলিক এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব এবং অনিশ্চিত কৃষিনির্ভর জীবিকা মানুষকে জীবনবাজি রেখে এ ধরনের কাজে নামতে বাধ্য করছে। বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের রেকর্ড বৃদ্ধিও এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বড় অঙ্কের লাভের আশায় অনেকেই বর্ষাকালের মতো বিপজ্জনক সময়েও গভীর ও অরক্ষিত গুহা এবং খনিতে প্রবেশ করছেন। লাওসের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলো এ ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় অবৈধ খনির ঝুঁকি সম্পর্কে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত বিপদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। ফলে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা পাঁচ ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ কর্তৃপক্ষ অবৈধ স্বর্ণ ব্যবসা ও খনন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে আপাতত এসব উদ্বেগের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তাদের বেঁচে ফেরার আনন্দ। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই পাঁচ ব্যক্তি জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো সুযোগ পেলেন বলে মনে করছেন তাদের স্বজন ও উদ্ধারকারীরা। তথ্যসূত্র: সিএনএন
Go to News Site