Somoy TV
মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশ কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা দেড় লাখের একটু বেশি। আর এই ক্ষুদ্র দেশটিই এমন কীর্তি গড়েছে যা পৃথিবীর অনেক জনবহুল ও বৃহৎ রাষ্ট্রের জন্য অধরা স্বপ্ন। আসন্ন বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮ দেশের একটি এই কুরাসাও। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসেই ক্ষুদ্রতম দেশ হতে চলেছে দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরের দেশটি। তাদের এই ঐতিহাসিক কীর্তির পেছনে আছে এমন একটি বিশেষ দিক, যা তাদের গল্পকে আরও অবিশ্বাস্য করে তোলে। কুরাসাওয়ের ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৫ জনের জন্মই দ্বীপটির বাইরে। মাত্র একজনের জন্ম এই ক্যারিবীয় দ্বীপে।এই পরিসংখ্যান সত্যিই চোখে পড়ার মতো। কুরাসাওয়ে জন্ম নেওয়া একমাত্র খেলোয়াড়টি হলেন তাহিথ চং, তিনিও বড় হয়েছেন ইউরোপে। খেলেছেন নেদারল্যান্ডসের অনূর্ধ্ব-২১ দলে। চংয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দুই দেশের সম্পর্ককে সুন্দরভাবে তুলে ধরে। তিনি উইলেমস্ট্যাডে জন্মেছিলেন, কিন্তু ফুটবল ক্যারিয়ারের জন্য শৈশবেই ইউরোপে চলে যান। আর বাদবাকি ২৫ জনের জন্ম হয়েছে নেদারল্যান্ডসে।ফুটবলে উন্নতির জন্য কুরাসাওয়ের ফেডারেশন স্থানীয় একাডেমির অপেক্ষায় না থেকে ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত নেদারল্যান্ডস-প্রবাসী খেলোয়াড়দের দলে নেয়ার পথে হাঁটে, যা একটি দ্রুততর ও কার্যকর কৌশল বলে প্রমাণিত হয়েছে।এর পেছনের ব্যাখ্যা ইতিহাস ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কুরাসাও ২০১০ সাল পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিসের অংশ ছিল এবং এখন এটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ হলেও নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে এর নাগরিকরা ডাচ পাসপোর্ট ধারণ করতে পারে এবং ইউরোপে বসবাস ও উন্নতির সুযোগ পায়। তাই অনেক তরুণের জন্য নেদারল্যান্ডসে যাওয়া প্রায় স্বাভাবিক একটি বিষয়।আরও পড়ুন: চোটে জর্জরিত আর্জেন্টিনা, তালিকায় যোগ হলো আরেক নামএইভাবে গড়ে উঠেছে এমন একটি দল, যেখানে আমস্টারডাম, রটারডাম এবং গ্রোনিনজেনের মতো শহরে জন্ম নেওয়া ফুটবলাররা আছেন। লিয়েন্দ্রো বাকুনা ও জুনিনহো বাকুনা ভাই, রিয়েচেডলি বাজোর, এবং আরমান্দো ওবিস্পোর মতো খেলোয়াড়রা এই ইউরোপ–ক্যারিবীয় সংযোগের উদাহরণ। তারা নেদারল্যান্ডসে বেড়ে উঠেছেন, কিন্তু কুরাসাওয়ের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।এই প্রকল্পের মূল স্থপতি কিংবদন্তি কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের তিনবারের সাবেক কোচ (১৯৯২–৯৪, ২০০২–০৪ এবং ২০১৭) ২০২৪ সালে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এমন খেলোয়াড়দের রাজি করানোর চেষ্টা করেন, যারা ডাচ বয়সভিত্তিক দলে খেললেও সিনিয়র দলে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা কম।অ্যাডভোকাট দ্রুত বুঝতে পারেন সম্ভাবনা কোথায় লুকিয়ে আছে। ইউরোপীয় ফুটবলে তার অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাদের একত্র করেন এবং একটি নতুন দল গড়ে তোলেন, যারা ২০১১ সাল পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস নামে প্রতিযোগিতা করত। ফলাফল ছিল তাৎক্ষণিক, তারা বাছাই পর্বে তাদের গ্রুপে শীর্ষে থেকে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে।চংয়ের গল্প আবারও দুই দেশের সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে। তিনি উইলেমস্ট্যাডে জন্ম নিয়ে ছোটবেলায় নেদারল্যান্ডসে চলে যান এবং সেখানেই ফুটবলের আধুনিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে তিনি নেদারল্যান্ডসের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে (অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত) খেলেও শেষ পর্যন্ত ক্যারিবীয় দেশ কুরাসাওয়ের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। আরও পড়ুন: চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয়ের উল্লাসে পিএসজি সমর্থকদের তাণ্ডব, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষবিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পর কোচিং স্টাফেও নাটকীয় পরিবর্তন আসে। অ্যাডভোকাট পারিবারিক কারণে পদত্যাগ করেন, কিন্তু অস্থায়ী কোচ ফ্রেড রুটেন দলীয় ভারসাম্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হন এবং বরখাস্ত হন। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ অ্যাডভোকাটই আবার দায়িত্বে ফেরেন এবং ৭৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপে দলের কোচ হয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়সী কোচ হওয়ার অপেক্ষায় তিনি।কুরাসাও শুধু জনসংখ্যা বা আকারের দিক থেকেই নয়, বরং একটি অনন্য জাতীয় দল গঠন করেও ইতিহাস গড়েছে। যেখানে প্রায় পুরো দলই নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেয়া খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত। এখন তারা ১৪ জুন বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে জার্মানির বিপক্ষে, গ্রুপ ‘ই’-তে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আছে ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্টও। আগামী ১১ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় বিশ্বকাপের আসর গড়াবে।
Go to News Site