Jagonews24
পরিবারকে নিরাপদ, সুস্থ ও সুখী রাখতে সবাই কমবেশি সচেতন থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিবারের একজন সদস্যের একটি অভ্যাস কখনো কখনো অন্য সবার জন্যও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ধূমপান এমনই একটি অভ্যাস, যার ক্ষতি শুধু ধূমপায়ীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবারের শিশু, নারী, বয়স্ক এবং এমনকি গর্ভের অনাগত সন্তানের ওপরও। তাই একজন ধূমপায়ী মানেই শুধু নিজের নয়, পুরো পরিবারের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া। বিশ্বজুড়ে তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান বা প্যাসিভ স্মোকিংও সমানভাবে ক্ষতিকর। ঘরের ভেতর, বারান্দায়, গাড়িতে বা পরিবারের সদস্যদের কাছাকাছি ধূমপান করলে ধোঁয়ার বিষাক্ত উপাদান অন্যদের শরীরেও প্রবেশ করে। ফলে ধূমপান না করেও অনেক মানুষ তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হন। প্যাসিভ স্মোকিং কী? যখন কোনো ব্যক্তি নিজে ধূমপান না করেও অন্যের সিগারেট, বিড়ি বা তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন, তখন তাকে প্যাসিভ স্মোকিং বা পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়। সিগারেটের ধোঁয়ায় সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক উপাদান থাকে, যার মধ্যে শতাধিক বিষাক্ত এবং অন্তত ৭০টি ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে পরিচিত। একজন ধূমপায়ী যখন ধোঁয়া ছাড়েন, তখন আশপাশের মানুষও সেই ক্ষতিকর উপাদান গ্রহণ করেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা পরিবারে ধূমপানের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় শিশুরা। কারণ তাদের ফুসফুস ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। ফলে ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদান তাদের শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলে। ধূমপানের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা শিশুদের মধ্যে- ঘন ঘন সর্দি-কাশি হতে পারে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে হাঁপানি বা অ্যাজমার সমস্যা তীব্র হতে পারে কানে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে শুধু তাই নয়, গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ধূমপানের পরিবেশে বড় হয়, তাদের ভবিষ্যতে ধূমপানে আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি। আরও পড়ুন: আসক্তির ধোঁয়ায় নিঃশেষ হয় স্বপ্ন আর স্বাস্থ্য ধোঁয়া শুধু ফুসফুস নয়, ক্ষতি করে পুরো শরীরের নারীদের জন্যও বড় হুমকি পরিবারে অনেক নারী নিজে ধূমপান না করলেও স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের ধূমপানের কারণে নিয়মিত ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকেন। এর ফলে হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। গর্ভাবস্থায় পরোক্ষ ধূমপানের কারণে- গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে কম ওজনের শিশু জন্ম নিতে পারে সময়ের আগেই প্রসব হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে শিশুর বিভিন্ন স্বাস্থ্যজটিলতা দেখা দিতে পারে তাই গর্ভবতী নারীর আশপাশে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। বয়স্ক সদস্যরাও নিরাপদ নন পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের অনেকেরই আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা থাকে। ধূমপানের ধোঁয়া এসব রোগের ঝুঁকি ও জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ধোঁয়ার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা, বুকে অস্বস্তি এবং ফুসফুসের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। ‘থার্ড-হ্যান্ড স্মোক’ও বিপজ্জনক অনেকেই মনে করেন, পরিবারের সদস্যদের সামনে ধূমপান না করলেই সমস্যা শেষ। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। ধূমপানের পর ধোঁয়ার ক্ষতিকর কণা কাপড়, পর্দা, সোফা, বিছানা, দেয়াল, কার্পেট ও অন্যান্য আসবাবের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে লেগে থাকতে পারে। এই অবশিষ্ট বিষাক্ত উপাদানকে বলা হয় ‘থার্ড-হ্যান্ড স্মোক’। শিশুরা মেঝেতে খেলাধুলা করে বা বিভিন্ন জিনিস মুখে দেয়। ফলে তারা সহজেই এসব বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শিশুদের জন্য অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয় ধূমপানের ক্ষতি শুধু স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত তামাক কেনার পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়। পাশাপাশি তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা, ওষুধ এবং হাসপাতালে যাওয়ার খরচও পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। একজন ধূমপায়ী হয়তো প্রতিদিন অল্প কিছু টাকা খরচ করছেন বলে মনে করেন, কিন্তু মাস বা বছর শেষে সেই পরিমাণ অর্থ একটি পরিবারের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে কী করবেন? ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করুন। শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের সামনে কখনো ধূমপান করবেন না। গাড়ির ভেতর ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। ধূমপান ছাড়ার জন্য চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা ও উৎসাহ গ্রহণ করুন। তামাকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশ নিন। ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা অনেক ধূমপায়ী মনে করেন, ধূমপান ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর প্রভাব ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে পুরো পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে। একটি সিগারেটের ধোঁয়া শুধু একজন মানুষের ফুসফুসে নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের শরীরেও ক্ষতির ছাপ ফেলে। তাই পরিবারের সুস্থতা, শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং নিজের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনের জন্য ধূমপান ত্যাগের বিকল্প নেই। একজন ধূমপায়ীর ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত শুধু তার নিজের জীবনই বদলে দিতে পারে না, বরং পুরো পরিবারকে একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারে। তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জেএস/
Go to News Site