Jagonews24
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান-মার্কিন যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট সংকট কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, ইরানের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হতাহতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে যার তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছে। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধের ব্যয় ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দাবি করা হয়েছে। এই সামরিক ব্যয় নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে অনেক বিশ্লেষক। এদিকে, দুই দেশের মধ্যে ৬০ দিনের নড়বড়ে যুদ্ধবিরিত চলমান থাকলেও গতকাল পর্যন্ত ইরানের বন্দর আব্বাসে কয়েক দফা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এসব হামলাকে ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এমন যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দাবি করা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে পেন্টাগনের প্রকাশিত হতাহত সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। এক মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা এটিকে ‘হতাহত সংখ্যা গোপনের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টকে পাঠানো রিপোর্টে পরিচিত অনেক হতাহত সেনাসদস্যের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেনি ডিফেন্স ক্যাজিয়্যালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিসিএএস)। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিন যুক্তরাষ্ট্রের নিহত ও আহতের মোট সংখ্যা ছিল ৩৮৫। যুদ্ধবিরতির পর এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে ৪২৮ এ পৌঁছায়। কিন্তু ২১ এপ্রিল কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আহত সেনাসদস্যের সংখ্যা ১৫ জন কমিয়ে মোট হতাহতের সংখ্যা ৪১৩ দেখানো হয়। এরপর থেকে আবার সংখ্যা বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার (২৬ মে) পর্যন্ত মার্কিন সেনা নিহত সংখ্যা একজন বেড়েছে এবং আহতের সংখ্যা ৪০৯-এ পৌঁছেছে। এতে মোট হতাহতের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৪২৩ জনে। মার্কিন নেভাল সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম জানিয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালে ১৩ জন সেনাসদস্য যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন এবং একজন সেনাসদস্য যুদ্ধবহির্ভূত চিকিৎসাজনিত কারণে মারা যান। তবে, পেন্টাগনের প্রকাশিত নিহতদের তালিকায় একজন সেনার নাম না থাকা নিয়ে সন্দেহ আরও দানা বাঁধে। ওই সেনা সদস্যের নাম সোরফ্লি দাভিয়োস। নিউইয়র্ক আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের এই কর্মকর্তা ৬ মার্চ কুয়েতের ক্যাম্প বুহেয়ারিং ঘাঁটিতে দায়িত্ব পালনকালে আকস্মিক অসুস্থতায় মারা যান বলে জানা যায়। তার মৃত্যু বিভিন্ন সরকারি ও সামরিক অনুষ্ঠানে স্বীকৃত হলেও আনুষ্ঠানিক হতাহতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিসিএএস যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরের মৃত্যুর হিসাব রাখলেও যুদ্ধবহির্ভূত (নন কমব্যাট) আহত বা অসুস্থ সেনাসদস্যদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেনি। উদাহরণ হিসেবে মার্চে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড-এ আগুন লাগার ঘটনায় ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট ও আঘাতপ্রাপ্ত ২০০ জনের বেশি সেনার তথ্য সরকারি হিসাবের বাইরে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এ দায়িত্ব পালনকালে আহত হওয়া এক নাবিকের ঘটনাও আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, এই যুদ্ধটি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, সময়ের চাকা পেছনে ফেরে না এবং এই অঞ্চলের দেশ ও ভূখণ্ড আর মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ঢাল হিসেবে কাজ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন আর এ অঞ্চলে নিরাপদ সামরিক ঘাঁটি বা আগ্রাসনের স্থান অবশিষ্ট নেই। তারা প্রতিদিনই তাদের আগের অবস্থান থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশকিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর প্রতিবাদে ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান। এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়া ১৩ এপ্রিল হরমুজে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। এরপর আরেক দফা যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ান ট্রাম্প। এরপর গত ২৪ মে দুই দেশের মধ্যে আরও ৬০ দিনের যুদ্ধ বিরতি হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছিল মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওস। ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন। কেএম
Go to News Site