Collector
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এখন কতটা নিরাপদ? | Collector
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এখন কতটা নিরাপদ?
Jagonews24

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এখন কতটা নিরাপদ?

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শেয়ারবাজার মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ফলে, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা এখন বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় জুড়ে মন্দা থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অবমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে। এমনকি সার্বিক বাজারও এক প্রকার অবমূল্যায়িত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক মূল্য আয় অনুপাত (পিই) ৯-এর নিচে নেমে গেছে। সার্বিকভাবে শেয়ারবাজার অবমূল্যায়িত থাকলেও কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম বর্তমানে অতিমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে। মন্দার মধ্যেও এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম সম্প্রতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি নির্ণয়ের অন্যতম একটি হাতিয়ার মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও। সাধারণত ১০-১৫ পিই-কে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত ধরা হয়। আর কোনো কোম্পানির পিই ১০-এর নিচে চলে গেলে, ওই কোম্পানির শেয়ারের দাম অবমূল্যায়িত বা বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ধরা হয়। সে হিসেবে বর্তমান শেয়ারবাজার বিনিয়োগের জন্য অনেকটাই উপযুক্ত। তবে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শেয়ারবাজারের কোনো বিনিয়োগকেই নিরাপদ বলা যায় না। অবশ্য বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ বিনিয়োগ জ্ঞান থাকলে শেয়ারবাজার থেকে ভালো মুনাফা করা সম্ভব। সঠিক সময়ে সঠিক কোম্পানি বাছাই করে বিনিয়োগ করতে পারলে ভালো মুনাফা পাওয়া যায়। একইভাবে ভুল সময়ে ভুল কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করলে লোকসানের মধ্যে পড়তে হয়। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিত সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া। পিই বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ যেসব খাত এদিকে, সার্বিক শেয়ারবাজার অবমূল্যায়িত অবস্থায় থাকলেও পিই বিবেচনায় কয়েকটি খাতের প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে সিরামিক খাত। এই দুই খাতের পিই বর্তমানে ৩৮৮ এর ওপরে রয়েছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমানে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্য আয় অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬১ পয়েন্ট। সার্বিক বাজারের থেকেও কম মূল্য আয় অনুপাত রয়েছে দুটি খাতের। এছাড়া, আরও দুটি খাতের মূল্য আয় অনুপাত ১০ এর নিচে রয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে কম পিই রয়েছে ব্যাংক খাতের। এই খাতের পিই রয়েছে ৪ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে। পরের অবস্থানে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এই খাতের পিই ৫ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট। মিউচুয়াল ফান্ড খাতের পিই ৮ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট। এছাড়া, ওষুধ খাতের পিই ৯ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট। আরও পড়ুন সাধারণ বিমায় ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া, আটকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকামেঘনা পেট শেয়ারবাজারের নতুন ‘সোনার হরিণ’, নাকি ফাঁদের ইশারা? বাকি খাতগুলোর পিই ১০-এর ওপরে। এর মধ্যে আর্থিক খাতের পিই ১০ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট, প্রকৌশল খাতের পিই ১০ দশমিক ৪৫, চামড়া খাতের পিই ১১ দশমিক ৪৫, সিমেন্ট খাতের পিই ১২ দশমিক ৫০, টেলিকম খাতের পিই ১৩ দশমিক শূন্য ৬, সেবা ও আসাবন খাতের পিই ১৩ দশমিক ৪৭, বস্ত্র খাতের ১৩ দশমিক ৫৭, বিমা খাতের পিই ১৪ দশমিক ২৯ এবং বিবিধ খাতের পিই ১৪ দশমিক ৯৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে। বাকি খাতগুলোর পিই ১৫-এর ওপরে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি পিই সিরামিক খাতের। এই খাতের পিই ৩৮৮ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট। সর্বোচ্চ পিইর তালিকায় এর পরের স্থানে রয়েছে কাগজ ও মুদ্রণ। এই খাতের পিই ২৭ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট। এছাড়া, পাট খাতের ২৪ দশমিক ৯৭, তথ্য প্রযুক্তির ২১ দশমিক শূন্য ৪, খাদ্যের ১৭ দশমিক ১৪ এবং ভ্রমণ খাতের পিই ১৬ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে। শুধু পিই দেখেই বিনিয়োগ নয়, মৌলভিত্তি যাচাই জরুরি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র পিই (প্রাইস-আর্নিংস) রেশিও দেখে নেওয়া যায় না। পিই রেশিও বিনিয়োগ মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগের আগে তার আর্থিক অবস্থা, নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি), ব্যবসার সম্ভাবনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স, উদ্যোক্তা ও মালিকানার কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সামগ্রিক পিই রেশিও বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কম, যা বাজারকে আকর্ষণীয় বলে মনে করাতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের কিছু শেয়ার পিই রেশিওর বিচারে অনেক সস্তা বা আন্ডারভ্যালুড বলে মনে হয়। তবে শুধু সামগ্রিক পিই দেখে পুরো বাজারকে বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। রিচার্ড ডি রোজারিওর মতে, দেশের পুঁজিবাজারে এখনও পর্যাপ্ত সংখ্যক শক্তিশালী মৌলভিত্তি সম্পন্ন (ফান্ডামেন্টাল) কোম্পানির অভাব রয়েছে। বাজারে আরও বড় ও ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রয়োজন। কারণ বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বিদেশি বিনিয়োগকারী বাজারে এলে তাদের বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন শেয়ার সবসময় পাওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, বাজারের গড় পিই কম হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় মূলধনী কোম্পানির প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু, একইসঙ্গে বাজারে এমন অনেক কোম্পানিও রয়েছে, যেগুলোর শেয়ারের দাম তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি। তাই শুধু পিই রেশিও দেখে যে কোনো শেয়ারে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। বরং, যেসব কোম্পানির ব্যবসায়িক ভিত্তি শক্তিশালী এবং মূল্যায়ন যৌক্তিক, সেসব শেয়ার দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দিতে পারে। এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কতোটা নিরাপদ? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শেয়ারবাজার কখনোই পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশ্বজুড়েই শেয়ারবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ শেয়ারের দাম প্রতিদিনই ওঠানামা করে এবং অনেক সময় স্বল্পমেয়াদে এর পেছনে দৃশ্যমান কোনো কারণও থাকে না। তবে, বিনিয়োগকারীরা মূলত কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনার ওপর আস্থা রেখেই শেয়ার কেনেন। তিনি আরও বলেন, সঠিক কোম্পানি বাছাই করে, পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করা গেলে শেয়ারবাজার এখনও বিনিয়োগের একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র। তবে, বিনিয়োগের আগে কোম্পানির মৌলভিত্তি ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। কোম্পানি বাছাই করে বিনিয়োগে ভালো লাভের সম্ভাবনা ডিএসইর এক সদস্য বলেন, বাজারের সার্বিক পিই এখন সাড়ে ৮ এর কাছাকাছি। সাধারণত এমন পিই-কে বিনিয়োগ উপযুক্ত মনে করা হয়। তবে এই বাজারে সব বিনিয়োগ যে নিরাপদ সেটা বলা যাবে না। তবে, আর্থিক অবস্থা এবং লভ্যাংশের অতীত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বর্তমানে অনেক কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগ উপযুক্ত। এসব কোম্পানি বাছাই করে বিনিয়োগ করতে পারলে ভালো লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আরও পড়ুন শেয়ারবাজারে বাড়ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীসবুজ ধারায় ঈদের বিরতিতে পুঁজিবাজার তিনি বলেন, সার্বিকভাবে দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে মন্দা চললেও সম্প্রতি কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এই ধরনের শেয়ারের বিনিয়োগ করে যেমন দ্রুত অধিক মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তেমনি বড় লোকসানের মধ্যেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের শেয়ার ট্রেডের (লেনদেন) জন্য উপযুক্ত, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য না। বিনিয়োগের জন্য মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার বেছে নেওয়া উচিত। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভীর মতে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার পিই। তবে শুধু পিই দিয়েই সবকিছু বিচার করা সম্ভব না। কারণ পিই নির্মাণ করা হয় বর্তমান দাম ও আয়ের ভিত্তিতে। কোনো কারণে আয় কমে গেলে এবং দাম অপরিবর্তিত থাকলে পিই বেড়ে যাবে। আবার আয় বেড়ে গেলে এবং দাম অপরিবর্তিত থাকলে পিই কমে যাবে। তিনি বলেন, সাধারণতা কোনো কোম্পানির শেয়ারের পিই ১০ এর নিচে থাকলে সেই শেয়ার বিনিয়োগ উপযুক্ত মনে করা হয়। তবে এর সঙ্গে কোম্পানির পারিপার্শিক অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করে বিনিয়োগ করা উচিত। কোম্পানির ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে কারা আছেন, লভ্যাংশের অতীত ইতিহাস কেমন, বর্তমান আর্থিক অবস্থা কেমন সবকিছু ভালো করে পর্যালোনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এমএএস/এএমএ

Go to News Site