Jagonews24
আইয়ুববিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিলেন তোফায়েল আহমেদ। বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের প্রতিটি বাঁকে জড়িয়েছেন নিজেকে। ক্রমে হয়ে উঠেছেন নেতৃস্থানীয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিক ও বিশিষ্ট মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্ষীয়ান এ রাজনীতিকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও স্মৃতিচারণ করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন অনেকে। তারা তার এ প্রয়াণকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান এবং আওয়ামী লীগের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। ‘বাংলাদেশের রাজনীতির একটা কিংবদন্তি অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও অকুতোভয় সৈনিক তোফায়েল আহমেদ। তারুণ্যের দীপ্তি, সাহস আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনি নিজের নাম অমর করে রেখে গেছেন’—বলছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক নঈম নিজাম। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট নিয়ে আক্ষেপও ঝরে তার কণ্ঠে। এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘কিন্তু ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস—যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি (তোফায়েল আহমেদ) জীবনভর লড়লেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাকে বিদায় নিতে হলো গ্রেফতারি পরোয়ানার বোঝা মাথায় নিয়ে! এই দৃশ্যটা শুধু একজন রাজনীতিবিদের নয়, বরং আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি আর জাতীয় বিবেকের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।’ আহা, তোফায়েল ভাই! ৬৯-এর সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। পাকিস্তানের একদিকে আইয়ুব খান আর একদিকে আপনি। মাঝখানে কেউ নেই! আপনার ঋণ কোনোদিন ভুলবো না।—মাহবুব কামাল নঈম নিজামের ভাষ্য, ‘মানুষের সঙ্গে মতের অমিল বা রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে মনে রাখবে। আমরা আসলে একটা প্রশ্নবিদ্ধ সময়ের সাক্ষী হয়ে রইলাম।’ ‘ঘরে-বাইরে বা জাতীয়ভাবে যদি কোনো অবহেলা হয়ে থাকে, তবে ইতিহাস যেন তাকে ক্ষমা করে। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন’—যোগ করেন তিনি। আরও পড়ুনথামলো রাজপথ কাঁপানো সেই কণ্ঠস্বর তোফায়েল আহমেদের এই চলে যাওয়া নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক ও সাংবাদিক আনিসুল হকও। তিনি নিজের ফেসবুক পেজে তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে লেখেন, ‘তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। রাজ্যের ফোন নম্বর মুখস্থ ছিল, নোটবুক না দেখে ফোন করতে পারতেন। দেখা হলে আগে সালাম দিতেন। বলতেন, মেরিনা কেমন আছেন! তাকে সালাম দিও। মেরিনাকে বলতেন, আনিস কেমন আছেন, আমার সালাম দেবেন।’ ‘তোফায়েল আহমেদের কথা বলছি। এদেশটা যে আমরা পেয়েছি, তার পেছনে বহু মানুষের অবদান আছে, বহু মানুষের আত্মত্যাগ আছে। তোফায়েল আহমেদ তাদের একজন। তার মৃত্যুতে শোক ও শ্রদ্ধা জানাই’—লেখেন আনিসুল হক। তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোর ছবি ভেসে উঠে সাংবাদিক মাহবুব কামালের চোখে। সেসব দিনের অমলিন স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আহা, তোফায়েল ভাই! ৬৯-এর সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। পাকিস্তানের একদিকে আইয়ুব খান আর একদিকে আপনি। মাঝখানে কেউ নেই! আপনার ঋণ কোনোদিন ভুলবো না।’ তোফায়েল আহমেদের স্নেহধন্য হতে পারার দিনগুলোকে স্মরণ করেন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আঙ্গুর নাহার মন্টি। তার কথায়—‘যেন একে একে নিভে যাচ্ছে দেউটি! আওয়ামী লীগের এই চরম দুঃসময়ে আজ চলে গেলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ আঙ্কেলও। আব্বুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও সুহৃদ হিসেবে স্কুল-কলেজ জীবনেই তাকে বহুবার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।’ ‘পরে সাংবাদিকতা পেশায় এসে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সূত্রে পাওয়া অসীম স্নেহের সম্পর্কগুলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়েছিলাম। তবু তার আন্তরিকতা ও মমতা কখনো মুছে যায়নি। কূটনৈতিক অঙ্গনে মাঝে মাঝে দেখা হলে তা টের পেতাম।’ ‘তোফায়েল আহমেদকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তবু ইতিহাস-বিস্মৃত প্রজন্মের জন্য কিছুটা বলা জরুরি। তিনি ছিলেন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক, শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার অন্যতম উদ্যোক্তা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, ‘মুজিব বাহিনী’র প্রধান অধিনায়কদের একজন এবং নয়বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য।’ ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস—যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি জীবনভর লড়লেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাকে বিদায় নিতে হলো গ্রেফতারি পরোয়ানার বোঝা মাথায় নিয়ে! এই দৃশ্যটা শুধু একজন রাজনীতিবিদের নয়, বরং আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি আর জাতীয় বিবেকের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।—নঈম নিজাম ‘এমন এক সময়ে তিনি চিরবিদায় নিলেন, যখন ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ তার ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে যিনি ছিলেন নেতৃত্ব ও সাহসের প্রতীক, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাকেও দেখতে হয়েছে দলের অভূতপূর্ব বিপর্যয়।’ আঙ্গুর নাহার মন্টি আরও বলেন, ‘তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়া শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। আর নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক দল আওয়ামী লীগের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আল্লাহ তোফায়েল আঙ্কেলকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। আপনাকে স্যালুট বীর মুক্তিযোদ্ধা!’ সোমবার বিকাল ৩০টা ৩০ মিনিটে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানান জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তোফায়েল আহমেদের বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি এক কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন তোফায়েল আহমেদ। তিনি আইসিইউ সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, সোমবার বাদ মাগরিব ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তোফায়েল আহমেদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাতে তার মরদেহ রাখা হবে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে। মঙ্গলবার শেষবারের মতো জন্মভিটা ভোলায় নেওয়া হবে। সেখানে বাদ জোহর ভোলা জেলা স্কুল মাঠে জানাজা হবে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে তাকে। আরও পড়ুনতোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন‘রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নাই, এ কথা বলা এখন খুব কঠিন’ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর আজহার আলী ও ফাতেমা খানমের ঘর আলো করে তোফায়েল আহমেদের জন্ম। ছাত্রজীবনে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর ভর্তি হন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ব্রজমোহন কলেজে স্নাতক শেষে তোফায়েল ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে করেন স্নাতকোত্তর। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছিল ষাটের দশকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি এবং পরবর্তীতে ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তৎকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার কণ্ঠস্বর কাঁপিয়ে দিয়েছিল শাসকের ভিত। তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়া শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। আর নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক দল আওয়ামী লীগের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।—আঙ্গুর নাহার মন্টি ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। সেদিনই এই একটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে তার নাম ইতিহাসের পাতায় চিরতরে খোদাই হয়ে যায়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন তোফায়েল আহমেদ। ঊনসত্তরেই তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ডাকসুর ভিপি থাকাকালে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্যে। পরের বছরের ২ জুন শেখ মুজিবের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শুরু হয় তার পথচলা। তোফায়েল আহমেদ মোট নয় বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচেন ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হয়ে ৮০ বছর বয়সেও জয়ের মালা গলায় পরেন দাপুটে এ রাজনীতিক। এসইউজে/এমকেআর
Go to News Site