Collector
কাজিনকে বিয়ে করার আগে জানুন এই সত্য | Collector
কাজিনকে বিয়ে করার আগে জানুন এই সত্য
Jagonews24

কাজিনকে বিয়ে করার আগে জানুন এই সত্য

বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তিন বোন। ঘরের এক কোণে বিউটিশিয়ান চুল সাজিয়ে দিচ্ছেন, অন্যদিকে চলছে হাসি-আড্ডা আর গল্পের ঝড়। পরিবারের আরেকটি বিয়েতে যোগ দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন তারা। তবে এই বিয়েটিকে অন্যসব বিয়ে থেকে আলাদা করে তুলেছে একটি বিষয়, সেটি হচ্ছে বর ও কনে সম্পর্কে ফার্স্ট কাজিন। যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরের কিছু পরিবারে এমন বিয়ে এখনও বেশ পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য এই দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রথাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এক পরিবারের তিন বোন, তিন রকম ভাবনা সবচেয়ে বড় বোন আয়েশা কয়েক বছর আগে নিজের ফার্স্ট কাজিনকে বিয়ে করেছেন। দুই সন্তানের মা তিনি। তার কাছে সেই সিদ্ধান্ত ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যেরই অংশ। বড় হয়ে ওঠার পরিবেশে কাজিনকে বিয়ে করা কখনও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু একই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেছে। ছোট বোন সালিনা নিজের পছন্দে পরিবারের বাইরের একজনকে বিয়ে করেছেন। তার মতে, শিক্ষা, কর্মজীবন এবং বৃহত্তর সামাজিক যোগাযোগ তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ফলে আগের মতো পারিবারিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার প্রবণতা কমছে। মাঝের বোন মালিকাও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি পরিবারের ভেতরে বিয়ে করবেন না। তার বিশ্বাস, বর্তমান সময়ে নারীদের সামনে জীবনের পথ অনেক বিস্তৃত, তাই সিদ্ধান্তও হওয়া উচিত ব্যক্তিগত পছন্দ ও সচেতনতার ভিত্তিতে। গবেষণায় উঠে আসছে নতুন প্রশ্ন ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে ব্র্যাডফোর্ডে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণা বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ নামের গবেষণায় ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ১৩ হাজারেরও বেশি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের বাবা-মা ছিলেন ফার্স্ট কাজিন। গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রক্তসম্পর্কিত বাবা-মায়ের সন্তানদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে বংশগত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ভাষাগত বিকাশে বিলম্ব, শৈশবের উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে থাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হারও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানদের মধ্যে বংশগত রোগের ঝুঁকি প্রায় ৬ শতাংশ, যেখানে অন্যান্য দম্পতির সন্তানদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩ শতাংশ। আরও পড়ুন: পিরিয়ডের রক্তেই মিলতে পারে লুকিয়ে থাকা নানা রোগের ইঙ্গিত ব্রণের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে মানসিক চাপ পেট ফাঁপা? ঘরেই আছে সমাধান শুধু কাজিন বিয়ে, নাকি আরও বড় কোনো কারণ? তবে সব গবেষক একমত নন যে সমস্যার একমাত্র কারণ কাজিনদের মধ্যে বিয়ে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এখানে ‘এন্ডোগামি’ বা দীর্ঘদিন ধরে একই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ে হওয়ার প্রবণতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি গোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিয়ে হলে নির্দিষ্ট জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বা রোগের বাহক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকিকে শুধুমাত্র ফার্স্ট কাজিন বিয়ের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না বলে মনে করেন তারা। ইউরোপে আইন, ব্রিটেনে বিতর্ক স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কারণে ইউরোপের কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নরওয়ে ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে এবং সুইডেনও একই পথে এগোচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত সরকার নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যায়নি। বরং ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং স্বাস্থ্যশিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবর্তনের পথে নতুন প্রজন্ম ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পরিবারগুলোতেও ধীরে ধীরে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। গবেষণা বলছে, গত দুই দশকে ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং সামাজিক যোগাযোগের বিস্তার। আজকের তরুণরা আগের চেয়ে বেশি মানুষকে জানছে, নতুন সম্পর্ক তৈরি করছে এবং বিয়ের সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ঐতিহ্য বনাম সচেতনতা কাজিনদের মধ্যে বিয়ে নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি প্রশ্ন-একদিকে পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ। অনেক পরিবার এখনও এই প্রথাকে স্বাভাবিক বলে মনে করে। আবার অনেকে মনে করেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জেনে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যাডফোর্ডের সেই তিন বোনের গল্পও যেন একই বার্তা দেয়-সমাজ বদলাচ্ছে, চিন্তাধারা বদলাচ্ছে, কিন্তু পরিবর্তনের পথটি ধীরে ধীরেই তৈরি হয়। আর সেই পথের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে শিক্ষা ও সচেতনতা। তথ্যসূত্র: বিবিসি জেএস/

Go to News Site