Jagonews24
পানির অক্সিজেন, লবণাক্ততা সেন্সরের মাধ্যমে মনিটরিং স্মার্ট ফিডিং ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা অ্যাপভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ আবহাওয়া ও জলবায়ু ঝুঁকির আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জলবায়ু সহনশীল মাছচাষ ও সম্প্রসারণে বিশ্বব্যাংকের ঋণ বেড়ে হচ্ছে শত কোটি টাকা। ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মাছের উৎপাদন বাড়ানো হবে ২০ শতাংশ। ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি এক বছর সময়ও বাড়ছে এ প্রকল্পের। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটি অক্টোবর ২০২১ সালে শুরু হয়ে জুন ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন করে মেয়াদ বেড়ে হচ্ছে জুন ২০২৭ সাল। প্রথমে প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১০৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরে দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৯০ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ছিল ৭৬ কোটি টাকা এবং সরকারি অর্থায়ন ১৪ কোটি টাকা। নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ বেড়ে ১০০ কোটি টাকা হয়েছে। বাকি অর্থায়ন সরকারি কোষাগার থেকে মেটানো হবে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৮০ শতাংশ। মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, প্রকল্পটি ১৮টি জেলার ৩০ উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। জেলাগুলো হলো- নরসিংদী, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার, যশোর, নড়াইল, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিলেট, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম। প্রকল্পের উদ্দেশ্য নির্ধারিত সাব-প্রজেক্ট এলাকায় জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে মাছের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য জলবায়ু সহনশীল মৎস্যচাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মাছের উৎপাদন ২০ শতাংশ বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব সাপ্লাই চেইন ও বাজার নেটওয়ার্ক প্রসারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং স্টেকহোল্ডারদের জীবিকায়নের মানোন্নয়নসহ টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ানো। ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্পের অগ্রগতি ৮০ শতাংশ। বাকি কাজ সম্পন্ন ও ব্যয় বাড়ার কারণে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন হচ্ছে।’ দেশে কিছু জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসব এলাকায় জলবায়ু সহনশীল মাছচাষ প্রযুক্তি ও মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন করা হবে। মাছের বাজারে মিনি প্রসেসিং ইউনিট নির্মাণ করা হবে। এসব কারণেই মূলত প্রকল্প সংশোধন হচ্ছে।’ মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, নানা কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ছাড়াও ছোট-বড় ৫০টিরও বেশি নদ-নদী এর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই দেশটি পৃথিবীর মধ্যে জলবায়ু অরক্ষিত দেশ হিসেবে পরিচিত। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রের উচ্চ জোয়ারে একদিকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কৃষি ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হয়, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে দেশটির উত্তরাঞ্চলসহ অনেক এলাকা খরার কবলে পড়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়। প্রতিবছর বন্যা, খরা ও লবণপানির অনুপ্রবেশের ফলে বাংলাদেশের আবাদযোগ্য জমির উল্লেখযোগ্য এলাকা উৎপাদনের বাইরে চলে যায়। ফলে কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সমস্যার নিরসনে বাংলাদেশ সরকার উপকূলীয় জেলাসহ দেশের নদী অববাহিকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অপেক্ষাকৃত নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও লবণপানির অনুপ্রবেশ রোধে বাঁধ নির্মাণ করছে। বর্তমান জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯টি এবং পানি নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো/স্লুইচগেট স্থাপন করেছে, যা পোল্ডার নামে পরিচিত। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড লিড এজেন্সি হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সহযোগী সংস্থা হিসেবে প্রকল্পটি নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রম জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিভিত্তিক মাছচাষ প্রদর্শনী খামার স্থাপন হবে ২ হাজার ৩৫০টি, বিল নার্সারি ১৮৫টি, অভয়াশ্রম স্থাপন ও বছর বছর রক্ষণাবেক্ষণ ৫৫টি, আবাসস্থল উন্নয়নের জন্য জলাশয় পুনঃখনন ৬৮ হেক্টর, মাছের পোনা অবমুক্ত ১৫০ মেট্রিক টন, বিকল্প কর্মসংস্থান কার্যক্রমের আওতায় উপকরণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ১০০ জনকে। আরও পড়ুন বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করবেন যেভাবেবর্ষাকালে মাছ চাষে যেসব পদক্ষেপ নেবেনযে পদ্ধতিতে পাবদা মাছ চাষে বেশি লাভবান হওয়া যায়অল্প জায়গা-কম খরচে রাস পদ্ধতিতে মাছ চাষ এছাড়া সুফলভোগীদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার জাল বিতরণ ৫০টি, সুফলভোগীদের মাছ পরিবহনের জন্য ইনসুলেটেড বক্স বিতরণ ১৪৫০টি, মিনি ফিশ প্রসেসিং ইউনিটসহ বিদ্যমান বাজারের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ১৪টি, শুঁটকি প্রযুক্তি প্রদর্শনী স্থাপন ২৬টি, দেশীয় কাঠের নৌকা বিতরণ ২৯টি, মাঠ দিবস ৩০০টি প্রভৃতি। প্রকল্প সংশোধনের কারণ নানা কারণে প্রকল্পটি সংশোধন করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রকল্পের মেয়াদ। ব্যয় বাড়ছে ২৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। জলবায়ু সহনশীল মাছচাষ প্রযুক্তি প্রদর্শনী, সুফলভোগী প্রশিক্ষণ, পোনা মাছ অবমুক্ত, সুফলভোগীদের মধ্যে বিকল্প কর্মসংস্থান উপকরণ বিতরণ ও আনুপাতিক হারে ব্যয় বাড়ছে। প্রকল্প এলাকার ভূ-প্রকৃতি অনুসারে ধানক্ষেতে মাছচাষ প্রদর্শনী নতুন কার্যক্রম প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বাদ দেওয়া হয়েছে পুকুরে গলদা উৎপাদন প্রদর্শনী কার্যক্রম প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং ইনসুলেটেড ভ্যান বিতরণ খাতটি। মাছের খাদ্য তৈরির মেশিন বিতরণ কার্যক্রম, প্যাডল হুইল এরেটর বিতরণ কার্যক্রম প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তকরণ করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর ও মাঠ দিবসের সংখ্যা বৃদ্ধি, অভয়াশ্রম স্থাপনের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিল নার্সারি স্থাপনের সংখ্যা বৃদ্ধি, স্থানীয় মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মীর মাসিক ভাতা বৃদ্ধি বাড়ানো হয়েছে সংশোধিত প্রস্তাবনায়। কিছু ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন পরিকল্পনা কমিশনে মৎস্য অধিদপ্তর প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। তবে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের কিছু বিষয়ের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ‘ধানক্ষেতে মাছচাষ প্রদর্শনী স্থাপন’ খাতে ৬০ লাখ, ‘পুকুরে গলদা উৎপাদন প্রদর্শনী স্থাপন’ খাতে ১০ লাখ টাকা, ‘মাছের খাদ্য তৈরির মেশিন বিতরণ’ খাতে ৩ কোটি সাড়ে ১০ লাখ টাকা, ‘প্যাডল হুইল এরেটর বিতরণ’ খাতে ৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অর্থায়নে ‘বৈদেশিক প্রশিক্ষণ’ খাতে ৮৫ লাখ টাকা নতুন করে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে জানায় কমিশন। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে চালকের ওভারটাইম, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ফি, গ্যাস ও জ্বালানি, জিপ, পিকআপ, মাইক্রোবাস, টেলিফোন সেট ও ইনসুলেটেড ভ্যান বিতরণ প্রকল্প থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাদ দেওয়ার ফলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে কি না সে বিষয়ে জানা প্রয়োজন বলে জানায় কমিশন। জিপ, পিকআপ, মাইক্রোবাস বাদ দেওয়া হলেও পেট্রোল, অয়েল ও লুব্রিকেন্ট খাতে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাখা কেন হয়েছে জানতে চেয়েছে কমিশন। প্রকল্পে ‘পরামর্শক সেবা’ খাতে ১০৯ জনমাসের স্থলে বাড়িয়ে ১৪৭ জনমাস এবং ব্যয় অতিরিক্ত আরও ১২ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন কোনো পরামর্শক নিয়োগ করা হবে কি না, এসব বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে বলে জানায় কমিশন। দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে ‘মাঠ দিবস’ অংশে অতিরিক্ত আরও ৪৮ লাখ টাকা, ‘মৎস্য আইন বাস্তবায়ন’ অংশে অতিরিক্ত আরও ২৯ লাখ টাকা, ‘অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর’ খাতে অতিরিক্ত আরও ৩১ লাখ টাকা, ‘লিফ শ্রমিক মজুরি’ খাতে অতিরিক্ত আরও ১৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং গার্ডসহ মৎস্য অভয়াশ্রম মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অতিরিক্ত আরও ৪৯ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের (বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উইং) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্পের বেশ কিছু ব্যয়ের বিষয়ে আমরা প্রশ্ন করেছি। আবার কিছু ব্যয়ের বিষয়ে আমরা সম্মতি দিয়েছি। তবে এখনো পিইসি সভার রেজ্যুলেশন বের হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ’ খাতে ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকার সংস্থান ছিল, যা মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রশিক্ষণের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ উক্ত খাতে অতিরিক্ত আরও ২ কোটি ৬০ লাখ ৭১ হাজার টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দ্বিতীয় সংশোধনীতে ‘জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন প্রযুক্তি স্থাপন’ অংশে অতিরিক্ত আরও ৪ কোটি ৭৯ লাখ, ‘পোনা মাছ অবমুক্তকরণ’ অংশে অতিরিক্ত আরও ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, বিল নার্সারি/আবাসস্থল উন্নয়নের জন্য জলাশয় পুনঃখননের লক্ষ্যে অতিরিক্ত আরও ২১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে কিছু বিষয়ে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এমওএস/এএসএ
Go to News Site