Collector
কেজিতে বিক্রি হচ্ছে লিচু, লাভ নাকি ক্ষতি | Collector
কেজিতে বিক্রি হচ্ছে লিচু, লাভ নাকি ক্ষতি
Jagonews24

কেজিতে বিক্রি হচ্ছে লিচু, লাভ নাকি ক্ষতি

• কেজিতে নিলে সংখ্যায় কম আসে বড় লিচু• সাধ্যের মধ্যে অল্প পরিমাণ কিনতে পারছেন ক্রেতারা• ঝরে পড়া লিচু বিক্রির সুবিধা জ্যৈষ্ঠ মানেই মধুমাস। আর মধুমাসের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলগুলোর একটি লিচু। রসালো, সুগন্ধি ও স্বাদে অনন্য এই ফলের জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে মানুষ। কিন্তু বাজারে এর রাজত্ব খুব বেশি দিনের নয়। মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের এই স্বল্প সময়েই জমে ওঠে কোটি টাকার বাণিজ্য। আর সেই বাজারেই এখন দেখা দিয়েছে নতুন এক প্রবণতা- লিচু বিক্রি হচ্ছে কখনো গুনে আবার কখনো কেজি দরে। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। কেজির এই হিসাব আসলে কার জন্য লাভজনক? সরেজমিনে বগুড়া শহরের স্টেশন রোড, কাটালতলা, চেলোপাড়া, কোট চত্বর ও প্রেসক্লাব এলাকার বিভিন্ন ফলের দোকান ঘুরে দেখা যায়, আগে যেখানে লিচু শতক বা পিস হিসেবে বিক্রি হতো, সেখানে এখন অধিকাংশ দোকানেই কেজি দরে বিক্রির প্রচলন বেড়েছে। কোনো কোনো দোকানে দুই পদ্ধতিই চালু রয়েছে। তবে নতুন এই বিক্রয় পদ্ধতি নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদল মনে করছেন কেজিতে কেনা সুবিধাজনক, অন্যদিকে অনেকেই এটিকে ক্রেতাদের জন্য ক্ষতির কারণ বলে মনে করছেন। আরও পড়ুন- দিনাজপুরে জমতে শুরু করেছে লিচুর বাজারখাগড়াছড়িতে লিচুর সমারোহ, কম দামে মিলছে রসালো ফললিচুর ভারে ভেঙে পড়ছে ডাল, ঈশ্বরদীতে রেকর্ড ফলন স্টেশন রোডে লিচু কিনতে আসা আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমি কয়েকবার লিচু কিনেছি। কেজি আর শ’ দুই ভাবেই নিয়েছি। আমার মনে হয়েছে কেজিতে কিনলে লস হয়।’ কেন এমন মনে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেজিতে নিলে দেখা যায় ৩০ থেকে ৪০টা লিচু ধরে। সাইজও বড় হয়। কিন্তু শ’ হিসেবে নিলে বেশি পাওয়া যায়। আমার কাছে শ’ হিসেবে নেওয়াটাই লাভজনক মনে হয়।’ ‘কেজিতে নিলে দেখা যায় ৩০ থেকে ৪০টা লিচু ধরে। সাইজও বড় হয়। কিন্তু শ’ হিসেবে নিলে বেশি পাওয়া যায়। আমার কাছে শ’ হিসেবে নেওয়াটাই লাভজনক মনে হয়।’ তার মতে, শতক হিসেবে কিনলে লিচুর সতেজতা ও মান যাচাই করাও সহজ হয়। পচা বা পোকাধরা লিচু থাকার সম্ভাবনাও কম থাকে। শুধু আনিসুর রহমান নন, এমন অভিযোগ আরও অনেক ক্রেতার। তাদের দাবি, কেজি দরে বিক্রির ফলে ছোট-বড় লিচু একসঙ্গে মিশিয়ে ওজন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে এক কেজিতে ঠিক কতটি লিচু মিলবে, তা আগে থেকে বোঝা যায় না। একই সঙ্গে ওজনে কারচুপির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ক্রেতাদের মতে, কেজি হিসাবে লিচু কিনলে আসলে ফলের শাঁসের পাশাপাশি খোসা ও আঁটির ওজনেরও মূল্য পরিশোধ করতে হয়। অথচ ভোক্তার মূল আগ্রহ থাকে শাঁসের প্রতি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ভোগ্য অংশের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এছাড়া উন্নত জাতের বড় আকারের লিচু যেমন বোম্বাই বা চায়না থ্রি কেজিতে তুলনামূলক কম পড়ে। ফলে একই ওজনে ক্রেতা সংখ্যাগতভাবে কম লিচু পাচ্ছেন। বিপরীতে ছোট আকারের লিচু হলে কেজিতে সংখ্যায় বেশি পাওয়া যায়। কোর্ট চত্বরে শতক হিসেবে লিচু কিনছিলেন গোলাম আজম। তিনি বলেন, ‘মৌসুমি ফল বাসার জন্য কিনছি। আমি আগে থেকেই শ হিসেবে কিনি। কেজিতে কিনলে কম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ‘আমরা গরিব মানুষ। একসঙ্গে ১০০ পিস কেনার সামর্থ্য নেই। অনেক সময় অল্প নিলে বিক্রেতারা দিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে ২৫০ গ্রামের মতো লিচু কিনেছি।’ অন্যদিকে সবাই যে কেজি বিক্রির বিপক্ষে, এমন নয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের অনেক ক্রেতার কাছে কেজি পদ্ধতি তুলনামূলক সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।’ বগুড়া প্রেস ক্লাবের সামনে ১২০ টাকা কেজি দরে লিচু কিনতে দেখা যায় দুলাল হোসেনকে। তিনি বলেন, ‘কেজিতে কিনলে গুণতে হয় না। অল্প পরিমাণও সহজে কেনা যায়। আবার পছন্দমতো বাছাই করেও নেওয়া যায়।’ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান নায়েব আলী। তিনি বলেন, ‘বোম্বাই লিচু ৫০ পিস ১৩০ টাকায় নিলাম। অল্প লিচু পিস হিসেবে পাওয়া যায় না, আবার বেশি কেনার সামর্থ্যও নেই। তাই বাচ্চাদের খাওয়ার জন্য অল্প করে কিনেছি।’ আরও পড়ুন- শেরপুরের বাজারে অপরিপক্ব লিচুর ছড়াছড়িনড়াইলের একটি গ্রাম থেকে ২ কোটি টাকার লিচু বিক্রিসময়ের আগেই দিনাজপুরের বাজারে লিচু, দাম চড়া আব্দুল আজিজ নামের এক নিম্ন আয়ের ক্রেতা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। একসঙ্গে ১০০ পিস কেনার সামর্থ্য নেই। অনেক সময় অল্প নিলে বিক্রেতারা দিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে ২৫০ গ্রামের মতো লিচু কিনেছি।’ বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে মান ও স্থানভেদে প্রতি কেজি লিচু ১২০ থেকে ১৮০ টাকা থে‌কে শুরু ক‌রে ২৫০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে শতক হিসেবে কিনতে হলে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবর্তিত ক্রেতা চাহিদার কারণেই কেজি পদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেকেই এখন আর একসঙ্গে ১০০ বা ২০০ লিচু কিনতে চান না। পরিবার ছোট হয়েছে, ক্রয়ক্ষমতার ওপরও চাপ বেড়েছে। ফলে অল্প পরিমাণে কেনার সুযোগ থাকায় কেজি পদ্ধতির চাহিদা বাড়ছে। তবে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, লিচু যেভাবেই বিক্রি হোক না কেন, সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কেজি দরে বিক্রি হলে সঠিক ওজন নিশ্চিত করতে হবে। আবার শতক হিসেবে বিক্রি হলে মান ও সংখ্যার বিষয়ে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। ‘বিক্রেতা যেভাবে পণ্য কিনবে, তাকে সেভাবেই বিক্রি করতে হবে। এটিই নিয়ম। যদি কেউ পিস হিসেবে লিচু কিনে এনে পরে কেজি হিসেবে বিক্রি করে, তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’ জানতে চাইলে স্টেশন রোড ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা পাইকারি পর্যায়ে লিচু শতক বা পিস হিসেবেই কিনি ও বিক্রি করি। কেজি হিসেবে পাইকারি লিচু বিক্রির সুযোগ নেই। বাজারে কেন কেজি দরে লিচু বিক্রি হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাগান থেকে লিচু আনার সময় অনেক লিচু ঝরে পড়ে বা থোকা থেকে আলাদা হয়ে যায়। এসব লিচু শতক হিসেবে বিক্রি করা কঠিন হয়। ক্ষতি এড়াতে অনেক খুচরা বিক্রেতা সেগুলো কেজি দরে বিক্রি করেন। এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বগুড়ার সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘বিক্রেতা যেভাবে পণ্য কিনবে, তাকে সেভাবেই বিক্রি করতে হবে। এটিই নিয়ম। যদি কেউ পিস হিসেবে লিচু কিনে এনে পরে কেজি হিসেবে বিক্রি করে, তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’ তিনি আরও বলেন, ঈদের আগে আমরা এ বিষয় নিয়ে বাজার তদারকি অভিযান পরিচালনা করেছি। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় কয়েকজন বিক্রেতাকে জরিমানাও করা হয়েছে। বিক্রেতাদের ক্রেতার সঙ্গে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। সঠিক ওজন ও নির্ধারিত পরিমাণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের প্রতারণা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এফএ/এমএস

Go to News Site