Collector
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে অদৃশ্য নারী কৃষকরা, নেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা | Collector
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে অদৃশ্য নারী কৃষকরা, নেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা
Somoy TV

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে অদৃশ্য নারী কৃষকরা, নেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা

সারাদেশে ঠিক কতজন নারী কৃষক আছেন- তার কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ সরকারের কাছে নেই। ফলে কৃষি কার্ড, ঋণ কিংবা সরকারি বিভিন্ন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন নারী কৃষকরা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যেও অনেক নারী কৃষক এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে অদৃশ্যই রয়ে গেছেন।জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর একটি ভোলা, যেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারী কৃষকদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই প্রতিদিন মাঠে কাজ করতে হচ্ছে। কেউ চারা রোপণ করছেন, কেউ ফসল কাটছেন, কেউ আবার গবাদিপশু পালন করছেন। অথচ রাষ্ট্রীয় হিসেবে তাদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান ও পূর্ণ স্বীকৃতি নেই। ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার গঙ্গাপুর ইউনিয়নের লাইজু বেগম প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন। মাঠের কাজ থেকে শুরু করে গৃহস্থালির দায়িত্ব; সবই সামলান তিনি। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সবজি চাষ ও পশুপালনসহ নানা কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও পরিবার কিংবা রাষ্ট্র; কোথাও পাননি কোনো স্বীকৃতি। আরও পড়ুন: বাজেটে বরাবরই উপেক্ষিত কৃষি খাত, বিনিয়োগ-ভর্তুকি বাড়ানোর তাগিদ লাইজু বেগম বলেন, নারীদের সংসারের কাজও করতে হয়, আবার মাঠের কাজও করতে হয়। সব পরিশ্রম আমরা করি, কিন্তু পরিবারের কাছেও মূল্যায়ন পাই না, সরকারের কাছেও কোনো মূল্যায়ন পাই না। কৃষির প্রায় সব ধাপেই নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে; বীজ বপন, পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত। তেমনি আরেক নারী রানু বেগম গত ১০ বছর ধরে কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও এখনো কোনো স্বীকৃতি পাননি। রানু বেগম বলেন, ধান কাটি, আবার বিলে যাই, বাড়িতেও কাজ করি। ঋণ দিলে বা কৃষি কার্ড দিলে আমরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারতাম। মাঠের কাজের পাশাপাশি ঘরের দায়িত্বও সামলান এই নারীরাই। কৃষিকাজের ২১টি ধাপের মধ্যে ১৭টিতেই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। ফলে প্রণোদনা, ঋণ ও প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, কৃষিতে এখন পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। তবে কাগজে-কলমে পুরুষকে কৃষক হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে মাঠে চিত্র ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই মূল কৃষক, আর পুরুষরা সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন। নারী কৃষকরা বলেন, আমাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। হাজারো কৃষক থাকলেও অনেক পরিবারে একজনেরও কৃষি কার্ড হয়নি। পুরুষ যে টাকা পায়, সেটা অনেক সময় নারীদের হাতে আসে না। ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাঠিয়া ইউনিয়নের ফাতেমা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একজন কৃষানি। বন্যায় তার ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ফাতেমা বলেন, বৃষ্টি-জলে সব তলিয়ে গেছে। সরকার যদি একটু সাহায্য করত, তাহলে আমরা বাঁচতে পারতাম। আমার স্বামী দেড় বছর আগে মারা গেছে, আমি সহায়তা চাই। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ফসল নষ্ট হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী কৃষকরাই। অনেক পুরুষ কাজের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেও নারীরা এখনো মাঠেই থেকে যাচ্ছেন। তারা বলেন, সব ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে, আমরা কিছুই আনতে পারিনি। সরকার যদি সাহায্য করত, তাহলে ভালো হতো। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও এখনো তাদের কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ নেই। ফলে প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদানে তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা। তবে সম্প্রতি কৃষকের জন্য বিশেষায়িত কার্ড কার্যক্রম চালু হয়েছে, যেখানে কৃষি ঋণ, ভর্তুকি, বীজ ও সারসহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে-নারী কৃষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ছাড়া তারা এসব সুবিধা কীভাবে পাবেন। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি সঠিক কৃষি শুমারি হলে নারীর স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সহজ হবে। ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. শামীম আহমেদ বলেন, সঠিক কৃষি শুমারি হলে নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে এবং কৃষি সহায়তাও সঠিকভাবে পৌঁছানো যাবে। এতে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ; সব ক্ষেত্রেই সুবিধা হবে। নারী কৃষকদের বঞ্চনার চিত্র বদলাতে কমিউনিটি ভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি (সিআরইএ) প্রকল্প কাজ করছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কারিগরি সহযোগিতা ও সুইডেন সরকারের অর্থায়নে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা ভোলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আরও পড়ুন: পলিসির কারণেই কৃষক তার ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত: কৃষিমন্ত্রী মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আলম বলেন, কৃষক হিসেবে নারীকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা না গেলে কৃষি অর্থনীতির উন্নয়ন অসম্ভব। তাই নারীদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আলাদা ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি। প্রযুক্তি ও কৃষি সহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। জাতীয় পরিসংখ্যানে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জিডিপিতে নারীর পরিশ্রমের ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট করে তুলতে বিদ্যমান তথ্যভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ করার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নারীদের শ্রমের স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষক কার্ডে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তাদের কাজের সঠিক পরিসংখ্যান রাখতে হবে, যাতে জিডিপিতেও তাদের অবদান প্রতিফলিত হয়। কিষাণীদের ডাটা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বিভিন্ন বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করেছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই ডাটার বিষয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। পুরুষের নামটি সাধারণত পরিবারের ভেতরে উঠে আসে। আবার পুরুষের নাম লিখলে যেমন পরিবারের অংশ ধরা হয়, তেমনি স্ত্রীর নাম লিখলেও একই বাস্তবতা থাকে। কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবে। স্বীকৃতি, সুযোগ ও প্রণোদনা পেলে মাঠের এই নারীরাই কৃষির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Go to News Site