Jagonews24
নাজিফা রাসেল স্বপ্না মেঘের গুরুগুরু আর আশঙ্কার শুরু আষাঢ়ের আকাশটা গত এক সপ্তাহ ধরেই কেমন যেন ভারী হয়ে আছে। সূর্য মামার দেখা নেই বললেই চলে, আর বাতাসে ভাসছে এক অদ্ভুত গন্ধ—যা চরের মানুষের কাছে একাধারে স্বস্তি আর আতঙ্কের বার্তা বয়ে আনে। রহমত মিয়া দাওয়ায় বসে তামাকে টান দিচ্ছিলেন আর আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘের আনাগোনা দেখছিলেন। তার কপালের বলিরেখাগুলো চিন্তায় আরও সংকুচিত হয়ে উঠছিল। তার পাশেই গোয়ালঘরে বাঁধা রয়েছে লালু। লালু শুধু একটা গরু নয়, রহমত মিয়ার সংসারের মেরুদণ্ড, তার সুখে-দুঃখে জড়িয়ে থাকা এক পরম আত্মীয়। লাল রঙের চকচকে চামড়া, কপালে একটা সাদা চাঁদের মতো তিলক—এজন্যই রহমত মিয়ার স্ত্রী মারা যাওয়ার আগে ভালোবেসে এর নাম রেখেছিলেন ‘লালু’। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর এই নিঃসঙ্গ জীবনে লালুই হয়ে উঠেছিল রহমত মিয়ার একমাত্র আপনজন। মাঠে লাঙল টানা থেকে শুরু করে হাটে ফসল নিয়ে যাওয়া—সবখানেই লালু আর রহমত মিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য জুটি। ‘কী রে লালু, মনটা ভালো না?’ রহমত মিয়া গোয়ালঘরে ঢুকে লালুর পিঠে হাত বোলালেন। লালু একটা মৃদু হাম্বা ডাক দিয়ে রহমত মিয়ার কাঁধে মাথা ঘষতে লাগল। অবলা প্রাণী হলেও সে যেন তার মালিকের মনের অস্থিরতা টের পাচ্ছিল। নদীর পানি দুদিন ধরেই বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। চরের মানুষগুলো অভ্যস্ত, কিন্তু এবারের মেঘের ডাক আর বাতাসের গতি অন্যরকম। রেডিওতে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে—পাহাড়ি ঢল আর টানা বর্ষণে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রহমত মিয়া ভাবছিলেন, যদি সত্যিই পানি বাড়ে, তবে লালুকে নিয়ে কোথায় যাবেন? এই চরে তো আশ্রয় নেওয়ার মতো উঁচু জায়গা বলতে কেবল ওই দূরের সরকারি বাঁধটাই আছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন কোনো এক প্রলয় নাচের বাদ্য বাজিয়ে যাচ্ছিল। রহমত মিয়ার চোখে ঘুম নেই। তিনি হ্যারিকেনের আলোয় বারবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎ মাঝরাতে একটা বিকট শব্দ হলো। চরের মানুষের কাছে এই শব্দ খুব পরিচিত—বাঁধ ভাঙার শব্দ! মুহূর্তের মধ্যে চারদিক থেকে চিৎকার আর হাহাকার ভেসে আসতে লাগল, ‘পানি আইলো! বাঁধ ভাইঙা পানি আইলো! পালাও, সব পালাও!’ অন্ধকারের মরণপণ লড়াই মুহূর্তের মধ্যে ঘরের ভেতর গোড়ালি সমান পানি ঢুকে পড়ল। রহমত মিয়া আর এক মুহূর্তও দেরী করলেন না। ঘরের কোণে রাখা চালের পুঁটলিটা কোনোমতে পিঠে বেঁধে তিনি সোজা ছুটলেন গোয়ালঘরের দিকে। ততক্ষণে লালুর পেট পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। ভয়ে লালু ছটফট করছে আর দড়ি ছেঁড়ার চেষ্টা করছে। ‘ভয় পাইস না বাপ, আমি আইছি।’ রহমত মিয়া কাঁপতে কাঁপতে লালুর গলার দড়িটা খুললেন। কিন্তু পানির স্রোত এত তীব্র ছিল যে সোজা হয়ে দাঁড়ানোই দায়। ঘরের আসবাবপত্র, হাঁড়ি-পাতিল সব ভাসতে শুরু করেছে। চারদিকের ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বৃষ্টির তাণ্ডবের মধ্যে মানুষের বাঁচার আকুল আর্তনাদ বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। রহমত মিয়া একহাতে লালুর দড়ি শক্ত করে ধরে অন্যহাতে পানির স্রোত ঠেলে সামনে বাড়তে লাগলেন। পানি ততক্ষণে বুক সমান হয়ে গেছে। সাঁতার কেটে বা পানি ঠেলে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। লালু তার বিশাল শরীর নিয়ে পানির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, আর রহমত মিয়াকে আগলে রাখার চেষ্টা করছিল। স্রোতের টানে একবার রহমত মিয়ার হাত থেকে দড়িটা ফসকে গিয়েছিল, তিনি ভেবেছিলেন সব শেষ। কিন্তু লালু চলে যায়নি, সে পানির মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়ে তার মালিকের জামাটা কামড়ে ধরে তাকে ভাসিয়ে রেখেছিল। ‘আল্লাহ, আমারে নিয়া যাও, কিন্তু আমার লালুটারে বাঁচাও!’ রহমত মিয়া অন্ধকারে চিৎকার করে কাঁদছিলেন। দীর্ঘ তিন ঘণ্টার এক মরণপণ লড়াইয়ের পর যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল; তখন তারা কোনোমতে এসে পৌঁছালেন সেই উঁচু সরকারি বাঁধের ওপর। ততক্ষণে পুরো চর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। রহমত মিয়ার সাজানো সংসার, তার স্মৃতি জড়ানো মাটির ঘর—সব এখন পানির নিচে অদৃশ্য এক অতীত। বাঁধের ওপর এক চিলতে নরক বাঁধের ওপর এসে আশ্রয় নিয়েছে শত শত মানুষ। কেউ গরু-ছাগল নিয়ে, কেউবা কেবল নিজের প্রাণটুকু হাতে করে এসেছে। চারদিকে শুধু কাদা, ময়লা আর মানুষের হাহাকার। মাথা গোঁজার মতো কোনো জায়গা নেই। পলিথিন বা ভাঙাচোরা খড়ের চাল দিয়ে অনেকে কোনোমতে একটু আড়াল তৈরির চেষ্টা করছে। রহমত মিয়াও বাঁধের এক কোণে একটা ভাঙা মাটির ঘরের দেওয়ালের পাশে, যেখানে একটা জরাজীর্ণ খড়ের চালের অংশ অবশিষ্ট ছিল, সেখানে লালুকে নিয়ে বসলেন। বিগত কয়েক ঘণ্টার ধকল আর ঠান্ডা পানিতে থাকার কারণে লালু একদম নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। কাদার ওপর সে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। তার গা বেয়ে এক নাগারে কাঁপুনি উঠছিল। চরের চারপাশ এখন থইথই পানি, যেন এক বিশাল সমুদ্র। চরের চিরচেনা রূপটা এক রাতেই বিলীন হয়ে গেছে। রহমত মিয়া নিজের ভেজা কাপড়ের তোয়াক্কা না করে চারপাশ থেকে কয়েকটা চটের বস্তা আর শুকনো খড় কুড়িয়ে আনলেন। পরম মমতায় তিনি লালুর গায়ে সেই বস্তাগুলো জড়িয়ে দিলেন। লালুর পাগুলো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছিল। রহমত মিয়া নিজের দুই হাত দিয়ে লালুর পাগুলো ঘষে গরম করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। ‘লালু, চোখ খোল বাপ। একটু তাকা আমার দিকে। তুই না থাকলে আমি কারে নিয়া বাঁচুম?’ রহমত মিয়ার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছিল। কিন্তু লালুর চোখের পাতা দুটো যেন ভারী পাথরের মতো বন্ধ হয়ে আসছিল। সে একবার কষ্ট করে চোখ মেলে তার মালিকের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো চঞ্চলতা ছিল না, ছিল কেবল এক অবর্ণনীয় কষ্টের ছাপ। অবলা প্রাণীটি মুখ ফুটে বলতে পারছে না তার ভেতরটা কেমন করে ভেঙে যাচ্ছে, শুধু তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে অশ্রু গড়িয়ে কাদার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। নির্বাক হাহাকার বিকেলের দিকে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমল, কিন্তু আকাশের মেঘ কাটল না। গোধূলির মলিন আলো যখন চারপাশের ধসে যাওয়া মাটির ঘর আর কাদার ওপর এসে পড়ল; তখন চারপাশের পরিবেশ আরও করুণ হয়ে উঠল। দূর থেকে অন্য চরের মানুষের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল—কেউ তার সন্তান হারিয়েছে, কেউ তার সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়েছে। কিন্তু রহমত মিয়ার পৃথিবী তখন কেবল এই লালুকে কেন্দ্র করেই থমকে গিয়েছিল। লালুর শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ ধীর হয়ে আসছিল। রহমত মিয়া বুঝতে পারছিলেন, তার জীবনের শেষ আলোটুকুও বুঝি এবার নিভে যাবে। তিনি লালুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আর ধরে রাখতে পারলেন না নিজের ভেতরের পুঞ্জীভূত কষ্টকে। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘদিনের জমানো কান্না মোচড় দিয়ে বের হয়ে এলো। তিনি একহাত দিয়ে লালুর মুখটা আগলে ধরলেন, যেন তাকে আশ্বস্ত করতে চান যে তিনি পাশে আছেন। অন্যহাত দিয়ে নিজের চোখের জল মোছার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বাঁধভাঙা সেই জলধারা যেন আর থামার নয়। যে মানুষটি ঝড়ের রাতেও শক্ত হাতে লালুর দড়ি ধরে রেখেছিলেন, তিনি এখন এক অবলা পশুর কষ্টের সামনে সম্পূর্ণ অসহায়। ‘তোর মনে আছে লালু, তোর মা যখন মারা গেল, আমি তোরে নিজের হাতে ফিডারে কইরা দুধ খাওয়াইছি? তুই যখন ছোট ছিলি, আমার গোয়ালঘরের চারপাশ দিয়া কেমন লাফাইতিস! আজ তোর এই দশা আমি ক্যামনে সহ্য করি?’ রহমত মিয়া লালুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। লালু তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে মাথাটা একটু নাড়ানোর চেষ্টা করল, যেন সে তার মালিকের কষ্টের ভাগ নিতে চায়। মানুষের ভাষা সে বোঝে না, কিন্তু ভালোবাসার এই ভাষা তার চেনা ছিল। এই ধরণীতে মানুষের নিষ্ঠুরতা অনেক চেনা, কিন্তু এই পশুর সঙ্গে মানুষের যে আত্মিক বন্ধন—তার চেয়ে পবিত্র আর কিছু হতে পারে না। শেষ বিকেলের আলো-ছায়া চারপাশে সন্ধ্যা নেমে আসছিল। আকাশের এক কোণে মেঘের আড়াল থেকে সামান্য একটু লালচে আলো বের হয়ে এসেছিল, যা বাঁধের ওপরকার এই কাদা আর ধ্বংসস্তূপের ওপর এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই আলো রহমত মিয়ার মনের অন্ধকার দূর করতে পারল না। বাঁধের অন্য প্রান্ত থেকে একজন প্রতিবেশী এসে রহমত মিয়ার কাঁধে হাত রাখল। ‘রহমত ভাই, কান্দেইন না। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে যাইব। নিজের শরীরের দিকে তাকান, কিছু তো মুখে দেওয়া লাগবে।’ রহমত মিয়া কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু তাকিয়ে রইলেন লালুর স্থির হয়ে আসা চোখের দিকে। যে চোখ দুটো একসময় সজীবতায় ভরা থাকত, তা এখন কেমন যেন শূন্য। লালুর শরীরটা আস্তে আস্তে একদম ঠান্ডা হয়ে গেল। তার কাঁপুনিটা থেমে গেছে, আর সেই সঙ্গে থেমে গেছে তার যন্ত্রণা। সে চিরতরে শান্ত হয়ে গেছে। রহমত মিয়া লালুর নিথর দেহের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। এই চরের বুকে বন্যা প্রতি বছরই আসে, অনেক কিছু কেড়ে নেয়। কিন্তু এবারের বন্যা রহমত মিয়ার কাছ থেকে শুধু তার জীবিকাই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, তার পরম বন্ধুকে। গোধূলির সেই আবছা আলোয়, কাদা-পানিতে মাখামাখি হয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মানুষ আর তার প্রিয় মৃত পশুর দৃশ্যটি যেন পুরো চরের নিঃশব্দ হাহাকার আর প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার জীবন্ত দলিল হয়ে রইল। আরও পড়ুনসত্য হয়ে থাকা এক স্বপ্ন এসইউ
Go to News Site