Collector
‘সাংকেতিক চিহ্ন’ ছাড়া মেলে না পাসপোর্ট | Collector
‘সাংকেতিক চিহ্ন’ ছাড়া মেলে না পাসপোর্ট
Jagonews24

‘সাংকেতিক চিহ্ন’ ছাড়া মেলে না পাসপোর্ট

কাগজপত্র সব ঠিক থাকলেও নানান ওজুহাতে জোটে শুধু ভোগান্তি। দিনের পর দিন পার হলেও মেলে না পাসপোর্ট। এজন্য ধরতে হয় দালাল। কাগজ-পত্রে দালালদের দেওয়া ‌‘সাংকেতিক চিহ্ন’ থাকলে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে যায় পাসপোর্ট। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এমন চিত্র মাদারীপুরের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে। তারা বলছেন, দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট পেতে হলে দালালদের ধরনা দিতে হয়। এজন্য গুনতে হয় বাড়তি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর পৌরসভার ১২৩ নম্বর কুকরাইল মৌজায় ২৫ শতাংশ জমিতে আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়টি ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে। মাদারীপুর জেলার মানুষজনের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকায় অফিসটি খুবই গুরুতপূর্ণ। তবে সেবা পেতে চরম ভোগান্রিত ক দিনের পর দিন অনিয়ম আর দুর্নীতি লেগেই থাকে। “আমি এক দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করতে দিয়েছি। আমার ফরমে ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে কাজ দ্রুত হয়ে যায়। পরে আমি দ্রুতই পাসপোর্ট পেয়েছি। ফরম জমা দেওয়ার সময় শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছিলাম। আর কোনো কাগজ লাগেনি” সম্প্রতি পাসপোর্ট অফিস ঘুরে দেখা যায়, অফিসের সীমানা দেওয়ালের পাশেই সারিবদ্ধ টিনশেডে একাধিক দোকানঘর। আর কিছুদূর এগিয়ে দক্ষিণে যেতেই চোখে পড়লো ছোট ছোট একাধিক দোকানঘর। এসব দোকানগুলোতে আছে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিনসহ আনুষঙ্গিক মেশিনপত্র। সেখানেই চোখে পড়লো দালালদের আনাগোনা। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত বেশিরভাগ দালালরাই এই দোকানগুলো পরিচালনা করছেন। গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসে ঢুকতেই তাদের ডাকাডাকি করেন দালালরা। কে কাকে আগে নিয়ে যেতে পারবেন, যেন সেই প্রতিযোগিতা চলে। এরপর কাগজপত্র দেখে এগুলো অসম্পূর্ণ বা সমস্যা আছে বলে জানান। তবে তাদের বাড়তি টাকা দিলে ‘কাজ হয়ে যাবে’ বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। যারা পাসপোর্ট অফিসে নতুন আসেন বা এসব বিষয় নিয়ে একটু কম বোঝেন, তারাই মূলত দালালদের ফাঁদে পড়েন। দালালদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে তারা কাগজপত্রে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে দেন। পরে এসব চিহ্ন দেখে কর্মকর্তারা দ্রুত কাগজ ছেড়ে দেন বা পাসপোর্ট প্রস্তুত হয়ে যায়। গ্রাহকরা জানান, মাদারীপুরে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। এজন্য সারাবছরই পাসপোর্ট অফিসে ভিড় থাকে। আর এই সুযোগটা নেন দালালরা। আরও পড়ুন: কেজিতে বিক্রি হচ্ছে লিচু, লাভ নাকি ক্ষতিশ্বশুরবাড়িতে দেশি মোরগে জামাই আপ্যায়ন এখন কেবলই গল্পপাসপোর্ট অফিস থেকে আটক ভুয়া সাংবাদিকের কারাদণ্ড২০২৬ সালে ভিসা ছাড়াই যেসব দেশে যেতে পারবেন বাংলাদেশিরাপাসপোর্টে ফের যুক্ত হচ্ছে ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীজন্মনিবন্ধন দিয়েই পাসপোর্ট করতে পারবেন প্রবাসীরাবাংলাদেশি পাসপোর্ট শক্তিহীন কেন? পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, ৪৮ পৃষ্ঠার পাঁচ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ২১ দিনের মধ্যে পেতে সরকার নির্ধারিত ফি চার হাজার ২৫ টাকা, ১০ দিনের মধ্যে দ্রুত ডেলিভারির জন্য ছয় হাজার ৩২৫ টাকা এবং দুই দিনের মধ্যে অতিদ্রুত পাসপোর্ট পেতে হলে আট হাজার ৩২৫ টাকা পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া একই পৃষ্ঠায় ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ২১ দিনের মধ্যে পেতে সরকার নির্ধারিত ফি পাঁচ হাজার ৭৫০ টাকা, ১০ দিনের মধ্যে দ্রুত ডেলিভারির জন্য আট হাজার ৫০ টাকা এবং দুই দিনের মধ্যে অতিদ্রুত পাসপোর্ট পেতে হলে ১০ হাজার ৩৫০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। আর ৬৪ পৃষ্ঠার পাঁচ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ২১ দিনের মধ্যে পেতে সরকার নির্ধারিত ফি ছয় হাজার ৩২৫ টাকা, ১০ দিনের মধ্যে দ্রুত ডেলিভারি পেতে আট হাজার ৬২৫ টাকা এবং দুই দিনের মধ্যে অতিদ্রুত পাসপোর্ট পেতে হলে ফি পরিশোধ করতে হয় ১২ হাজার ৭৫ টাকা। ৬৪ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ২১ দিনের মধ্যে পেতে সরকার নির্ধারিত ফি ৮ হাজার ৫০ টাকা, ১০ দিনের মধ্যে দ্রুত ডেলিভারির জন্য ১০ হাজার ৩৫০ টাকা এবং দুই দিনের মধ্যে অতিদ্রুত পাসপোর্ট পেতে হলে ১৩ হাজার ৮০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ‘পাসপোর্ট অফিসে হয়রানি নতুন কিছু নয়। সবসময় দুর্নীতি লেগেই থাকে। মাদারীপুরের মানুষজন অনেক সময় এ নিয়ে প্রতিবাদও করেছেন। ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন এডিসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের ছবি দিয়ে ব্যানার বানিয়ে তা পাসপোর্ট অফিসের সামনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এভাবে বহুবার প্রতিবাদ করা হলেও পাসপোর্ট অফিসের চিত্র একই রয়েছে’ তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়াও প্রতিটি আবেদনপত্র জমা দিতে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের পড়তে হয় নানান সমস্যায়। বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে গ্রাহকের কাছ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি টাকা আদায় করেন দালালরা। আর এ টাকা পাসপোর্ট অফিসের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে বণ্টন হয়ে যায়। পাসপোর্ট অফিস সংলগ্ন এসব কম্পিউটারের দোকানে দালালদের আনাগোনা বেশি বলে জানিয়েছেন গ্রাহকরা/ছবি-জাগো নিউজ পাসপোর্ট করতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক জাগো নিউজকে বলেন, “আমি এক দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করতে দিয়েছি। আমার ফরমে ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে কাজ দ্রুত হয়ে যায়। পরে আমি দ্রুতই পাসপোর্ট পেয়েছি। ফরম জমা দেওয়ার সময় শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছিলাম। আর কোনো কাগজ লাগেনি।” স্নাতকোত্তর শেষ করে ই-পাসপোর্টের মাদারীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে এসেছেন একজন নারী। আলাপকালে তিনি (নাম প্রকাশ করতে চাননি) বলেন, “গত ২৭ এপ্রিল প্রথমবারের মতো নিজেই পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে কাউন্টারে যাই। আমি আবেদনে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করায় জমাদানকারী কর্মকর্তারা আমার আবেদন গ্রহণ করেননি। আমাকে যেতে বলেন সহকারী পরিচালকের (এডি) কাছে। সেখানে গেলে তিনি আমাকে নানা প্রশ্ন করে ফিরিয়ে দেন। এর দুদিন পরে ২৯ এপ্রিল আবারও আমি একই আবেদনের ফরম নিয়ে পাসপোর্ট অফিসের সামনে যাই। সেখানে আগে থেকেই থাকা এক দালালের সঙ্গে কথা বলি। তার সঙ্গে বাড়তি দুই হাজার ৫০০ টাকার চুক্তি করি। পরে ওই দালাল আবেদন ফরমে ইমেইল ঠিকানার স্থানে ১৪৩ সংখ্যার একটি কোড লিখে দেন। পরে ওই ফাইল নিয়ে দালাল নিজেই পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে চলে যান। তিনি কোনো বাধা ছাড়াই আমার পাসপোর্টের আবেদন ফরম জমা দেন। পরে আমাকে আবার এডি তার কক্ষে ডাকলেন। আমার আবেদনে ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ থাকায় এবার শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে আছে কি-না জানতে চেয়ে আমাকে ফিঙ্গার নেওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়।” মাদারীপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ইমন ফকির। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তিনি তার আবেদনে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করায় তার আবেদনটিও গ্রহণ করা হয়নি। পরে তিনি অফিসের এক আনসার সদস্যের কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলে ওই আনসার তার কাছে এক হাজার ৩০০ টাকা দাবি করেন। পরে তাকে বাড়তি টাকা নেন বলে জানান ইমন ফকির। এ বিষয়ে মাদারীপুরের সচেতন নাগরিক ওহিদুজ্জামান বেপারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে হয়রানি নতুন কিছু নয়। সবসময় দুর্নীতি লেগেই থাকে। মাদারীপুরের মানুষজন অনেক সময় এ নিয়ে প্রতিবাদও করেছেন। ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন এডিসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের ছবি দিয়ে ব্যানার বানিয়ে তা পাসপোর্ট অফিসের সামনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এভাবে বহুবার প্রতিবাদ করা হলেও পাসপোর্ট অফিসের চিত্র একই রয়েছে।’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক (এডি) হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার অফিসে শতভাগ আবেদন জমা নিচ্ছি। কারও আবেদন ফেরত দেওয়া হয় না।’ ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আবেদনে সাংকেতিক চিহ্ন বলতে কিছু নেই। এই অভিযোগটি মিথ্য। এসআর/জেআইএম

Go to News Site