Collector
অআকখ-এর পাঠচক্রে লেখক-পাঠকের মিলনমেলা | Collector
অআকখ-এর পাঠচক্রে লেখক-পাঠকের মিলনমেলা
Jagonews24

অআকখ-এর পাঠচক্রে লেখক-পাঠকের মিলনমেলা

মুহিবুল হাসান রাফি অআকখ-এর পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচিত বইটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য ছুটলাম লাভলেইনের এদিক-ওদিক। পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত বাড়ির ঠিকানা। অআকখ পাঠচক্রের অতিথি কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের বাড়ি। হুট করে ডিসি হিলের স্থান পরিবর্তন করা হলো। চট্টগ্রামের কোতোয়ালী রহমতগঞ্জ দেওয়ানজী পুকুর লেইনের কামাখ্যা মন্দিরের দ্বিতীয় তলার পথিকৃৎ পাঠাগার নির্বাচন করা হলো। সবাই জড়ো হচ্ছেন। উৎসবমুখর পরিবেশ। রোদের তেজ আরও বাড়লো। অস্বস্তি ও ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে সবাই বসে আছেন আলোচনা শোনার জন্য। এটি চট্টগ্রামে তৃতীয়বারের মতো অআকখ-এর পাঠচক্র। তারা প্রতি মাসে আয়োজন করে পাঠচক্র। দশটি জেলায় এখন পাঠচক্র হচ্ছে প্রতি মাসে। আজকের পাঠচক্রের নির্ধারিত বই জার্মান নোবেলজয়ী লেখক হেরম্যা হেসের কালজয়ী উপন্যাস ‘সিদ্ধার্থ’। শুরু হলো আলোচনা, আড্ডা ও গল্প। উপন্যাসের মূল চরিত্রে ব্রহ্মকে খুঁজতে থাকা যে সিদ্ধার্থের দেখা আমরা পাই, তার নামের সাথে গৌতম বুদ্ধের নামের মিল পাওয়া গেলেও এখানে সিদ্ধার্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। শুধু ভিন্নই নয়, বুদ্ধর দর্শনকে এড়িয়ে নতুন অন্যরকম আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে আবির্ভূত করা হয়েছে উপন্যাসে। উপন্যাসের প্রথম পর্বে হেসে বর্ণনা করেছেন তর্পণ, যজ্ঞ ও পূজার্চনাকেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্য গার্হস্থ্যের। আচারের সংকীর্ণতায় বিরক্ত হয়ে সিদ্ধার্থ আশা করেছিল, পরিব্রাজক সন্ন্যাসী সামানা হলে তার মনের বেশি স্বাধীনতা মিলবে না। কিন্তু সেই জীবনও বিধান আর নিষ্প্রাণ অভ্যাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দেখে সে প্রলুব্ধ হলো গৌতম বুদ্ধের আদর্শে পরিচালিত সন্ন্যাসী দলে যোগ দিতে। বুদ্ধ ঐতিহাসিক চরিত্র, উপন্যাসে দুবার উপস্থিত হয়েছেন। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতাব্দীর মানুষ, মনে হয় উপন্যাসের পুরো ঘটনাক্রম লেখক সেই সময়ে স্থাপন করতে চেয়েছেন। আমি নিশ্চিত, লেখকের অভিপ্রায় তা ছিল না। বরং তিনি চেয়েছেন বুদ্ধ চরিত্রটিকে সময়-নিরপেক্ষ করতে, ইতিহাসের সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সচেতনভাবে এড়িয়ে একান্তভাবে চেষ্টা করেছেন তাঁকে একটা আদর্শগত আদল দিতে। এ ছাড়া উপন্যাসে কামসূত্রের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। গ্রন্থের সময়কাল খ্রিষ্টীয় তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দী, ঐতিহাসিক বুদ্ধের সময়কালে তার কোনো প্রভাব থাকতে পারে না। গৌতম বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ না করার মাধ্যমে সিদ্ধার্থ দেখিয়েছেন গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ লাভের পদ্ধতি বাস্তবসম্মত নয়। আরও পড়ুনকাজী লাবণ্য সম্পাদিত ‘সিঙ্গেল মাদার’ বইয়ের পাঠ উন্মোচন  সিদ্ধার্থের ভাষায়, একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে যেন ঐক্যানুভূতির জগতে প্রবেশ করলো এমন কিছু যার প্রমাণ নেই, যা সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত, সংসারের ঊর্ধ্বে ওঠার আর নির্বাণ লাভ সম্বন্ধে আপনার মতবাদ আকস্মিক ও খাপছাড়া মনে হয়।সিদ্ধার্থের এই বিরুদ্ধ সমালোচনার মাধ্যমে গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও উপদেশ এক প্রকার নাকচ করা হয়েছে। তার বিপরীতে বা পরিপূরক হিসেবে নতুন আদর্শ সৃষ্টির প্রয়াস করেছেন সিদ্ধার্থ। এখান থেকেই হেনরি মিলার যে কথাটি বলেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়, ‘সাধারণভাবে পরিজ্ঞাত বুদ্ধকে অতিক্রম করে এখানে এক নতুন বুদ্ধ সৃষ্টি করা হয়েছে’। উপন্যাসের কাহিনি অবলম্বন করে মূল চরিত্রে শশী কাপুরকে নিয়ে কোনরাড রক্স ‘সিদ্ধার্থ’ (১৯৭২) নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এ দৃশ্যায়নের সুবাদে উপন্যাসটির যথেষ্ট পরিচিতি এসেছে। তার চেয়েও বেশি প্রচার পেয়েছে বলে মনে করি, এটা বুদ্ধের দেখানো নির্বাণ লাভের একটি উল্টো পথকে, একটা ভিন্ন দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এতে এমন জীবনের যাপন দেখানো হয়েছে, যে জীবন কাম-বাসনা, অর্থ-সম্পত্তি, মায়া, দুঃখসহ এ জাতীয় অনুভবকে বাহ্যিক অভিজ্ঞতার বিভিন্ন স্তর হিসেবে পার করে নির্বাণের দিকে ধাবিত হয়। যা বুদ্ধ দর্শন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। বৌদ্ধ ধর্মীয় জীবনাচরণের যে অষ্টমার্গ আছে, যা পালনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নির্বাণের দিকে ধাবিত হয়। তার অনেকগুলোকে সরাসরি অস্বীকার করাও হয়েছে এ দর্শনে। তবুও সিদ্ধার্থ বইতে ভারতীয় জীবনাচরণ বিশেষ করে আধ্যাত্মিক জীবন ব্যবস্থার খুটিনাটি উঠে এসেছে তার বয়ানে। এ অঞ্চলের প্রাচীনগ্রন্থ ‌কামশাস্ত্রর প্রভাবও উপন্যাসে স্পষ্ট। সিদ্ধার্থ যখন সন্ন্যাস ছেড়ে প্রথম নগরে প্রবেশ করেন; তখন অচেনা মেয়ের সাথে দেখা হয়। যে এসে তার বাম পা সিদ্ধার্থের ডান পায়ের উপর তুলে দিয়ে আহ্বান জানান, তা কামশাস্ত্রে আলোচিত কলাসমূহের আহ্বান জানানোর বিশেষ ধরন। এ ছাড়া এ শাস্ত্রে যৌনতাকে শুধু যৌনতা হিসেবেই আলোচনা করা হয়েছে। যেখানে কোনো সম্পর্কের কথা বলা হয়নি। সিদ্ধার্থকে দিয়ে কমলার কাছে শিল্প হিসেবে যৌনতা শিখতে চাওয়ার কথা বলানোর মাধ্যমে তাকে একটি সার্বজনীন প্রেমময় পুরুষ চরিত্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে। কোনো ধরনের বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়াই সিদ্ধার্থের পুত্রসন্তানের বাবা হবার যে বিষয় বর্ণিত; সেটাও যে সময়কে ধরে এ উপন্যাস লেখা। সে সময়ের বিচারে মোটেও প্রাসঙ্গিক নয় এ ভূখণ্ডের জন্য। কমলা যখন সিদ্ধার্থর কাছে বিনিময় চাইলো; তখন একটি কবিতার বিনিময়ে একটি চুম্বন চাওয়ার বিষয়টি কমলাকে গণিকা থেকে প্রেমময়ী নারীতে রূপান্তরিত করেছে। তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে উপন্যাসের নায়িকা হিসেবে। জীবনের চারটি পর্বের যুক্তি এই, প্রতিটি মানুষের কিছু সহজাত কামনা-বাসনা থাকে আর সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখারও দরকার। তাই আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশের পূর্বে মানুষের এ কামনা-বাসনা, অন্যান্য জাগতিক ইচ্ছেসমূহ পূরণ হওয়া দরকার। যেমন- শিক্ষা লাভের বাসনা (১ম পর্ব), যৌন-কামনা, সঙ্গিনী সঙ্গ পিপাসা, সন্তানের আকাঙ্ক্ষা (২য় পর্ব), সর্বশেষে আসে মোক্ষ বা মুক্তি পিপাসা (৩য় ও চতুর্থ পর্ব)। প্রাচীন হিন্দুদের শিক্ষা এই, এসব কিছু পূরণ করতে হবে এই ক্রম মেনে। সংসার জীবনের ভোগে এবং কর্তব্যে পরিতৃপ্ত মানুষেরাই সাধু-সন্ত হবার পথে পা বাড়াতে পারবে। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম দর্শনে পরবর্তীতে গার্হস্থ্য পর্বটিকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হয়, যদিও গৌতম সব ধরনের ভোগ-বিলাসের জীবনকে অতিক্রম করেই পরে বোধীজ্ঞান লাভ করে বুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। আরও পড়ুনরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে সাহিত্য আড্ডা  একসময় পার্থিব জীবনের নানান মোহে ভরা সেই আদিম লোভাতুর জীবনে ফিরে আসে সিদ্ধার্থ। নিজেই হতে চায় নিজের গুরু। শুরু হয় নতুন যাত্রা। আগের সিদ্ধার্থ মরে গিয়ে জন্ম হয় নতুন সিদ্ধার্থের। নারী, জুয়া, নেশা, সংসার, অর্থবিত্তে ডুবে থাকে। সে জীবনেও স্থায়ী হতে পারলো না সিদ্ধার্থ। তার কাছে হঠাতই মনে হলো এটা জীবন নয়। সংসার জীবন দিনেদিনে তার কাছে হয়ে উঠলো অসহনীয়। সিদ্ধার্থ তার সঙ্গী, ব্যবসা, ঐশ্বর্য সব ছেড়ে আবার সংসার জীবন ত্যাগ করলো। নিজের মনে সে ভেবে দেখলো, জীবন সংসারের নশ্বর মোহে এমন ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে সিদ্ধার্থ নিজের আত্মা থেকেই বিছিন্ন হয়ে গিয়েছিল যেন। আবার নতুন জন্ম হলো সিদ্ধার্থের। বুদ্ধের অনুসারিত্ব ত্যাগ করে সে নগরে আসার জন্য নদী পার হতে যে মাঝির সাহায্য নিয়েছিলো, দীর্ঘ বিশ বছর পর সে আবার সেই মাঝির কাছেই ফিরে গেল। শুরু হলো নদী ও বাসু দেবের সাথে তার জীবনের আরেক অধ্যায়। অপরদিকে প্রেম এবং বাণিজ্যের নেশায় নিমগ্ন হয়েও কোনো ভাবেই নির্বাণ লাভ সম্ভব নয়। এও সত্য যে, এর কোনোটিই সিদ্ধার্থের মোক্ষ লাভের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি বরং জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাই তার একেকটি আত্মোপলব্ধি। তবে হেস উপন্যাসটিতে এমন কিছু প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন, যা তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং ধর্মীয় অনুভূতির দিক থেকে বেশ নেতিবাচক। উপন্যাসে সিদ্ধার্থ কমলাকে বিয়ে না করেও সন্তান জন্ম দেন। হিন্দু দর্শনে এটা একটা পাপ, এক ধরনের পতন। উপন্যাসটির ব্যাপক পরিচিতির পেছনে কাজ করেছে সংসারের মাধ্যমে নির্বাণ লাভের নতুন দর্শনটি। এ ছাড়া বৌদ্ধ ধর্মীয় জীবনাচরণের যে অষ্টমার্গ রয়েছে, যা পালনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নির্বাণের দিকে ধাবিত হয়, তার অনেকগুলোকেও সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে এ দর্শনে। সিদ্ধার্থ সন্ন্যাস জীবন ছেড়ে গৃহস্থ জীবনে ফিরে আসেন। হিন্দু দর্শনে এটা একটা পাপ, এক ধরনের পতন। এ পাপ আরও গুরুতর। কারণ সে কমলাকে বিয়ে না করেও সন্তান জন্ম দেন। এখানে হেসে আসলে পাশ্চাত্য জীবনাচরণের প্রবেশ ঘটিয়ে দিয়েছেন। কারণ এভাবে বিয়ে না করে বাবা হওয়া বা মা হওয়া আমাদের উপমহাদেশের বাস্তবতার সাথে প্রাসঙ্গিক নয়। তবে তিনি মূলত নির্বাণ প্রাপ্তির বুদ্ধ নির্ধারিত পথকে আরও জোরালোভাবে ভাঙতেই এটা করেছেন বলেই মনে হয়েছে। বারবণিতা কমলার কাছে শিল্প হিসেবে যৌনতা শিখতে চাওয়াটা ছিল সিদ্ধার্থের ভোগে প্রবেশের প্রথম স্তর, যা নির্বাণের পথে থাকা মানুষের জন্য বুদ্ধ নিষিদ্ধ করেছেন। তবে উপন্যাসের শেষে সিদ্ধার্থ যখন সকল ভোগ-বিলাস, অর্থবিত্তের সুখ উপভোগের পর সবকিছু ছেড়ে এসে নদীর তীরে পাটনী বাসুদেবের সাথে থাকা শুরু করলেন সেটাই তার নির্বাণের নতুন সূচনা করে। উপন্যাসে বার বার নদীর কথা শোনার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার যে ঘটনা বর্ণিত আছে, সেটা মূলত নিজের চিন্তা দ্বারাই পরিচালিত হওয়া। কোনো বিশেষ গুরুর নির্ধারিত পথের অন্ধ অনুসরণ নয়। সিদ্ধার্থে বুদ্ধের নির্ধারিত পথকে উত্তম বলা হয়েছে, সঠিকও বলা হয়েছে। আরও পড়ুনকিশোরগঞ্জে বইমেলা পরিদর্শন ও সাহিত্য আড্ডা  সময় ফুরিয়ে এলো। দুই ঘণ্টার আলোচনা, তর্ক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। ইচ্ছে করছিল, আরও আলোচনা হোক। সবার নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার জন্য ইতি টানতে হলো অআকখ-এর পাঠচক্রের। এবার দেখা হলো অআকখ-এর সংগঠক শেখ ফাতেমা পাপিয়া ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রতিনিধি সুলতানা প্রীতির সাথে। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। এসইউ

Go to News Site