Collector
লেবাননের ভবিষ্যৎ নিয়ে ফ্রান্সের এত মাথাব্যথা কেন? | Collector
লেবাননের ভবিষ্যৎ নিয়ে ফ্রান্সের এত মাথাব্যথা কেন?
Jagonews24

লেবাননের ভবিষ্যৎ নিয়ে ফ্রান্সের এত মাথাব্যথা কেন?

মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অন্যতম প্রধান কৌশলগত দুর্গ লেবাননে ক্রমাগত কমতে থাকা প্রভাব পুনরুত্থানের চেষ্টায় নেমেছে ফ্রান্স। এরই অংশ হিসেবে বুধবার (৩ জুন) লেবাননের রাজধানী বৈরুতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে ফ্রান্সের বিশেষ দূত জঁ-ইভ ল্য দ্রিয়ানের। সাবেক ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্য দ্রিয়ান তাঁর এই সফরে লেবাননের সেনাপ্রধান জেনারেল জোসেফ আউন, স্পিকার নাবিহ বেরি এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় মূল ফোকাস থাকবে লেবাননের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দেশটির এক-পঞ্চমাংশ এলাকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারত্বের শিকার জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা এবং দক্ষিণ লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ভবিষ্যৎ। চলতি বছরই এই ফরাসি নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ মিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ইসরায়েলি হামলা ও চলমান উত্তেজনা চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুতে তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, তার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে। এর জবাবে মার্চ মাস থেকেই দক্ষিণ লেবাননে তীব্র হামলা ও ফের দখলদারত্ব শুরু করে ইসরায়েল। আরও পড়ুন>>ট্রাম্পের কথা শুনছেন না নেতানিয়াহু, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা চলছেইতুমি পাগল হয়ে গেছো, সবাই তোমাকে ঘৃণা করে: নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইউকে-ফ্রান্স-জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের তীব্র নিন্দালেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৩৪১২, আহত ১০ হাজারের বেশি পরবর্তীতে গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ বৈরিতা অবসানের চুক্তিতে সম্মত হলেও লেবাননে নিয়মিত হামলা থামেনি। চলমান এই সংঘাত ও সহিংসতায় এ পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গত সোমবার বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরায়েলের সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলা ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরপরই ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বিশ্লেষকরা একে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফ্রান্সের যুক্ত থাকার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। লেবাননের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক কতটা গভীরে? লেবাননের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক শতাব্দী প্রাচীন। ঐতিহাসিক এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে ফরাসিদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জোট। ফরাসি ম্যান্ডেট (১৯২০-১৯৪৩): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই ম্যান্ডেটই লেবাননের বর্তমান সীমানা নির্ধারণ করে এবং ফরাসি সংস্কৃতির বিস্তার ঘটায়। স্বাধীনতার পরও বৈরুতকে বলা হতো ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস’। ২০২০ সালের বৈরুত বিস্ফোরণ: বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে ছুটে যান এবং বড় ধরনের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেন, যা লেবাননে ইউরোপীয় অংশীদার হিসেবে ফ্রান্সের অবস্থানকে সুসংহত করে। লেবাননের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুহাইব জাওহার বলেন, প্যারিসের দৃষ্টিকোণ থেকে লেবানন হলো একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার। এর মাধ্যমে ফ্রান্স আরব মাশরেক (পূর্ব আরব) এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখে। তিনি আরও জানান, ফ্রান্স চায় না লেবাননের সেনাবাহিনী, সরকারি প্রশাসন বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ুক। কারণ, সেখানে কোনো ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে তা প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক শক্তি (যেমন ইরান বা রাশিয়া) দিয়ে পূরণ হতে পারে। এছাড়া, লেবাননের জলসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানে যুক্ত ফরাসি কোম্পানি ‘টোটালএনার্জিস’ এবং বৈরুত বন্দর পরিচালনায় যুক্ত লজিস্টিক জায়ান্ট ‘সিএমএ সিজিএম’-এর মতো বড় ফরাসি অর্থনৈতিক স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িত। তবে হিজবুল্লাহ এবং ইরানপন্থি দলগুলো ফ্রান্সের এই ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখে। তারা একে নিরপেক্ষ কূটনীতির চেয়ে পশ্চিমা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বলেই মনে করে। যুক্তরাষ্ট্র কি ফ্রান্সকে হটিয়ে দিচ্ছে? তাহরির ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির গবেষক করিম সাফিয়েদিন মনে করেন, লেবাননে মার্কিন অতি-সক্রিয়তা ফ্রান্সের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে, যারা প্রচলিত কূটনৈতিক নিয়মকানুন খুব একটা পরোয়া করে না, সেখানে ফ্রান্স চরম কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নীতি পছন্দ করে। বর্তমানে লেবানন সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল মধ্যস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের সরকার পতনের জন্য হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের আহ্বানের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। চলতি সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে দাবি করেছেন। হিজবুল্লাহকে ওয়াশিংটন ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে গণ্য করার পর এমন যোগাযোগ নজিরবিহীন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকেই ফ্রান্স কার্যত একঘরে হয়ে পড়েছে। ইসরায়েলও ফ্রান্সের চেয়ে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তাছাড়া গাজা ও লেবানন যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ফ্রান্সের কূটনৈতিক সম্পর্কেরও বেশ অবনতি হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক খলিল হেলো বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলকে চাপ দেওয়ার মতো কোনো রাজনৈতিক লেভারেজ বা শক্তি এখন ফ্রান্সের হাতে নেই।’ প্রভাব ধরে রাখতে ফ্রান্সের কৌশল কী? শক্তি প্রয়োগ বা কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় ফ্রান্স এখন মূলত ‘নরম কূটনীতি’র (সফট ডিপ্লোম্যাসি) ওপর নির্ভর করছে। গত ১১ মে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাস্তুচ্যুত বেসামরিক নাগরিকদের সহায়তার জন্য ১৭ মিলিয়ন ইউরো দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ফ্রান্সের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। ফ্রান্স এখন ইউনিফিলের মেয়াদ শেষে একটি বহুজাতিক বাহিনী গঠনের পথ খুঁজছে, যাতে সেখানে তাদের নিরাপত্তা বজায় থাকে। এছাড়া, রাষ্ট্র ভেঙে পড়া ঠেকাতে ফরাসি সরকার দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে না। বরং তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে লেবানন, ইউরোপ এবং আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ফ্রান্স এখনো একটি অপরিহার্য মাধ্যম। প্যারিস মূলত লেবানন ফাইল থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ বাদ পড়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইছে। সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/

Go to News Site