Somoy TV
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি ও বাজেট বৈষম্যের বিষয়টি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতায় প্রতিবছর উপকূলের মানুষের দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়লেও সে তুলনায় জলবায়ু খাতে বরাদ্দ বাড়ছে না বলে দাবি করেছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে সিডর, আইলা, ফণী, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস, সিত্রাং, মিধিলি ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়ে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে, যার পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমালে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। জাতীয় বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও জলবায়ু ও পরিবেশ খাতে বরাদ্দের অনুপাত কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের মধ্যে জলবায়ু ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে বরাদ্দের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও মোট বাজেটের তুলনায় এর অংশ ক্রমেই কমেছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের বিপরীতে জলবায়ু ও পরিবেশ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ২০৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ৫ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ এক দশকে জলবায়ু খাতে বরাদ্দের হার প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার নেমে এসেছিল সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশে। আরও পড়ুন: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগে আসছে নতুন গতি পরিবেশবাদীদের মতে, জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও সেই অনুপাতে বিনিয়োগ না হওয়ায় উপকূলের সংকট আরও গভীর হচ্ছে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে পিছিয়ে রয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) জেজেএস-এর নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে দক্ষিণাঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা কয়েক দশকে দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে, বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট। একই সঙ্গে উপকূলের প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় উপকূলীয় অঞ্চলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বিবেচনায় নেয়া জরুরি।’ পরিবেশ নিয়ে কাজ করা আরেক সংগঠন অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরেফিন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বহন করছে উপকূলের মানুষ। অথচ জাতীয় বাজেটে সেই বাস্তবতার যথাযথ প্রতিফলন নেই। উপকূলের জন্য পৃথক জলবায়ু বাজেট ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে।’ ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরাম, খুলনার সদস্য রাজীব কুমার বাছাড় বলেন, ‘টিআরএম কার্যক্রম সম্প্রসারণ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মৎস্য, কৃষি, বনজ সম্পদ ও পর্যটন খাতের একটি বড় অংশ উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উপকূল রক্ষায় বিনিয়োগ শুধু দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি সুরক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তাই আসন্ন বাজেটে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ জলবায়ু বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
Go to News Site