Jagonews24
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান প্রশাসনিক সংকট নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সত্যিই অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের পথে এগোচ্ছে, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে? বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অপসারণের এক দফা দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলন এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক অস্থিরতা শুধু দুটি আলাদা ঘটনার নাম নয়; বরং এগুলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। যখন শিক্ষক সমাজ প্রকাশ্যে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য হন,তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি ব্যক্তিগত বিরোধের সীমা অতিক্রম করে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সাধারণত আন্দোলনের পথ সহজে বেছে নেন না। কারণ তাঁদের প্রধান দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ। কিন্তু যখন তাঁরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো কিংবা এক দফা দাবিতে আন্দোলনের মতো কঠোর অবস্থানে যান, তখন সেটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনার ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, অবহেলা ও প্রশাসনিক দূরত্বকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়,শিক্ষক সমাজের একটি বড় অংশ প্রশাসনের ওপর আস্থা হারিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা, পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা, মতামত উপেক্ষা এবং প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে। একইভাবে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক ও প্রশাসনের দ্বন্দ্ব, নিয়োগ ও পদোন্নতি বিতর্ক, এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমনকি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ওপর বহিরাগত কর্তৃক হামলা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সংকটের মূল চরিত্র প্রায় একই, আস্থাহীনতা ও অংশগ্রহণের সংকট। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি কেবল তার অবকাঠামো নয়; বরং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের পারস্পরিক সম্পর্ক। সেখানে যদি মতের ভিন্নতাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, সমালোচনাকে বিদ্বেষ মনে করা হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীজনদের দূরে রাখা হয়, তবে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রশাসন তখন আর নেতৃত্বের প্রতীক থাকে না; বরং ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যের পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ। একজন উপাচার্য কেবল প্রশাসনিক প্রধান নন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক ও একাডেমিক নেতৃত্বেরও প্রতীক। ফলে এই পদে থাকা ব্যক্তির কাছে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, প্রয়োজন সহনশীলতা, সংলাপের মানসিকতা এবং মতভিন্নতাকে ধারণ করার সক্ষমতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রশাসন সমালোচনাকে মোকাবিলা করার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করে। আর সেখান থেকেই দ্বন্দ্বের শুরু। আর যেসব উপাচার্য নিজের পদ ধরে রাখতে এসব অন্যায় কাজে মদদ দেয় তাদেরকে দ্রুত অপসারণ করা উচিত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে শিক্ষার্থীদের ওপর। ক্লাস বন্ধ হয়, সেশনজট বাড়ে, গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। একজন শিক্ষার্থী যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন তিনি কেবল একটি ডিগ্রির জন্য আসেন না; বরং একটি স্থিতিশীল ও সৃজনশীল একাডেমিক পরিবেশের প্রত্যাশা করেন। কিন্তু প্রশাসনিক সংঘাত সেই প্রত্যাশাকে বারবার ভেঙে দেয়। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা। আমাদের দেশে প্রায়ই শিক্ষক আন্দোলন বা প্রশাসনিক বিরোধকে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের চশমায় দেখা হয়। এতে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যায়। অথচ শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবি,পদোন্নতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা কিংবা অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নকে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে খাটো করলে সংকট আরও গভীর হয়। এখন প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা এবং মতভিন্নতাকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক চর্চা হিসেবে গ্রহণ করা। একই সঙ্গে শিক্ষক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে আন্দোলনের পাশাপাশি একাডেমিক পরিবেশ যাতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকা। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল সংকট চরমে পৌঁছানোর পর হস্তক্ষেপ নয়, বরং আগে থেকেই কার্যকর মনিটরিং, জবাবদিহি এবং অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়,বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কেবল প্রশাসনিক আদেশে সম্ভব নয়। এটি পরিচালিত হয় আস্থা, সম্মান ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে। যেখানে শিক্ষকরা সম্মানবোধ হারান, শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন এবং প্রশাসন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যেতে বাধ্য। উচ্চশিক্ষা কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। সেই ভিত্তির ভেতরে যদি অবিশ্বাস, বিভাজন ও অস্থিরতা তৈরি হয়,তবে তার প্রভাব পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর পড়বে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটকে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় গুরুত্বের বিষয়। সময় এসেছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক প্রশাসনের পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি তার ভবনে নয়, তার বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও পারস্পরিক আস্থায় নিহিত। সরকারের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া, যাতে স্থানীয় রাজনীতি প্রভাব ফেলতে না পারে। কারণ স্থানীয় রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর কিছু ধান্দাবাজ লোক আঘাত করে। তবে বিএনপি তাৎক্ষণিক এসব লোকদের বহিষ্কার করেছে,যা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এইচআর/এমএস
Go to News Site