Jagonews24
ঢাকার মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণ বা কারিগরি ত্রুটিজনিত কারণে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ‘কোনো আসামি ছাড় পাবে না’ বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন। তবে বাস্তবে বিচারের পথ যেন অনেকটাই অন্ধকারে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের নানামুখী হাঁকডাক ও জরিমানার পরও দুটি বড় আইনি ও কৌশলগত দুর্বলতার কারণে পার পেয়ে যেতে পারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও চিকিৎসকদের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ফাঁক থেকে গেছে। যার সুবিধা দিন শেষে আসামিপক্ষই পাবে। এদিকে, এতগুলো শিশুর প্রাণহানির ঘটনার ধাক্কা সামলে নিজেদের হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারে জোরেশোরে ‘পজিটিভ পিআর’ বা ইতিবাচক প্রচারণায় নেমেছে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ। যে দুই কারণে পার পেতে পারে আসামিপক্ষ সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যাওয়া বা আসামিদের খালাস পাওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে। আদ-দ্বীন হাসপাতালের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি যার মধ্যে প্রথম কারণটি হচ্ছে—মারা যাওয়া শিশুদের ময়নাতদন্ত না হওয়া। যেটি বিচার প্রক্রিয়ায় আসামিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় আইনি সুবিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অথচ এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসায় বা ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণে মৃত্যু প্রমাণ করতে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট একপ্রকার বাধ্যতামূলক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও গত ২ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ আশঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘পোস্টমর্টেম না হয়ে থাকলে আসলে মামলার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হয়। পোস্টমর্টেম ছাড়া যদি কোনো মামলা হয়, বিচারকার্যের একপর্যায়ে আসামিপক্ষ এটির সুবিধা পায়। অভিভাবকদের উচিত ছিল পোস্টমর্টেম করানো।’ আসামিদের খালাস পাওয়ার পেছনে দ্বিতীয় যে কারণটি কাজ করতে পারে সেটি হচ্ছে—তদন্ত কমিটিতে ‘টেকনিক্যাল এক্সপার্ট’ বা কারিগরি বিশেষজ্ঞের অভাব। আরও পড়ুনআদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ৬ নবজাতকের মৃত্যুআদ-দ্বীনের আসামিরা কোনো ছাড় পাবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রীআদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুর্ঘটনাটি হাসপাতালের অবকাঠামোগত বা এসি সংক্রান্ত কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটেছে। এটি চিকিৎসকদের কোনো ভুল নয়, বরং হাসপাতালের ইঞ্জিনিয়ারিং বা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের অবহেলা। আদ-দ্বীন হাসপাতালের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তার একটিতেও কোনো এসি মেকানিক, প্রকৌশলী বা স্থপতি (আর্কিটেক্ট) রাখা হয়নি। ফলে প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী মৃত্যুর মূল টেকনিক্যাল কারণটি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তেই মূলত মৃত্যুর কারণটা অনেকটা জানা যায়। যেহেতু এখানে ময়নাতদন্ত করা হয়নি, বলা হচ্ছে টেকনিক্যাল সমস্যা—গ্যাস লিকেজ অথবা এসির সমস্যা। এটি নিরূপণে তদন্ত কমিটিতে টেকনিক্যাল পারসন থাকা দরকার ছিল। চিকিৎসকরা এটি ধরতে পারবেন না। ‘সব স্বাভাবিক’ দেখাতে আদ-দ্বীনের মরিয়া প্রচারণা এদিকে, পৃথিবীর আলো দেখতে না দেখতেই সদ্যোজাত ছয়টি শিশুর মৃত্যুতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যখন চোখের জল ফেলাকেই আশ্রয় করেছে, তখন হাসপাতালটি দিব্যি আগের মতোই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনার পর থেকেই নিজেদের ফেসবুক পেজে হাসপাতালের ‘স্বাভাবিক পরিবেশ’ ও ‘উন্নত সেবা’র নানান ভিডিও প্রচার করছে কর্তৃপক্ষ। এমনকি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিজেদের পক্ষে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে তা আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে ইমেজ সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রাণান্ত চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আইনে শাস্তির বিধান কী? আইনজীবীদের মতে, চিকিৎসায় বা হাসপাতালের চরম অব্যবস্থাপনায় মৃত্যু হলে দেশের প্রচলিত আইনে তা ফৌজদারি অপরাধ। আদ-দ্বীন হাসপাতালের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি এক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ১৮৬০ সালের ৩০৪-ক ধারায় এটিকে মূলত ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারাটিতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা ছাড়া অন্য কোনো বেপরোয়া, হটকারী বা অবহেলাপূর্ণ কাজের মাধ্যমে কারও মৃত্যু ঘটায়, তবে সেই ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আওতায় সেবার ক্ষেত্রে চরম গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে কোনো সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি হলে সেবা প্রদানকারী অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। একই সঙ্গে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল বা ব্যবসার কার্যক্রম সাময়িক বা স্থায়ীভাবে স্থগিত করতে পারে। আরও পড়ুনপোস্টমর্টেম ছাড়া মামলায় সুবিধা পায় আসামিপক্ষ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীআদ-দ্বীন হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানদুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলো আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এছাড়া এসব ঘটনার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী সিভিল প্রতিকার বা দেওয়ানি প্রতিবারের পথেও এগোতে পারে। দেওয়ানি প্রতিকার হলো কোনো দেওয়ানি বা ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের ফলে আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের ক্ষতিপূরণ বা আইনি সমাধান পাওয়া। এটি সাধারণত অপরাধের শাস্তির বদলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধার বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। আদ-দ্বীন হাসপাতালের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি আদ-দ্বীনে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার চাইলে আর্থিক-মানসিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি আদালতে (টর্ট আইনে) মামলা দায়ের করতে পারেন। যদিও আদ-দ্বীনের ঘটনায় গত ৩ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, ‘এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং চরম অবহেলার প্রমাণ ও অননুমোদিত কাঠামোর কারণে আসামিরা কোনো ছাড় পাবে না।’ এরই মধ্যে সিটি করপোরেশন হাসপাতালটি পরিদর্শন করে তিন লাখ টাকা জরিমানাও করেছে। ঈদুল আজহার আগের দিন গত ২৭ মে ভোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং একে একে মারা যায়। তবে ধর্মীয় ও আবেগগত কারণে শিশুদের বাবা-মা ময়নাতদন্ত না করার জন্য লিখিত আবেদন করায় আইনি লড়াইয়ে শুরুতেই ব্যাকফুটে চলে গেছে রাষ্ট্রপক্ষ। ৩ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং ৪ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। ওইদিনই এ বিষয়ে ব্রিফ করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যার দিকে তাকিয়ে আছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। এদিকে, ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পরও ফেসবুক পেজে আদ-দ্বীন হাসপাতাল রোগীদের সেবা নিয়ে বিরতিহীনভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২ জুন দুপুরে হাসপাতালটির ফেসবুক পেজে একটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে, ‘নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের প্রথম পছন্দ আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মগবাজার। গত ২৪ ঘণ্টায় অসংখ্য রোগী আমাদের ওপর আস্থা রেখে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন। আপনাদের এই আস্থাই আমাদের প্রতিদিনের অনুপ্রেরণা।’ আদ-দ্বীন হাসপাতালের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি এর একদিন আগে গত ১ জুন ওই পেজে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।’ গত ২ জুন বেশ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের স্ক্রিনশট পোস্ট করে লেখা হয়, ‘আদ-দ্বীন হাসপাতালের স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম নিয়ে আজকের দৈনিক পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত সংবাদ।’ সবশেষ ৩ জুন রাতে একটি প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট যুক্ত করে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে, ‘গর্ভবর্তী মায়েদের সেবায় অনন্য মগবাজার আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। সবার সাধ্যের মধ্যেমানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অযৌক্তিক সিজারিয়ান অপারেশন এড়ানোর বিষয়ে উৎসাহিত করছে এ হাসপাতাল। গত এক বছরে প্রায় ১৫ হাজার প্রসূতির স্বাভাবিক সন্তান প্রসব হয়েছে এ হাসপাতালে। ঈদুল আজহার পর থেকে গত ৬ দিনে এই হাসপাতালে ৬১টি স্বাভাবিক ডেলিভারি এবং ১২৮টি সিজারিয়ান ডেলিভারিসহ মোট ১৮৯টি ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি প্রথমবার সিজার থাকলেও পরবর্তীতে প্রসূতির স্বাভাবিক সন্তান প্রসব হয়েছে...।’ এসইউজে/এমকেআর
Go to News Site