Somoy TV
ভোলার কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝের চর এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে থাকা এক জনপদ। মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত দুই হাজারের বেশি পরিবার নদী ভাঙন ও জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নদী ভাঙন রোধ ও টেকসই পুনর্বাসন না হলে পুরো জনপদ মেঘনার গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা আরও তীব্র হবে। এদিকে জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে এই চরে মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করছে বর্তমান সরকার।সম্প্রতি মাঝের চর ঘরে এসে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সময় সংবাদ। ৮০ বছর বয়সী রতন সিকদার তিন দশকে তিনবার নদীগর্ভে হারিয়েছেন তার বসতভিটা, জমি ও জীবনের সব সঞ্চয়। প্রতিবারই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ালেও এখনও তার বসবাস সেই ভাঙন আতঙ্কে। নেই উঠে দাঁড়াবার মতো বয়সও। রতন সিকদার বলেন, এ চরে সাড়ে ১১ শো পরিবারের জমি বিলীন হয়ে গেছে। প্রাণ নিয়ে যে যার মতো সরে গেছে। আমার ঘর নাই বাড়ি, চলার কোনো রাস্তাও নেই। আমরা অসহায় না। টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। শুধু রতন সিকদারই নন, মালেক ফরাজী, হোসেন গাজীসহ অন্তত দুই হাজার পরিবার প্রতিনিয়তই থাকেন নদী ভাঙনের শঙ্কায়। বসতভিটা হারিয়ে তাদের ঠিকানা এখন আশ্রয়কেন্দ্র। অভিযোগ আছে, এসব আশ্রয়কেন্দ্রেও রয়েছে নিরাপত্তার শঙ্কা। মালেক ফরাজী বলেন, নদীগর্ভে বাড়ি-ঘর ৩ বার ভেঙেছে, বাড়ি-এখন রাস্তার পাশে বসবাস করছি। আরেকজন বলেন, অস্থায়ীভাবে আছি এ নদীপাড়ে, হয়ত আর কিছুদিন থাকতে পারবো। আবার নতুন কোনো ঠিকানা খুঁজে নিতে হবে। পুরো চরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। নেই কোনো স্থায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কিংবা মৌলিক নাগরিক সুবিধা। জীবিকার একমাত্র ভরসা মাছ ধরা ও কৃষিকাজ। সরকারি সেবার বাইরে থেকেও প্রতিদিন বেঁচে থাকার অনিঃশেষ লড়াই এ জনপদের মানুষের। এক শিশু জানায়, এখানে কোনো স্কুল নেই, আমরা কোথায় পড়ালেখা করবো। কোনো স্কুল নেই তো, বলছে শিশুরা। চরটিতে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ট্রলার, যা চলে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এর বাইরে জরুরি পরিস্থিতিতে বাসিন্দারা আটকা পড়েন নদীর বিচ্ছিন্নতায়। নেই রাষ্ট্রীয় কোনো সুবিধা, এমনকি সম্প্রতি চালু হওয়া সরকারি কার্ডও না পাওয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের। নদী ভাঙনের বড় কারণ হিসেবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনকে দায়ী করেন অনেকে। চরবাসীদের অভিযোগ, অবৈধ ও নিয়ন্ত্রণহীন বালু উত্তোলনেই নদীর গতিপথ বদলে আগ্রাসী হচ্ছে মেঘনা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ জনপদের মানুষের দুর্দশার কথা আমলে নিয়ে পর্যায়ক্রমে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেয়ার আশ্বাসের কথা জানান জেলা প্রশাসক। ভোলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. শামীম রহমান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের যে কষ্ট এবং সম্মানিত নাগরিক হিসেবে তাদেরকে যে সেবা দেয়ার বিষয়টা সেটা অ্যাক্টিভভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সরকারও রেখেছে। আমরা দেখছি যে জায়গাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। নানাভাবে নানা প্রজেক্টের মাধ্যমে কাজ হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও নানা কারণে পরিবর্তন হচ্ছে। বিভিন্নভাবে প্রতিরোধমূলক কাজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চরাঞ্চলের মানুষের যে কষ্ট এবং সম্মানিত নাগরিক হিসেবে তাদেরকে যে সেবা দেয়ার বিষয়টা সেটা অ্যাক্টিভভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে, বললেন ভোলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. শামীম রহমান। সব হারানোর পরও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মাঝের চরের মানুষ। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ বসতি তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে, মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে চরটি। শঙ্কা অনেকের।
Go to News Site