Collector
সোহেল রানার প্রাণদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষের দাবি যাবজ্জীবন | Collector
সোহেল রানার প্রাণদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষের দাবি যাবজ্জীবন
Jagonews24

সোহেল রানার প্রাণদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষের দাবি যাবজ্জীবন

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়েছে। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আগামী রোববার (৭ জুন) রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকাল ৯টার দিকে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে আনা হয়। পরে তাদের ঢাকা দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। মামলাটিকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আদালত সূত্রে জানা যায়, সকাল ১১টা ২০ মিনিটে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে এবং সকাল ১১টা ৩৮ মিনিটে অপর আসামি স্বপ্না আক্তারকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়। আদালত কক্ষ ও এজলাসের আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে আসামিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। আদালতে স্বপ্না আক্তার-ছবি জাগো নিউজ সকাল ১১টা ৪৪ মিনিটে বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে প্রবেশ করলে যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পড়ে শোনান। এরপর তিনি মামলার বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য এবং তদন্তে উঠে আসা বিষয়গুলো তুলে ধরে যুক্তি উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করে, প্রধান আসামি সোহেল রানা পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছেন। অপর আসামি স্বপ্না আক্তার অপরাধ সংঘটনের পর বিভিন্নভাবে তাকে সহযোগিতা করেছেন। মামলার সাক্ষীদের বক্তব্য এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগকে সমর্থন করে বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়। যুক্তিতর্ক শেষে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাণদণ্ড দাবি করে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আদালতে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন মূলত আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা ছুরিটির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ ছাড়া ঘটনার সময় সোহেল রানা মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন বলেও তিনি আদালতে উল্লেখ করেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রধান আসামির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী শাস্তির আবেদন জানান তিনি। আইনজীবীদের প্রেস ব্রিফিং পরে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিপক্ষের এসব যুক্তির বিরোধিতা করে পুনরায় মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে—কীভাবে সোহেল রানা অপরাধে জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে স্বপ্না আক্তার অপরাধ প্রতিরোধ না করে তাকে সহযোগিতা করেছেন। শুনানি শেষে বিচারক আগামী রোববার (৭ জুন) মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন। এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে গত বুধবার (৩ জুন) মামলার আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আজকের দিনটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ধার্য করেছিলেন। বুধবারের শুনানিতে বিচারক মামলার ১৬ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ভিডিও প্রমাণ এবং বিভিন্ন আলামত আসামিদের সামনে উপস্থাপন করেন। এতে রামিসাকে খোঁজার ঘটনা, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট সনাক্তকরণ, রক্তের আলামত উদ্ধার এবং শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে অভিযোগ অনুযায়ী স্বপ্না আক্তার কীভাবে সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন, সে বিষয়ও আদালতে উল্লেখ করা হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যে সোহেল রানা বলেন, ‘আমি নির্দোষ স্যার। স্যার, আমাকে মাফ করে দিন।’ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ডলারকে ধরেন। আমি অপরাধ করেছি। তাকেও ধরেন।’ অপর আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি কিছু করিনি।’ শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর বা পিপি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, শুরুতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও পরে সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নথিভুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন জানিয়েছে। ‘ডলার’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সোহেলের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ নামের কোনো উল্লেখ ছিল না। তদন্ত ও মামলার নথিতেও এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যায়ে এসে এ ধরনের নাম উল্লেখ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি কিংবা বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা হতে পারে। ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রক্রিয়া হবে। যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তিতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তার ভিত্তিতে যে বিচার আসবে, তাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস পাবে না বলে আমরা আশা করি।’ এর আগে গত মঙ্গলবার মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নিহত শিশুর বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা আদালতে সাক্ষ্য দেন। শিশু সাক্ষী হওয়ায় রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্য ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। তদন্তকালে জব্দ করা কাটা গ্রিলসহ বিভিন্ন আলামতও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। গত ১৯ মে পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন। পরে নারায়গঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। পরে স্বপ্নাকেও এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলায় সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করা হয়। এমডিএএ/এসএইচএস

Go to News Site