Jagonews24
রাজনীতির কোনো আদর্শ নেই কারণ এখানের জয় পরাজয় খেলাধুলার মতো নয় বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের মানুষের কাছে। দোষ স্বীকার করার মতো মানসিকতা নেই, তবে অন্যায় করেও এরা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। এই কালচার পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজে নেই তবে বাংলাদেশে আছে। এখানে কেউ মরে কেউ মারে। রাজনীতি যখন ক্ষমতার দখলের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা আর জনসেবার জায়গায় থাকে না। তখন জয় পরাজয় একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না হয়ে অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়। পরাজয় মানে শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাগত ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি করে। এই ভয় থেকেই সহিংসতা জন্ম নেয় এবং সেই সহিংসতা আবার রাজনীতিকে আরও অমানবিক করে তোলে। যেখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী, সেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মতের ভিন্নতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল, সেখানে রাজনীতি ধীরে ধীরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াইয়ে রূপ নেয়। সেখানে রাষ্ট্রের চেয়ে দল বড় হয়ে ওঠে, আর দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠে। তখন রাষ্ট্র আর নাগরিকের মধ্যে আস্থা ভেঙে পড়ে। পৃথিবীর অনেক সভ্য সমাজে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে, মতভেদ আছে, কিন্তু একটি সীমারেখা আছে। সেখানে পরাজিত পক্ষও রাষ্ট্রের ভেতরেই নিরাপদ থাকে। একজন নাগরিক তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু যেখানে সেই নিরাপত্তা অনুপস্থিত, সেখানে রাজনীতি স্বাভাবিক থাকতে পারে না। ফলে সমাজ ধীরে ধীরে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। মানুষ আর নাগরিক থাকে না, মানুষ হয়ে যায় পক্ষ। এক পক্ষের ক্ষতি অন্য পক্ষের আনন্দে পরিণত হয়। কেউ মরে, কেউ মারে, আর মাঝখানে রাষ্ট্র অনেক সময় নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। দোষ স্বীকার করার মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতি না থাকলে ক্ষমতা কখনোই দায়িত্বে পরিণত হয় না। ভুলকে সংশোধন করার পরিবর্তে সেটিকে আড়াল করার প্রবণতা তৈরি হয়। অন্যায় করেও টিকে থাকার কৌশলই হয়ে ওঠে রাজনীতির প্রধান দক্ষতা। এই মানসিকতা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় রাজনীতির একটি অদ্ভুত প্রভাব দেখা যায়। রাজনীতি এমনভাবে মানুষের জীবনকে গ্রাস করে ফেলে যে এটি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় থাকে না, বরং সামাজিক পরিচয়ের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মানুষ অনেক সময় নিজের পেশা, দক্ষতা বা অবদানের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে শিল্প, কৃষি, শ্রম, প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং উৎপাদনশীল খাতগুলোই বাস্তবে একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। এগুলোই মানুষের রিজিকের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু এই খাতগুলো নিয়ে সমাজে যে মনোযোগ, আবেগ এবং আলোচনার গভীরতা থাকা উচিত ছিল, তা রাজনৈতিক আলোচনার তুলনায় অনেক কম। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনোযোগের কেন্দ্র দখল করে আছে। মিডিয়া, সামাজিক পরিবেশ এবং দৈনন্দিন কথোপকথনের বড় অংশ রাজনীতিকে ঘিরে আবর্তিত হয়। সংঘর্ষ, উত্তেজনা এবং ক্ষমতার লড়াই মানুষের মনোযোগ দ্রুত টানে। ফলে উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং শ্রমের মতো ধীর কিন্তু বাস্তব বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যায়। আরও গভীর একটি কারণ হলো অনিশ্চয়তা এবং অবিশ্বাস। বহু মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে রাজনৈতিক সংযোগ বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা দ্রুত নিরাপত্তা ও সুবিধা দিতে পারে। এই মানসিকতা একটি সমাজের উৎপাদনশীল শক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং ধীরে ধীরে রাজনীতিকেই সর্বোচ্চ লাভজনক ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ফলে দেশের মানুষের বিশাল সময়, শক্তি এবং আবেগ ব্যয় হয় রাজনৈতিক বিতর্ক, পক্ষ নেওয়া এবং ক্ষমতার সংঘর্ষে। অথচ সেই একই শক্তি যদি শিক্ষা, শিল্প, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় হতো, তাহলে সমাজের কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। এটি শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, এটি একটি অগ্রাধিকারের সংকট। একটি সমাজ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, সেটাই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। এই মানসিক অবস্থা থেকে মুক্তির পথও একমাত্র রাজনৈতিক নয়, এটি একটি সামাজিক পুনর্গঠন। প্রথমত, রাজনীতিকে জীবনের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে উৎপাদনশীলতাকে কেন্দ্রস্থলে আনতে হবে। সমাজে শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা এবং সৃষ্টিশীল মানুষদের সম্মান রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড় করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও পরিবার থেকে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। মতের বিরোধকে শত্রুতায় পরিণত করার প্রবণতা বন্ধ না হলে গণতন্ত্র কখনোই স্থিতিশীল হবে না। তৃতীয়ত, মিডিয়ার মনোযোগ রাজনীতির সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে বের করে সমাজের বাস্তব উৎপাদনশীল খাতে ফিরিয়ে আনতে হবে। শিল্প, বিজ্ঞান, গবেষণা, শ্রম এবং উদ্ভাবনের গল্পগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। চতুর্থত, রাষ্ট্রকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে নাগরিকের নিরাপত্তা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর না করে। আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক ভয় কখনো দূর হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তন। একজন মানুষকে বুঝতে হবে সে শুধু কোনো দলের অংশ নয়, সে একজন নাগরিক, একজন শ্রমদাতা, একজন সৃষ্টিশীল সত্তা এবং সমাজের একটি স্বতন্ত্র শক্তি। যখন এই চেতনা তৈরি হবে, তখন রাজনীতি আর মানুষের পুরো জীবন দখল করে রাখতে পারবে না। কারণ একটি জাতি তখনই বদলায়, যখন তার মানুষের চিন্তার কেন্দ্র রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে জীবনের প্রকৃত উৎপাদন ও সৃষ্টির দিকে ফিরে আসে। রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।rahman.mridha@gmail.com এমআরএম
Go to News Site