Jagonews24
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিখ্যাত শহর লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের ইঙ্গলউডে অবস্থিত সোফি স্টেডিয়াম বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক, ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্রীড়া ভেন্যু। লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের উপকণ্ঠে নির্মিত এই স্টেডিয়াম শুধু এনএফএল-এর দুই দল লস অ্যাঞ্জেলস র্যামস ও লস অ্যাঞ্জেলস চার্জার্সের ঘরের মাঠই নয়, বরং বিশ্বকাপ ফুটবল, অলিম্পিক, সুপার বোল, রেসলম্যানিয়া ও বড় বড় কনসার্ট আয়োজনের জন্যও ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হওয়া সোফি স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে ঐতিহাসিক হলিউড পার্ক রেসট্র্যাকের জায়গায়। স্টেডিয়ামটির পাশেই রয়েছে কিয়া ফোরাম ও ইনটুইট ডোম। অত্যাধুনিক অবকাঠামো, বিশাল ভিডিও স্ক্রিন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং বহুমুখী ব্যবহারের সুবিধার কারণে এটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আইকনিক স্পোর্টস ভেন্যুতে পরিণত হয়েছে। ধারণক্ষমতা ও ডিজাইন সোফি স্টেডিয়ামের আসন ধারণক্ষমতা ৭০ হাজার ২৪০। তবে বড় ইভেন্টের সময় এটি বাড়িয়ে ১ লাখেরও বেশি দর্শক ধারণ করা সম্ভব। স্টেডিয়ামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর স্বচ্ছ ইটিএফই প্যানেলের ছাদ, যা সূর্যের আলো প্রবেশ করতে দেয় এবং একই সঙ্গে আবহাওয়ার ভারসাম্যও বজায় রাখে। স্টেডিয়ামটি ডিজাইন করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এইচকেএস। পুরো কমপ্লেক্সে রয়েছে স্টেডিয়াম, পথচারীদের জন্য প্লাজা এবং ৬ হাজার আসনের ইউটিউব থিয়েটার। ছাদের ওপর স্থাপিত ১০ লাখ বর্গফুটের ক্যানোপি ৩০২টি ইটিএফই প্যানেল দিয়ে তৈরি, যার মধ্যে ৪৬টি খোলা যায় বায়ু চলাচলের জন্য। ছাদজুড়ে রয়েছে ২৭ হাজার এলইডি প্যাক, যা দিয়ে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও প্রদর্শন করা যায়। এমনকি লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণকারী বিমানের যাত্রীরাও আকাশ থেকে এই আলোকসজ্জা দেখতে পারেন। স্টেডিয়ামের আরেকটি বিস্ময়কর অংশ হলো ‘ইনফিনিটি স্ক্রিন’। স্যামসাং নির্মিত ডাবল-সাইডেড ৪কে এইচডিআর ভিডিও বোর্ডটি ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। প্রায় ২২ লাখ পাউন্ড ওজনের এই বিশাল স্ক্রিনে রয়েছে ৮ কোটি পিক্সেল। একইসঙ্গে এতে স্থাপন করা হয়েছে ২৬০ স্পিকারের অডিও সিস্টেম ও ৫৬টি ফাইভ জি অ্যান্টেনা। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্টেডিয়াম সোফি স্টেডিয়াম নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্টেডিয়ামে পরিণত করেছে। প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২.৬৬ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু পরবর্তীতে নির্মাণ ব্যয় বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ২০২০ সালে এনএফএল আরও ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন দেয়, যার ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়নে। স্টেডিয়ামটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন স্ট্যান ক্রোয়েঙ্কে, যিনি লস অ্যাঞ্জেলস র্যামসের মালিক। ইতিহাস ও নির্মাণযাত্রা স্টেডিয়ামের স্থানটি আগে ছিল বিখ্যাত হলিউড পার্ক রেসকোর্স, যা ১৯৩৮ সাল থেকে কার্যক্রম চালানোর পর ২০১৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪ সালে র্যামসের মালিক স্ট্যান ক্রোয়েঙ্কে হলিউড পার্কের পাশে ৬০ একর জমি কেনেন। এরপর শুরু হয় নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা। ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি এনএফএল র্যামসের লস অ্যাঞ্জেলসে প্রত্যাবর্তন অনুমোদন দেয়। পরে চার্জার্সও স্টেডিয়ামটি ভাগাভাগি করে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালের নভেম্বরে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। তবে অতিবৃষ্টি, এফএএ অনুমোদন জটিলতা ও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে কাজ বিলম্বিত হয়। অবশেষে ২০২০ সালে স্টেডিয়ামটি চালু হয়। উদ্বোধন ও প্রথম ম্যাচ স্টেডিয়ামটির প্রথম আনুষ্ঠানিক এনএফএল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। সেদিন লস অ্যাঞ্জেলস র্যামস ২০-১৭ ব্যবধানে হারায় ডালাস কাউবয়েজকে। কোভিড পরিস্থিতির কারণে শুরুতে দর্শকশূন্য মাঠে খেলা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০২১ সালে দর্শক উপস্থিতিতে ম্যাচ আয়োজন শুরু হয়। সোফি স্টেডিয়াম ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক বড় ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক আয়োজনের সাক্ষী হয়েছে। সুপার বোল ২০২২ সালে স্টেডিয়ামটি আয়োজন করে সুপার বোল ৫৬। ফাইনালে লস অ্যাঞ্জেলস র্যামস ২৩-২০ ব্যবধানে সিনসিনাতি বেঙ্গলসকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। ২০২৭ সালে এখানে অনুষ্ঠিত হবে সুপার বোল ৬১। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বকাপে সোফি স্টেডিয়াম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বিশ্বকাপ চলাকালে স্টেডিয়ামের নাম হবে ‘লস অ্যাঞ্জেলস স্টেডিয়াম’। বিশ্বকাপে এখানে অনুষ্ঠিত হবে মোট ৮টি ম্যাচ:* ৫টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ* ২টি রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচ* ১টি কোয়ার্টার ফাইনাল বিশ্বকাপের উল্লেখযোগ্য ম্যাচগুলোর মধ্যে রয়েছে: * যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ে (১২ জুন ২০২৬)* ইরান বনাম নিউজিল্যান্ড (১৫ জুন)* বেলজিয়াম বনাম ইরান (২১ জুন) ২০২৮ অলিম্পিক ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে এই স্টেডিয়ামে। এছাড়া অলিম্পিকের সাঁতার প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হবে এখানে। এ জন্য স্টেডিয়ামের ভেতরে অস্থায়ী সুইমিং পুল তৈরি করা হবে, যার ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৩৮ হাজার দর্শক- যা হবে অলিম্পিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সুইমিং ভেন্যু। রেসলম্যানিয়া ৩৯ ২০২৩ সালে ডব্লিউ ডব্লিউ ই-এর সবচেয়ে বড় ইভেন্ট রেসলম্যানিয়া ৩৯ আয়োজন করে সোফি স্টেডিয়াম। দুই দিনে মোট দর্শক উপস্থিতি ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৯২ জন। আয় হয়েছিল প্রায় ২১.৬ মিলিয়ন ডলার। কনসার্ট ও বিনোদন বিটিএস, টেইলর সুইফট, দ্য উইকেন্ড, জন লেজেন্ডসহ বিশ্বের বহু তারকা এই স্টেডিয়ামে পারফর্ম করেছেন। ২০২১ সালে বিটিএস-এর চারটি কনসার্ট আয় করে ৩৩.৩ মিলিয়ন ডলার, যা ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আয় করা কনসার্ট সিরিজগুলোর একটি। হলিউড পার্ক কমপ্লেক্স স্টেডিয়ামটি ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে ‘হলিউড পার্ক’ নামের বিশাল বিনোদন ও আবাসন কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে: * অফিস স্পেস* আবাসিক ভবন* সিনেমা হল* রেস্টুরেন্ট* বিলাসবহুল হোটেল* ফিটনেস সেন্টার* কৃত্রিম লেক* ইউটিউব থিয়েটার* এনএফএল মিডিয়া ক্যাম্পাস এনএফএল-এর পশ্চিমাঞ্চলীয় মিডিয়া হাবও এখানে স্থাপন করা হয়েছে। বিতর্ক ও সমালোচনা অত্যাধুনিক হলেও স্টেডিয়ামটি কিছু সমালোচনার মুখেও পড়েছে। খোলা পাশ থাকার কারণে বজ্রপাতের সময় ম্যাচ বিলম্বিত হয়েছে। এছাড়া ফিফা-মানের ফুটবল মাঠ তৈরির জন্য কিছু আসন সরাতে হবে বলে জানা গেছে। এফএএ-এর পক্ষ থেকেও বিমান চলাচলে প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। আধুনিক ক্রীড়ার প্রতীক প্রযুক্তি, বিলাসিতা, বিশাল বিনিয়োগ এবং বিশ্বমানের আয়োজন- সব মিলিয়ে সোফি স্টেডিয়াম এখন শুধু একটি ক্রীড়াঙ্গন নয়, বরং আধুনিক ক্রীড়া ও বিনোদন জগতের প্রতীক। ২০২৬ বিশ্বকাপ ও ২০২৮ অলিম্পিককে সামনে রেখে এই স্টেডিয়ামকে ঘিরে বৈশ্বিক আগ্রহ আরও বাড়ছে। সোফি স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের সূচি বি. দ্র.: সূচি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী। গ্রুপ পর্ব১২ জুন, যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে, সকাল ৭টা (১৩ জুন)১৫ জুন, ইরান-নিউজিল্যান্ড, সকাল ৭টা (১৬ জুন)১৮ জুন, সুইজারল্যান্ড-বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, রাত ১টা (১৯ জুন)২১ জুন, বেলজিয়াম-ইরান, রাত রাত ১টা (২২ জুন)২৫ জুন, তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র, সকাল ৮টা (২৬ জুন) নকআউট (শেষ ৩২)২৮ জুন, ম্যাচ ১, রাত রাত ১টা (২৯ জুন)২ জুলাই, ম্যাচ-১১, রাত ১টা (৩ জুলাই) কোয়ার্টার ফাইনাল১০ জুলাই, কোয়ার্টার ফাইনাল -২, রাত ১টা (১১ জুলাই) আইএইচএস/
Go to News Site