Collector
পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নেওয়া হবে কর্মসূচি, থাকবে না ফ্লোর প্রাইস | Collector
পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নেওয়া হবে কর্মসূচি, থাকবে না ফ্লোর প্রাইস
Jagonews24

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নেওয়া হবে কর্মসূচি, থাকবে না ফ্লোর প্রাইস

পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেছেন, বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, তথ্য ফাঁস ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে বিএসইসির কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় নবনিযুক্ত তিন কমিশনার, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক উপস্থিত ছিলেন। মাসুদ খান বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের পুঁজিবাজার একদিকে প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনার সময় অতিক্রম করেছে, অন্যদিকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়েছে, ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও কমেছে। তিনি বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেক ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। আমরা এই বাস্তবতাগুলো সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করি। তবে দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ ২০ বছর আগের তুলনায় অনেক বড়, শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পুঁজিবাজার অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতেই হবে। ফ্রন্টিয়ার থেকে এমার্জিং মার্কেটের লক্ষ্য বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কমিশনের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীনির্ভর এমার্জিং মার্কেটে রূপান্তর করা। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে চাই, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূলধন সংগ্রহে সক্ষম হবে। স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানোর উদ্যোগ পুঁজিবাজারে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবসার ব্যয় বাড়ায় এবং বাজারের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যমান বিধিমালা, রিপোর্টিং প্রয়োজনীয়তা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার ব্যাপক পর্যালোচনা করা হবে। তিনি জানান, ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্বিবেচনা করা হবে। কমিশন ধীরে ধীরে নীতিনির্ভর এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হবে। ‘আমাদের দর্শন অত্যন্ত সহজ—যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিয়ন্ত্রণ, আর যেখানে সম্ভব সেখানে সরলীকরণ,’ বলেন তিনি। আরও পড়ুনপুঁজিবাজারকে উদীয়মান বাজারে রূপান্তরের ঘোষণা বিএসইসি চেয়ারম্যানেরপুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনতে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করা হবে ডিজিটাইজেশনকে সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং, তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্সিং, অনুমোদন, বাজার তদারকি ও বিনিয়োগকারী সেবাসহ পুরো পুঁজিবাজার ইকোসিস্টেমকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই, যা হবে দ্রুততর, অধিক স্বচ্ছ, অধিক দক্ষ এবং অংশীজনদের জন্য সহজলভ্য। বাজারে আসবে আরও ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, দেশের অনেক সফল বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত এবং স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এখনো বাজারের বাইরে রয়েছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নতুন মূলধন সংগ্রহ ছাড়াই যোগ্য কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিশেষ সুবিধা তালিকাভুক্তিকে কোম্পানিগুলোর জন্য আরও আকর্ষণীয় করতে সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে যৌথভাবে ‘লিস্টেড কোম্পানি অ্যাডভান্টেজ প্রোগ্রাম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এর আওতায় তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের করহারে আরও বড় পার্থক্য, দ্রুত অনুমোদন, ঝুঁকিভিত্তিক কর মূল্যায়ন, সহজ মূলধন সংগ্রহ এবং অপ্রয়োজনীয় অডিট হ্রাসের মতো সুবিধা থাকতে পারে। কারসাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং সিডিবিএলকে সমন্বিত করে আধুনিক নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প স্কিম, ফ্রন্ট রানিং এবং অন্যান্য বাজার কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ড আরও দ্রুত শনাক্ত করা হবে, গভীরভাবে তদন্ত করা হবে এবং কার্যকরভাবে শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা নয় বরং ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার, কারসাজি নয়। কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, সৎ বিনিয়োগকারী এবং সৎ ব্যবসায়ীদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু যারা বিনিয়োগকারীদের আস্থার অপব্যবহার করবে, বাজারে কারসাজি করবে অথবা সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর আইন প্রয়োগের মুখোমুখি হতে হবে। ফ্লোর প্রাইস ধাপে ধাপে প্রত্যাহার বিনিয়োগকারী সুরক্ষাকে কমিশনের নিয়ন্ত্রক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্য প্রকাশের মান উন্নয়ন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কোনো স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে। আস্থা ফিরিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্যই স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাইজেশন, ভালো মানের তালিকাভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আস্থা বক্তৃতার মাধ্যমে তৈরি হয় না, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেও তৈরি হয় না। আস্থা আসে ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহিতা থেকে। এসএম/বিএ

Go to News Site