Collector
হার্ডলাইনে সরকার, বাতিল হচ্ছে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স | Collector
হার্ডলাইনে সরকার, বাতিল হচ্ছে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স
Jagonews24

হার্ডলাইনে সরকার, বাতিল হচ্ছে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স

শাস্তিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায় সরকার অন্যত্র সরিয়ে নেবে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নিজেদের ত্রুটি খুঁজে পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় চরম অবহেলার কারণে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তদন্তে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর এরই মধ্যে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলসহ কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এ সিদ্ধান্তকে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, এখন থেকে মগবাজারের ওই ভবনে আদ-দ্বীন হাসপাতাল আর কোনো ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে পারবে না। একই সঙ্গে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণে সেখানে অধ্যায়নরত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তাদের দ্রুত অন্য মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশনা দেওয়া হবে। গত ২৭ মে মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে এক-দুদিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১ জুন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৪ জুন তারা রিপোর্ট জমা দেয়। এ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তদন্তের সারমর্ম তুলে ধরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তবে তদন্ত রিপোর্টটি সামনে আসেনি। যা আছে তদন্ত প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনটি জাগো নিউজের হাতে এসেছে। ওই তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ৯০০ বর্গফুটের যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নবজাতকদের রাখা হয়েছিল, তা ছিল চারপাশ থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ এবং সেখানে কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশন বা আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত (প্রায় ৫০ জন) মানুষের উপস্থিতিতে রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এসি বন্ধ থাকায় কক্ষটিতে অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে নবজাতকদের শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়। আরও পড়ুনআদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ৬ নবজাতকের মৃত্যুআদ-দ্বীনে ছয় শিশুর মৃত্যু: বিচারের পথ কি অন্ধকারে?আদ-দ্বীনের আসামিরা কোনো ছাড় পাবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল, ঘটনার সময় ওয়ার্ডটিতে কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না এবং শিশুরা মুমূর্ষু অবস্থায় চলে গেলেও নার্সরা কোনো চিকিৎসককে ডাকেননি। নার্সদের দায়িত্বে চরম অবহেলা, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব এবং হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের তীব্র দায়িত্বহীনতা ও ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামোর কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বেশকিছু জরুরি সুপারিশ করেছে। প্রথমত, হাসপাতাল পরিচালনায় ব্যবহৃত ভবনের উপযুক্ততা নিশ্চিতকরণ এবং যত্রতত্র কাচের কক্ষ নির্মাণ বন্ধ করে জরুরি ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স’ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত সেবিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীর স্বজনদের অতিরিক্ত উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সর্বোপরি, বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভবন পরিদর্শন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য নীতিগত শর্তারোপের সুপারিশ করা হয়েছে। কেন লাইসেন্স বাতিল হবে না মর্মে শোকজ তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (৪ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের পরিচালক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজের বিধান লঙ্ঘন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে এই নোটিশ দেওয়া হয়। পত্র জারির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে (৭ জুন বিকেল ৪টার মধ্যে) হাসপাতালটির মালিক ডা. শেখ মহিউদ্দিনকে এই নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, ‘আদ-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালনায় ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ অধ্যাদেশের বিধানসমূহ যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। এই নিয়মের চরম অবহেলার কারণেই ওই ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী সাব্যস্ত করেছে।’ দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য বাতিল হবে লাইসেন্স এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আমার আইনে যতটুকু কঠোর (হার্ড) হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাবো। এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না।’ এদিকে, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে কঠোর হবে তারা। দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য তারা হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তও নিতে পারে। একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘তারা কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দিলে বা জবাব সন্তোষজনক না হলে লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ আছে। আমরা সে পথেই হাঁটবো। ’ ওই কর্মকর্তা জানান, ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ এর ধারা ১১(২)(খ) অনুযায়ী, পরিদর্শনের পর কোনো বেসরকারি ক্লিনিক আইন লঙ্ঘন করলে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (ডিজিএইচএস) ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করার আদেশ দিতে পারেন। তবে লাইসেন্স বাতিলের আগে ক্লিনিক মালিককে কারণ দর্শানোর সুযোগ (অপরচুনিটি অব শোয়িং কজ) দিতে হবে। এ অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জবাব দেওয়ার পর এই বিধানেই শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এটা তো একটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এটি বন্ধ করে দিলে শিক্ষার্থীরা শিখবেন কোথা থেকে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এজন্য আমরা স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরকেও বলবো এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে। অন্যত্র তাদের সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে বা আরও অনেক সুযোগ থাকবে।’ কী বলছে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ? এ বিষয়ে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল বৃহস্পতিবার বিকেলে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ওখানে আমাদের কোনো ফল্ট ওভাবে খুঁজে পাইনি। সরকার যেসব গাফিলতির কথা বলছে, এগুলো থাকতে পারে। আমরা এখনো দেখছি। আমরা আমাদের ফাইন্ডিংস (নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন) সরকারকে (তদন্ত কমিটি) দিয়েছি। এটা প্রকাশ করিনি। প্রকাশ করবো। আপনাদেরও দেবো।’ আরও পড়ুনআদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকারপোস্টমর্টেম ছাড়া মামলায় সুবিধা পায় আসামিপক্ষ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলো আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শোকজ দেওয়ার পর আপনাদের বক্তব্য কী? জবাবে তিনি বলেন, ‘নোটিশ এখনো পাইনি। হয়তো পাবো। এ নিয়ে আমরা এখন কথা বলছি না। সবকিছু দেখি। আমরা আপনাদের (সাংবাদিকদের) ডাকবো। একবারে কথা বলবো।’ তবে আদ-দ্বীন হাসপাতালের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. এসএএ শাফী। এদিকে আশঙ্কার কথা হচ্ছে সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাই হোক, আইনগতভাবে হয়তো পার পেয়ে যাবে আদ-দ্বীন হাসপাতাল। কারণ, ময়নাতদন্ত করা যায়নি বাচ্চাদের, যার মধ্যদিয়ে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা যায়। যেটি বিচার প্রক্রিয়ায় আসামিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় আইনি সুবিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অথচ এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসায় বা ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণে মৃত্যু প্রমাণ করতে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট একপ্রকার বাধ্যতামূলক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও গত ২ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ আশঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘পোস্টমর্টেম না হয়ে থাকলে আসলে মামলার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হয়। পোস্টমর্টেম ছাড়া যদি কোনো মামলা হয়, বিচারকার্যের একপর্যায়ে আসামিপক্ষ এটির সুবিধা পায়। অভিভাবকদের উচিত ছিল পোস্টমর্টেম করানো।’  এসইউজে/ইএ

Go to News Site