Collector
দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ | Collector
দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ
Jagonews24

দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ

ষড়ঋতুর বাংলাদেশের ঋতুচক্রে ওলটপালট শুরু হয়েছে আরও আগে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্ম মৌসুমের তাপপ্রবাহ এখন গড়াচ্ছে বর্ষাকালেও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জুন, জুলাই এমনকি আগস্টেও থাকছে তাপপ্রবাহ। বর্ষা মৌসুমেও মানুষকে সহ্য করতে হচ্ছে অস্বাভাবিক গরম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু স্বাভাবিক আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বড় একটি সংকেত। বর্ষা এখন আর আগের মতো নিয়ম মেনে আসছে না। কখনো দেরিতে শুরু হচ্ছে, কখনো দীর্ঘ বিরতি দিচ্ছে, আবার কোনো সময় স্বল্প সময়ে হচ্ছে অতিবৃষ্টি। মাঝে আবার তৈরি হচ্ছে তীব্র গরম, ভ্যাপসা আবহাওয়া। চলতি বছরের জুন মাসের প্রথমার্ধে দেশে মৌসুমি বায়ু (বর্ষাকাল) বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে এ অবস্থায়ও চলতি মাসে একাধিক তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বাতাসে আর্দ্রতার (হিউমিডিটি) পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রা যতটা, মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। একই কারণে রাতেও গরম কমছে না।-আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ সাধারণত জুনের শুরু থেকে বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে। এ মাসে অনেক বেশি বৃষ্টিও হয়। বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টি ঝরে মাসটিতে। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের চলতি জুন মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। তাপমাত্রা থাকতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। দু-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহও হতে পারে। এছাড়া এবার জুন, জুলাই ও আগস্ট- এই তিন মাসে দেশে ৮-১০টি বিচ্ছিন্ন মৃদু (৩৬-৩৭.৯°সে.) থেকে মাঝারি (৩৮-৩৯.৯০ সে.) ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এছাড়া চলতি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ফলে এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা অনেকটা অস্বাভাবিক বলছেন আবহাওয়াবিদরা। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে বাতাসে আর্দ্রতার (হিউমিডিটি) পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রা যতটা, মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। একই কারণে রাতেও গরম কমছে না।’ সাধারণত রাতে তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন অনেক জায়গায় তা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকছে। এর প্রধান কারণ হলো বাতাসে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প এবং আকাশে মেঘের উপস্থিতি। দিনের বেলায় সূর্যের তাপে যে তাপ সঞ্চিত হয়, তা রাতের বেলায় সহজে বের হতে পারে না। ফলে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থেকে যায়।’ ‘দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেলে মানুষের অস্বস্তি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও বাইরে কাজ করা মানুষ বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়।’ বলেন এই আবহাওয়াবিদ। বর্ষায় গরম-তাপপ্রবাহ আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত ছিল। জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সাধারণত বৃষ্টির মৌসুম। তবে একই সময়ে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ থাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে। গত বছরের জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছিল। রাজধানী ঢাকায় যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ কম। মাসটিতে ২৪ দিন বৃষ্টি হওয়ার তথ্য রেকর্ড করে আবহাওয়া অফিস। কিন্তু বেশিরভাগ দিনেই বৃষ্টির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। বরং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় মাসজুড়ে ছিল ভ্যাপসা গরম। এছাড়া ২০২৫ সালে জুলাই মাসে পাঁচটি তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস ছিল। বৃষ্টিও হয়েছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে দুটি মৃদু (৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি) তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এছাড়া মাসটিতে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। এছাড়া গত বছরের আগস্ট মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে ১১ দশমিক ৯, ১১ দশমিক ১, ১৬ দশমিক ৫ এবং ১২ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি কম হয়। বর্ষায় গরমের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অন্যতম একটি কারণ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আবহাওয়ার চরম বৈশিষ্ট্যগুলোর ধরন বদলে যাচ্ছে। কখন বৃষ্টি হবে, কখন তাপপ্রবাহ- এসবের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসছে।-আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক  আবহাওয়া অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, বিগত কয়েক বছর থেকেই বর্ষাকাল ও শরৎকালের কিছু সময়ে তাপপ্রবাহ হচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি অধিক আর্দ্রতার কারণে মানুষের ভোগান্তি বেড়ে যাচ্ছে। তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশআবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত ১০ থেকে ১২ বছরের আবহাওয়ার ধারা বিশ্লেষণ করলে পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায়। আগে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে তাপপ্রবাহ হতো। বর্ষা শুরু হলে তাপপ্রবাহের প্রভাব অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু এখন জুন, জুলাই এমনকি আগস্ট মাসেও তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ গরমের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে।’ বর্ষাকালে তাপপ্রবাহ আরও বেশি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে এবং এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা বেশি হলেও আর্দ্রতা তুলনামূলক কম থাকায় মানুষের শারীরিক কষ্ট কিছুটা কম হয়। কিন্তু বর্ষাকালে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আর্দ্রতার মধ্যে একই তাপমাত্রায়ও অনেক বেশি গরম অনুভূত হয়।’ বর্ষায় এল-নিনোর প্রভাব আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্ষায় গরমের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অন্যতম একটি কারণ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আবহাওয়ার চরম বৈশিষ্ট্যগুলোর ধরন বদলে যাচ্ছে। কখন বৃষ্টি হবে, কখন তাপপ্রবাহ- এসবের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসছে।’ ‘বর্তমানে এল নিনো সক্রিয় হওয়ায় এবার বর্ষায় তার প্রভাব থাকবে। স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির আশঙ্কা বেশি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি স্থানীয় ও আঞ্চলিক নানা কারণও এতে ভূমিকা রাখছে।’ এই আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্র-বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক ক্রিয়া ও বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার পরিবর্তন বাংলাদেশের আবহাওয়াকেও প্রভাবিত করছে। বিগত দশক থেকে ঋতুতে নানা পরিবর্তন এসেছে। বর্ষায় গরম বেড়ে যাচ্ছে। এ সময় তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও অনেক বেশি থাকে। ফলে শরীর থেকে ঘাম ঠিকমতো বাষ্পীভূত হতে পারে না। অস্বস্তি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগের প্রকোপও বাড়ে।-শ্যামলী বক্ষব্যাধী হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার শিল্পী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও। ফলে তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও শরীরে গরমের অনুভূতি কয়েক ডিগ্রি বেশি লাগে। এই পরিস্থিতিকে ‘হিট স্ট্রেস’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘বর্ষায় তাপপ্রবাহ, মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক বণ্টনের (ডিস্ট্রিবিউশন) মধ্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ফলে আবহাওয়ায় কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘জুন মাসে তাপপ্রবাহ বা অস্বাভাবিক গরম অতীতেও দেখা গেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ব্যাপ্তি ও স্থায়ীত্ব বেড়েছে। ২০২৪ সালেও জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি দেখা যায়। গত কয়েক বছর বর্ষাকালে উচ্চ তাপমাত্রা অনেক বেশি দৃশ্যমান।’ বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মিলিত প্রভাবে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে পারে না। এতে ডিহাইড্রেশন, হিট অ্যাক্সেশন হয়। শ্যামলী বক্ষব্যাধী হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার শিল্পী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিগত দশক থেকে ঋতুতে নানা পরিবর্তন এসেছে। বর্ষায় গরম বেড়ে যাচ্ছে। এ সময় তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও অনেক বেশি থাকে। ফলে শরীর থেকে ঘাম ঠিকমতো বাষ্পীভূত হতে পারে না। অস্বস্তি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগের প্রকোপও বাড়ে।’ এ সময় আবহাওয়ার ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণ বাড়তে দেখা যায় জানিয়ে বলেন, ‘অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে শারীরিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও পানিশূন্যতার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।’ এই চিকিৎসক আরও জানান, বর্ষার গরমে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খাবার দ্রুত নষ্ট হয়। ফলে ফুড পয়জনিং, ডায়রিয়া ও পেটের বিভিন্ন সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই বিশুদ্ধ পানি পান, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ ও দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। আরএএস/এএসএ/এমএফএ

Go to News Site