Jagonews24
পরিবেশ সুরক্ষা আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন কি একসঙ্গে চলতে পারে? বিশ্বজুড়ে এই বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন ইউরোপের একটি ছোট দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেখিয়ে যাচ্ছে অবিশ্বাস্য সাফল্য। সোভিয়েত আমলের কয়লা ও তেলভিত্তিক ভারী কলকারখানার দূষণ পেছনে ফেলে আজ তারা বিশ্বের এক নম্বর পরিচ্ছন্ন দেশ। বলা হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ইউরোপের বাল্টিক অঞ্চলের দেশ এস্তোনিয়ার কথা। বিশ্বখ্যাত পরিবেশগত কর্মক্ষমতা সূচকে (ইপিআই) ২০২৪ সালে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে এস্তোনিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ডেনমার্ক বা জার্মানির মতো পরিবেশবান্ধব পরাশক্তিগুলোকে পেছনে ফেলে এস্তোনিয়ার এই শীর্ষস্থান অর্জন এখন বিশ্বজুড়ে এক বড় আলোচনার বিষয়। প্রযুক্তি ও প্রকৃতির যুগলবন্দিতে কীভাবে এস্তোনিয়া এই অসাধ্য সাধন করল, কী ছিল তাদের সরকারের কর্মসূচি এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাদের কৌশল, চলুন জেনে নেওয়া যাক- এস্তোনিয়ার রাজধানী টালিন/ ছবি: ভিজিট এস্তোনিয়া ইপিআই সূচকে শীর্ষে এস্তোনিয়া ২০২৪ সালের ইপিআই সূচকে ৭৫ দশমিক ৭ স্কোর নিয়ে বিশ্ব তালিকায় সবার ওপরে স্থান পেয়েছে এস্তোনিয়া। দেশটির এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের নাটকীয় হ্রাস। এস্তোনিয়ার জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের তুলনায় দেশটিতে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমেছে ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সবশেষ ডেটা অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত এটি কমার হার ছিল ৭৩ শতাংশ, যা পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া, বায়ুর গুণগত মান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকগুলোতে এস্তোনিয়ার স্কোর ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে সামুদ্রিক অঞ্চল রক্ষা এবং প্রজাতি সুরক্ষায় তারা বৈশ্বিক মানে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এস্তোনিয়ার অর্ধেকের বেশি ভূখণ্ডে রয়েছে বনাঞ্চল/ ছবি: ভিজিট এস্তোনিয়া যেভাবে শুরু হলো সবুজ বিপ্লব ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় এস্তোনিয়ার পরিবেশগত অবস্থা ছিল বেশ নাজুক। দেশটিতে প্রচুর পরিমাণে ‘অয়েল শেল’ (এক ধরণের খনিজ তেলসমৃদ্ধ শিলা) পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো, যা প্রচুর পরিমাণে কার্বন ও বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়াত। এ অবস্থায় দেশটির সরকার এক দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। গত তিন দশকে তারা শুধু শিল্পকারখানার আধুনিকায়নই করেনি, বরং পুরো দেশের অর্থনীতিকে একটি ‘সবুজ রূপান্তর’-এর মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছে। দেশটির মোট ভূখণ্ডের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে ঘন জঙ্গল, যা তাদের প্রাকৃতিকভাবেই কার্বন শোষণ করতে সাহায্য করে। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বনাঞ্চল থাকা দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং স্লোভেনিয়ার পরেই এস্তোনিয়ার অবস্থান। এস্তোনিয়ার একটি বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প/ ছবি: ইনভেস্ট ইন এস্তোনিয়া পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের ৪ কর্মসূচি পরিবেশ সূচকে এস্তোনিয়া রাতারাতি শীর্ষস্থান দখল করেনি। এর পেছনে রয়েছে দেশটির সরকারের সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর কিছু আইনি ও সামাজিক কর্মসূচি: জীবাশ্ম জ্বালানি বর্জন ও শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ এস্তোনিয়া সরকারের বর্তমান লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি (যেমন: বায়ু ও সৌর শক্তি) থেকে সরবরাহ করা। ২০৩৫ সালের মধ্যে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ‘অয়েল শেল’-এর ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য আইনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘জাস্ট ট্রানজিশন ফান্ড’ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা কয়লা ও তেল খনি অঞ্চলের শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। বিনামূল্যে গণপরিবহন এবং গ্রিন ট্রান্সপোর্ট পরিবেশ রক্ষায় এস্তোনিয়ার রাজধানী টালিন বিশ্বজুড়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। ২০১৩ সালে এটি বিশ্বের প্রথম ইউরোপীয় রাজধানী হিসেবে নাগরিকদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গণপরিবহন সেবা চালু করে। এর ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার ব্যাপক হারে কমে যায়। ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির ৫৫ শতাংশ যাতায়াত সাইকেল, হাঁটা এবং ইলেকট্রনিক গণপরিবহনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। ডিজিটাল বিপ্লব বা ‘ই-এস্তোনিয়া’ কাগজের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে এস্তোনিয়া তাদের সরকারি সেবার ৯৯ শতাংশই ডিজিটাল বা অনলাইনে রূপান্তর করেছে, যাকে বলা হয় ‘ই-এস্তোনিয়া’। আমলাতান্ত্রিক কাজের জন্য নাগরিকদের সশরীরে যাতায়াত করতে হয় না। এর ফলে একদিকে যেমন লাখ লাখ টন কাগজের সাশ্রয় হচ্ছে (যা বন রক্ষায় ভূমিকা রাখছে), অন্যদিকে যাতায়াত কম হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমছে। বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও রিসাইক্লিং ২০০০ সালের দিকেও এস্তোনিয়ার উৎপাদিত সব বর্জ্য ল্যান্ডফিলে বা মাটির নিচে ফেলা হতো। কিন্তু বর্তমানে তারা উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। এখন দেশের বেশিরভাগ পৌর বর্জ্য রিসাইকেল করা হয় অথবা বর্জ্য পুড়িয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও তাপশক্তি উৎপাদন করা হয়। এস্তোনিয়ার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একটি শহর/ ছবি: ভিজিট এস্তোনিয়া বৈশ্বিক পরিচ্ছন্নতা দিবসের জন্মদাতা এস্তোনিয়ার পরিবেশ রক্ষা কেবল সরকারি কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি তাদের নাগরিকদের জীবনযাত্রার অংশ। খুব কম মানুষই জানেন যে, আজকের বৈশ্বিক আন্দোলন ‘ওয়ার্ল্ড ক্লিনআপ ডে’ এস্তোনিয়া থেকেই শুরু হয়েছিল। ২০০৮ সালে দেশটির প্রায় ৫০ হাজার নাগরিক মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় পুরো দেশের ১০ হাজার টন অবৈধ বর্জ্য পরিষ্কার করেছিলেন। পরবর্তীতে এই মডেলটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এস্তোনিয়ার রাজধানী টালিন/ ছবি: ভিজিট এস্তোনিয়া বাংলাদেশ কী শিখতে পারে? ২০২৪ সালের একই ইপিআই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৫তম, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বায়ুর চরম দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা এবং জলাশয় ভরাট বাংলাদেশকে তালিকার তলানিতে নামিয়ে এনেছে। এস্তোনিয়ার সাফল্য থেকে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা নিতে পারে: দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা: পরিবেশ রক্ষা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি যে একসঙ্গে সম্ভব, তা এস্তোনিয়া প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি: জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের দিকে ধাবিত হওয়া। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার: ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বর্জ্যকে শুধু ডাম্পিং না করে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা রিসাইক্লিংয়ের আধুনিক ব্যবস্থা করা। বিনামূল্যে গণপরিবহন: রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ি চালু করা এবং গণপরিবহনে বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা। পরিবেশ রক্ষা করে কীভাবে একটি দেশ আধুনিক, উন্নত এবং প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ এখন এস্তোনিয়া। বিশ্ব জলবায়ু সংকটের এই যুগে এস্তোনিয়ার এই ‘সবুজ মডেল’ অবশ্যই অনুকরণীয়। সূত্র: ইপিআই, ইউরোপা, এস্তোনিয়া জলবায়ু মন্ত্রণালয়, ইউরোস্ট্যাটকেএএ/
Go to News Site