Collector
রোহিঙ্গাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে যা উঠে এলো | Collector
রোহিঙ্গাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে যা উঠে এলো
Somoy TV

রোহিঙ্গাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে যা উঠে এলো

কক্সবাজারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘রিসার্চ টু প্র্যাকটিস: এভিডেন্স-বেসড অ্যাপ্রোচেস টু ফ্যাসিলিটেট বিহেভিয়ার চেঞ্জ’ শীর্ষক একটি গবেষণা ফলাফল প্রকাশনা কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ব্র্যাক জেমস পি. গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ (জেপিজিএসপিএইচ), বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং সুইস রেড ক্রসের (এসআরসি) যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এই গবেষণাটি ক্যাম্প ২-ইস্ট এবং ক্যাম্প ১৩-এ কম-বি ফ্রেমওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি, সদিচ্ছা ও চর্চার পরিবর্তনসমূহ মূল্যায়ন করা হয়। মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোতে দক্ষ প্রসব সহায়তাকারীদের বিষয়ে সচেতনতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, সন্তান প্রসবের জন্য বাড়িই সবচেয়ে নিরাপদ স্থান—এমন সনাতন ধারণাও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের সদিচ্ছা যেমন প্রবল ছিল, তেমনি গবেষণাকালীন সময়ে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হারেও দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া, সন্তান প্রসবের স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের জোরালো ভূমিকার কথাও জানিয়েছেন। আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের ভুলে না যাওয়ার আহ্বান ইউএনএইচসিআরের গবেষণায় পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। তুলনামূলক অন্যান্য এলাকায় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমলেও, প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোতে এর হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির বিষয়ে পুরুষদের সচেতনতা ও সম্মতি বৃদ্ধি এবং সামগ্রিকভাবে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রমের প্রসার এই ইতিবাচক ধারাকে ত্বরান্বিত করেছে। নারী ও পুরুষ উভয়েই কমিউনিটি স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবকদের পরিবার পরিকল্পনার তথ্যের প্রধান ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা মূলত স্থানীয় পর্যায়ে সমমনাদের মাধ্যমে পরিচালিত প্রচারণার গভীর প্রভাবকেই প্রমাণ করে। এই আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি সত্ত্বেও গবেষণায় বেশ কিছু চলমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এখনও স্বাস্থ্যসেবার সর্বোত্তম ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করছে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার না করার পেছনে ধর্মীয় কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে গুণগত উপাত্ত থেকে দেখা গেছে যে, পর্দা প্রথা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সন্তান প্রসবের সময় পুরুষ চিকিৎসকদের উপস্থিতির বিষয়ে দ্বিধাবোধের মতো গভীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এখনও প্রবল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, পরিবহন সংকট, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়, ওষুধের ঘাটতি, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং সেবাদানকারীদের আচরণের মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জসমূহ। এসব দীর্ঘস্থায়ী বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য গবেষণায় কমিউনিটি স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবক এবং ধর্মীয় নেতাদের ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তনের মূল অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বামী, ইমাম এবং স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে বিশেষ সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ—যার পাশাপাশি নিয়মিত গৃহ পরিদর্শন, প্রসূতি সহায়তা প্যাকেজ (মামা কিট) বিতরণ, গর্ভবতী নারীদের জন্য কমিউনিটি পরিবহন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সফল প্রসবের ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো সবার সঙ্গে বিনিময় করার মতো পদক্ষেপগুলো এই পরিবর্তনের পথে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের জন্য ২০ লাখ ইউরো সহায়তা ফিনল্যান্ডের অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিডিআরসিএস-এর সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির মো. আশরাফ আলম, এনডিসি সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিল সামাজিক বাস্তবতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মানবিক বিপর্যয়পূর্ণ পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের আচরণ মূলত সামাজিক রীতিনীতি, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক গতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা এবং সেবাপ্রাপ্তির চ্যালেঞ্জগুলোর একটি জটিল সংমিশ্রণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তিনি ব্যক্ত করেন, বিডিআরসিএস প্রমাণ-ভিত্তিক কর্মসূচি প্রণয়ন এবং সরাসরি জনমানুষের কাছ থেকে শেখার বিষয়ে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গবেষণা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং তা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মসূচির মানোন্নয়ন এবং সেবাগ্রহীতাদের বাস্তব জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখবে। বাংলাদেশে সুইস রেড ক্রসের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ পল ড্রসো এই পদ্ধতির কার্যকারিতার সম্পর্কে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কম-বি মডেলের প্রয়োগ থেকে এটি স্পষ্ট যে—সক্ষমতা, সুযোগ এবং প্রেরণা যখন একসঙ্গে জোরদার করা হয়, তখন প্রতিবন্ধকতাগুলোকেও ক্ষমতায়ন ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। কর্মশালার সমাপনী অংশে বলা হয়, এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ধারণাগুলোর পরিধি কেবল স্বাস্থ্য খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বক্তারা জানান, এই ফ্রেমওয়ার্ক থেকে প্রাপ্ত আচরণগত ধারণাগুলো মানবিক সহায়তার অন্যান্য খাত—যেমন ওয়াশ কর্মসূচিতে হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা, পুষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ কর্মসূচির জন্য একটি টেকসই মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, মানুষের আচরণকে বুঝতে পারাই যেকোনো কর্মসূচির সফলতার মূল চাবিকাঠি। আরও পড়ুন: নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০ হাজার ইয়াবাসহ ৯ রোহিঙ্গা আটক এই গবেষণা এবং ফলাফল প্রকাশনা অনুষ্ঠানের জন্য স্ট্যানলি জনসন ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানটিতে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, মানবিক সহায়তা সংস্থা, রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট মুভমেন্ট এবং বিভিন্ন একাডেমিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিডিআরসিএস-এর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল মেজর রেজা আহমেদ চৌধুরী, পিএসসি, সিপিপি (অব.); দুর্যোগ সাড়াদান ও মানবসম্পদ (অতিরিক্ত) বিভাগের পরিচালক জয়নাল আবেদীন; হেড অব অপারেশনস-পিএমও-এর পরিচালক আকরাম আলী খান; দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. রেজাউল করিম; আইআর ও কমিউনিকেশন এবং ফান্ড রাইজিং (অতিরিক্ত) বিভাগের পরিচালক আরিফা মেহেরা সিনহা; এবং প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এস এম হুমায়ুন কবির (অব.)।

Go to News Site