Jagonews24
মাইলের পর মাইল গাছহীন মহাসড়ক উন্নয়নের সঙ্গে সবুজের ভারসাম্য নেই উত্তরাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহের বড় ঝুঁকি একসময় যমুনা সেতু পার হয়ে উত্তরাঞ্চলের দিকে যাত্রা শুরু করলেই চোখে পড়তো সারি সারি রেইনট্রি, কড়ই, মেহগনি, শিমুল ও বিভিন্ন দেশীয় গাছ। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল, বগুড়ার শেরপুর, শহরতলি, শিবগঞ্জ, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর পেরিয়ে রংপুর পর্যন্ত দীর্ঘ পথজুড়ে ছিল প্রাকৃতিক সবুজের এক করিডোর। গ্রীষ্মের প্রখর রোদেও মহাসড়কের দুই পাশে ছায়ার উপস্থিতি যাত্রীদের স্বস্তি দিতো। আজ সেই চিত্র অনেকটাই অতীত। যমুনা সেতু থেকে রংপুর পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কিলোমিটার মহাসড়কের বড় অংশ এখন আধুনিক ছয় লেনে রূপ নিয়েছে। সড়ক হয়েছে প্রশস্ত, যান চলাচল হয়েছে দ্রুত। কিন্তু সেই উন্নয়নের বিনিময়ে হারিয়ে গেছে অসংখ্য পুরোনো গাছ। এখন সিরাজগঞ্জের নলকা থেকে হাটিকুমরুল, বগুড়ার শেরপুর থেকে মোকামতলা, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে পলাশবাড়ী হয়ে রংপুর পর্যন্ত অনেক অংশজুড়ে দেখা যায় খোলা আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ পিচঢালা সড়ক। দুপুরের রোদে রাস্তা যেন উত্তপ্ত ধাতব পাতের মতো তাপ ছড়ায়। পরিবেশবিদরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপপ্রবাহ বাড়ছে, তখন মহাসড়কের পাশে বড় গাছ হারিয়ে যাওয়ার প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরও প্রকট হবে। ‘যমুনা সেতু থেকে রংপুর পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কিলোমিটার মহাসড়কের বড় অংশ এখন আধুনিক ছয় লেনে রূপ নিয়েছে। সড়ক হয়েছে প্রশস্ত, যান চলাচল হয়েছে দ্রুত। কিন্তু সেই উন্নয়নের বিনিময়ে হারিয়ে গেছে অসংখ্য পুরোনো গাছ। এখন সিরাজগঞ্জের নলকা থেকে হাটিকুমরুল, বগুড়ার শেরপুর থেকে মোকামতলা, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে পলাশবাড়ী হয়ে রংপুর পর্যন্ত অনেক অংশজুড়ে দেখা যায় খোলা আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ পিচঢালা সড়ক। দুপুরের রোদে রাস্তা যেন উত্তপ্ত ধাতব পাতের মতো তাপ ছড়ায়’ এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর ছয় লেন প্রকল্প, যা ‘সাসেক-২ প্রকল্প’ নামে পরিচিত, উত্তরাঞ্চলের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সড়ক অবকাঠামো প্রকল্প। প্রায় ১৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ক উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয়েছে-হচ্ছে একাধিক ফ্লাইওভার, সেতু, কালভার্ট ও আন্ডারপাস। এর উদ্দেশ্য ঢাকা থেকে রংপুর বিভাগের যোগাযোগ সহজ করা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ। কিন্তু প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কত গাছ কাটা হয়েছে, কত গাছ স্থানান্তর করা হয়েছে কিংবা কত গাছ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। পরিবেশবাদীরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হলেও পরিবেশগত ব্যয়ের হিসাব প্রায় কখনোই সামনে আসে না। সিরাজগঞ্জের নলকা মোড় থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত একসময় মহাসড়কের দুই পাশে বিশাল আকৃতির রেইনট্রি ও কড়ই গাছ ছিল। একইভাবে বগুড়ার শেরপুর, ধুনট সংযোগ এলাকা, শহরতলী, শিবগঞ্জ ও মোকামতলা এলাকায় মহাসড়কের ধারে গড়ে উঠেছিল প্রাকৃতিক বৃক্ষসারি। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, মহিমাগঞ্জ, পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুর অংশেও ছিল দীর্ঘদিনের সবুজ বেষ্টনী। বর্তমানে এসব এলাকার বড় অংশেই পুরোনো গাছের অস্তিত্ব নেই। কোথাও নতুন চারা রোপণ করা হয়েছে, কোথাও মিডিয়ানে ঝোপজাতীয় গাছ লাগানো হয়েছে, তবে বহু কিলোমিটারজুড়ে এখনো বড় ছায়াদানকারী গাছের দেখা মেলে না। গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে রাস্তায় বের হলে গাছের ছায়া পাওয়া যেতো। এখন পুরো রাস্তা খোলা। দুপুরে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকাই কষ্টকর।’ ‘ছয় লেন হওয়ায় সময় বাঁচছে। কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার মতো ছায়া আর নেই। আগে অনেক জায়গায় গাছের নিচে গাড়ি থামিয়ে একটু আরাম করা যেতো। এখন আর সেই সুযোগ নেই’ শেরপুরের ট্রাকচালক নুর ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছয় লেন হওয়ায় সময় বাঁচছে। কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার মতো ছায়া আর নেই। আগে অনেক জায়গায় গাছের নিচে গাড়ি থামিয়ে একটু আরাম করা যেতো। এখন আর সেই সুযোগ নেই।’ রংপুরগামী বাসচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গরমের সময় এখন রাস্তায় তাপ অনেক বেশি লাগে। বিশেষ করে গোবিন্দগঞ্জ থেকে পলাশবাড়ী অংশে দুপুরে খুব বেশি রোদের তীব্রতা অনুভূত হয়।’ সড়ক ও জনপথ (সওজ) সূত্র বলছে, মহাসড়ক সম্প্রসারণে রাস্তার দুই পাশের বিপুল সংখ্যক গাছ অপসারণ করতে হয়েছে। তবে প্রকল্পজুড়ে মোট কত গাছ কাটা হয়েছে তার তথ্য নেই। পরিবেশবিদদের মতে, এই তথ্য প্রকাশ না হওয়াটা উদ্বেগজনক। কারণ দেশের অন্যান্য মহাসড়ক প্রকল্পে হাজার হাজার গাছ কাটার তথ্য সরকারি নথিতেই রয়েছে। টাঙ্গাইল-আরিচা মহাসড়ক সম্প্রসারণে দুই হাজার ৩৭৯টি গাছ কাটা হয়েছিল। অন্যদিকে এলেঙ্গা-ভূঞাপুর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে কয়েক হাজার গাছ অপসারণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব উদাহরণ বিবেচনায় যমুনা সেতু থেকে রংপুর পর্যন্ত দীর্ঘ চার লেন প্রকল্পে গাছ কাটার সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আরও পড়ুন: বিষ-প্লাস্টিক-বর্জ্যে বিপন্ন সুন্দরবনসড়কের সরকারি গাছ কেটে নিজের স’ মিলে নিলেন বিএনপি নেতা!খাল খননের সুযোগে চলছে গাছ কাটার মহোৎসবসংরক্ষিত বন থেকে উজাড় হচ্ছে গাছ-বাঁশআলীকদমে অবাধে বন উজাড়, কমছে বন্যপ্রাণীসড়কের পাশের গাছ কাটতে কীভাবে অনুমতি নিতে হবে, হাইকোর্টের রায় প্রকাশশহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড় গাছ কাটার ভয়াবহতা প্রসঙ্গে বনবিদ ইশতিয়াক উদ্দিন আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না; এটি বায়ুদূষণ কমায়, ধুলা শোষণ করে, শব্দ নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহাসড়কের পাশে বড় গাছের সারি থাকলে রাস্তার পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কম থাকে। ছায়াহীন পিচঢালা সড়ক দিনে সূর্যের তাপ শোষণ করে আশপাশের পরিবেশকে আরও উষ্ণ করে তোলে। উত্তরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেখানে মহাসড়কপাড়ের সবুজ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’ ‘উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় মহাসড়কের পাশের বড় গাছগুলো শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বড় গাছ হারানো মানে প্রাকৃতিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়া’ উন্নয়ন প্রকল্পে গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়ার সময় প্রতিস্থাপনমূলক বনায়নের শর্ত থাকে বলে জানান রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহাংগীর আলম। তিনি বলেন, যে গাছগুলো অপসারণ করা হয়েছে, তার বিপরীতে নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সামাজিক বনায়ন ও সড়কপাড়ে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও চলছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ৩০-৪০ বছরের পুরোনো একটি গাছের সমপরিমাণ পরিবেশগত সুবিধা পেতে নতুন গাছকে বড় হতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। সাসেক-২ প্রকল্প পরিচালক ড. ওয়ালিউর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ছয় লেন মহাসড়ক নির্মাণে নির্দিষ্ট প্রস্থ, নিরাপত্তা অঞ্চল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয় বিবেচনা করতে হয়। তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। তবে নতুন প্রকল্পগুলোতে সবুজায়ন ও ল্যান্ডস্কেপিংয়ের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনা সেতু থেকে হাটিকুমরুল, শেরপুর, বগুড়া, মোকামতলা, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী হয়ে রংপুর পর্যন্ত ছয় লেন মহাসড়ক এখন উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি পরিবেশগত ভারসাম্যের একটি পরীক্ষাক্ষেত্রও। একদিকে উন্নত যোগাযোগ, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া বৃক্ষসারি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন উত্তরাঞ্চলে তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়ছে, তখন মহাসড়কের দুই পাশে নতুন করে পরিকল্পিত বনায়ন না হলে আগামী এক দশকে এই সড়ক আরও উষ্ণ করিডোরে পরিণত হতে পারে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত জানান, উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় মহাসড়কের পাশের বড় গাছগুলো শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তার মতে, বড় গাছ হারানো মানে প্রাকৃতিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়া। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সড়ক শুধু যানবাহনের জন্য নয়, মানুষের জন্যও। একটি আধুনিক মহাসড়কে নিরাপত্তা, গতি ও সবুজ—এ তিনটির সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। এলবি/এসআর/এএসএম
Go to News Site