Collector
প্রিপেইড মিটারে ‘ডিজিটাল বিড়ম্বনা’ | Collector
প্রিপেইড মিটারে ‘ডিজিটাল বিড়ম্বনা’
Somoy TV

প্রিপেইড মিটারে ‘ডিজিটাল বিড়ম্বনা’

বিদ্যুৎ অপচয় রোধ এবং বিল ব্যবস্থাপনা সহজ করার বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার চালু করা হয়েছিল। কিন্তু গ্রাহকের সুবিধা বাড়ানোর জন্য নেয়া এই আধুনিক উদ্যোগই এখন সাধারণ ও আবাসিক গ্রাহকদের জন্য চরম বিড়ম্বনা ও দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিদ্যুৎ বিলের নানা অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম আর গ্রাহক ভোগান্তি ঠেকাতে প্রিপেইড বা ডিজিটাল মিটার বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে সেই উদ্যোগই এখন ‘ডিজিটাল বিড়ম্বনা’ হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রথাগত পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বিল পরিশোধে দেরি করলেও বিদ্যুৎ সংযোগ সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করা হয় না। কিন্তু প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। বর্তমানে বিপিডিবি, ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকোসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। তবে এসব মিটারের রিচার্জ প্রক্রিয়া দাম সমন্বয়ের জাঁতাকলে শত শত ডিজিটের টোকেন নাম্বার গ্রাহকদের জন্য মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসাবো এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রব জানান, শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে তিনি বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা রিচার্জ করেন। অন্য সময় ১৬ থেকে ৪৮ ডিজিটের টোকেন নম্বর আসলেও আজকের টোকেন নম্বর দেখে তার চোখ ছানাবড়া। এমনিতেই সতর্কতার কারণে তিনি মিটারের কাছে যেতে ভয় পান। আজ তার মোবাইলে টোকেন নম্বর এসেছে ১৮০ ডিজিটের! আধা ঘণ্টা ধরে দুইবার চেষ্টা করেও মিটারের কি-প্যাডে এই বিশাল নম্বরটি সঠিকভাবে প্রবেশ করাতে না পেরে অবশেষে ধৈর্য হারান তিনি। এ বিষয়ে ডিপিডিসির কাস্টমার কেয়ারের (১৬১১৬) সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সব সময় এমন দীর্ঘ টোকেন আসে না। মূলত বিদ্যুতের নতুন দাম বা ট্যারিফ সমন্বয় করতে গিয়েই সিস্টেমে এই সাময়িক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। খুব দ্রুতই এর সমাধান হবে। কোনো গ্রাহক এমন সমস্যায় পড়লে যোগাযোগ করলে তা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। মিরপুরের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট নাহিদ শাহিন জানান, তার বাসায় ডেসকোর প্রিপেইড মিটার বসানো হয়েছে। বিভিন্ন অসন্তোষের পাশাপাশি ইদানিং ভৌতিকভাবে মিটারে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। তিনি আরও বলেন, মাত্র এক-দুই দিনের জন্য মিটার রিচার্জ করতে ভুলে গেলেই কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়া ঘরের বাতি নিভে যায় এবং লাইন কেটে যায়। আরও পড়ুন:বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ প্রত্যাহার নিয়ে ফেসবুকে নতুন করে আলোচনা অনেক মিটারের ব্যালেন্স শেষ হওয়ার আগে লাল বাতি জ্বলা বা অ্যালার্ম দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও বহুতল ভবনের নিচে বা সুবিধাজনক স্থানে মিটার না থাকায় তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সবার জন্য সম্ভব হয় না। বক্সে বন্দি মিটারে কখন লাল বাতি জ্বলল, তা গ্রাহক বুঝতে পারেন কেবল তখনই, যখন হঠাৎ করে পুরো বাসার বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রিপেইড মিটারের ভেতরে থাকা ছোট ব্যাটারিটি নিয়েও আবাসিক ব্যবহারকারীদের ভোগান্তির শেষ নেই। সাধারণত লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় এই ব্যাটারিটি মিটারে পাওয়ার সাপ্লাই দেয়, এটাও যেন ব্যাটারি আর পাঞ্চ কার্ডের আমলাতান্ত্রিক আরেক ফাঁদ। এর চার্জ কোনো কারণে কমে গেলে মিটারে পর্যাপ্ত টাকা থাকা সত্ত্বেও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। অনেকেই অভিযোগ করছেন, প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ও বয়স্ক মানুষদের জন্য কখনো কখনো ২০০ থেকে ৩০০ সংখ্যার দীর্ঘ পিন কোড টাইপ করা চরম বিভ্রান্তি ও হতাশার সৃষ্টি করছে। টাইপ করার সময় একটি মাত্র সংখ্যা ভুল বা বাদ পড়লে পুরো প্রক্রিয়াটি আবার শুরু থেকে করতে হয়। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে গ্রাহকদের স্থানীয় অফিসে যোগাযোগ করে টেকনিশিয়ানের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু এই যান্ত্রিক গোলযোগ যদি রাতের বেলা কিংবা ছুটির দিনে ঘটে, তবে তীব্র গরম ও অন্ধকারের মধ্যেই গ্রাহকদের পুরো রাত কাটাতে হয়। অন্যদিকে, যেসব মিটারে পাঞ্চ কার্ড ব্যবহার করা হয়, সেই কার্ডটি পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন কার্ড পাওয়ার আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুরো সময়টাই গ্রাহককে বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে কাটাতে হচ্ছে। ১৮০/৩০০ডিজিট- এতো বড় সংখ্যা কেন আসে? একটি সাধারণ রিচার্জে ১৬ বা ২০ ডিজিটের কোড আসে, ওই কোড মিটারে প্রবেশ করালেই মিটারে টাকা যুক্ত হয়। কিন্তু যখনই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা ট্যারিফ পরিবর্তন হয় তখন টোকেনের আকার বিশাল হয়ে যায়। এর কারণ এই দীর্ঘ কোডের ভেতর অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন 'কমান্ড' বা তথ্য লুকানো থাকে। ১. প্রিপেইড মিটারগুলো কোনো অনলাইন সার্ভারের সঙ্গে প্রতি সেকেন্ডে যুক্ত থাকে না (স্মার্ট মিটার বাদে)। তাই মিটারের ভেতরে থাকা চিপকে জানাতে হয় যে, এখন থেকে প্রথম ইউনিট থেকে শুরু করে পরবর্তী ইউনিটগুলোর দাম কত টাকা করে কাটা হবে। ২.যদি আগের কোনো বকেয়া থাকে, কিংবা প্রতি মাসের ফিক্সড ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া জমে থাকে, তবে সেই হিসাবও এই কোডের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ৩. বিদ্যুৎ চুরি বা হ্যাকিং রোধ করতে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড (STS - Standard Transfer Specification) অনুযায়ী এই পুরো তথ্যটিকে একটি অত্যন্ত জটিল এবং সুরক্ষিত কোডে রূপান্তর করা হয়। যেহেতু তথ্যের পরিমাণ অনেক বেশি, তাই এনক্রিপশন শেষে কোডটি ১৮০, ৩০০ এমনকি সর্বোচ্চ ৩২০ ডিজিট পর্যন্ত লম্বা হয়ে যায়। এ কারণে যখনই সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, অথবা যেকোন কমান্ড বা তথ্য আপডেট করা হয়, এরপর কোনো গ্রাহক প্রথমবার বিকাশ, রকেট বা ভেন্ডিং স্টেশন থেকে টাকা রিচার্জ করেন, তখন সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুঝতে পারে যে এই মিটারের 'ট্যারিফ আপডেট' করা প্রয়োজন। সার্ভার তখন টাকার টোকেনের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের টোকেনটি জোড়া লাগিয়ে একবারে বিশাল একটি কোড তৈরি করে গ্রাহকের মোবাইলে পাঠিয়ে দেয়। আরও পড়ুন:প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত অন্যদিকে যেসব মিটার শতভাগ অনলাইন বা ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে চলে, সেগুলোতে গ্রাহককে কোনো বাটন চাপতেই হয় না। বিদ্যুৎ অফিস তাদের কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে এক ক্লিকেই দেশের সব স্মার্ট মিটারের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট করে দিতে পারে। গ্রাহক অ্যাপে রিচার্জ করলেই ব্যাক-এন্ডে সব কাজ হয়ে যায়। সরকার বর্তমানে সব সাধারণ প্রিপেইড মিটারকে এই স্মার্ট মিটারে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে জানা যায়।

Go to News Site