Jagonews24
বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং সঠিক বৈজ্ঞানিক সমাধান ও সমন্বিত নীতিমালার অভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট ঝুঁকি। ঢাকার চিরাচরিত সাধারণ উৎসগুলোর বাইরে মেগা প্রজেক্টের ধুলা, ই-বর্জ্যসহ দূষণের মতো নতুন উৎসগুলোর কারণে বছরের সিংহভাগ সময়ই বাতাসের মান থাকছে অস্বাস্থ্যকর। শীতকাল পেরিয়ে গরমেও দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দেশে গত এক দশকে বায়ুর মানের অবক্ষয়, এলাকাভিত্তিক দূষণের বৈজ্ঞানিক কারণ, আইনি প্রয়োগের ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান নিয়ে সম্প্রতি জাগো নিউজের মুখোমুখি হন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক রায়হান আহমদ। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জাগো নিউজ: বাংলাদেশে বর্তমানে বায়ুদূষণের সাধারণ উৎসগুলোর পাশাপাশি নতুন উৎস কী পেয়েছেন? কামরুজ্জামান মজুমদার: প্রচলিত উৎসের বাইরে বর্তমানে প্রধান নতুন উৎস হলো মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার ও ভবন নির্মাণের মতো মেগা প্রজেক্টের ধুলা, যা বাতাসে ব্যাপকহারে ছড়াচ্ছে। এছাড়া যানজটে গাড়ি স্থির থাকা অবস্থায় নির্গত ধোঁয়া, অপরিকল্পিত ই-বর্জ্য ও ব্যাটারি রিসাইক্লিং এবং অনিয়ন্ত্রিত কংক্রিট মিক্সিং প্ল্যান্ট দূষণ বাড়াচ্ছে। আরেকটি বড় উৎস হলো আন্তঃসীমান্ত দূষণ; শুষ্ক মৌসুমে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যা দেশের মোট দূষণের প্রায় ৩০-৪০ শতাংশের জন্য দায়ী। জাগো নিউজ: আপনি দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণা করছেন। গত এক দশকে বাংলাদেশের বায়ুর মানে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন? কামরুজ্জামান মজুমদার: গত এক দশকে বাংলাদেশের বায়ুর মানের মারাত্মক অবক্ষয় ঘটেছে, যার মধ্যে ফুসফুসের গভীরে প্রবেশকারী সূক্ষ্ম কণার বৃদ্ধি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আগে দূষণ মূলত শীতকালকেন্দ্রিক থাকলেও এখন শুষ্ক মৌসুমের পরিধি বেড়ে মার্চ-এপ্রিলেও বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ থাকছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নিরাপদ সীমার চেয়ে তা ১০-১৫ গুণ বেশি দূষিত হচ্ছে। এছাড়া দূষণ এখন আর ঢাকার নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ প্রায় সব বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সূক্ষ্ম কণার আধিক্যের কারণে বায়ুদূষণ এখন কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, বরং হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসার বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি বড় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জাগো নিউজ: ঢাকার একেক এলাকার দূষণ পরিস্থিতি একেক রকম কেন? শিল্পাঞ্চল ছাড়াও অনেক এলাকায় দূষণ বেশি। যেমন বাড্ডা, গুলশানের মতো পরিকল্পিত জায়গায় এত দূষণ কেন? পরিবেশবান্ধব নির্মাণ নীতির মাধ্যমে ৯০ শতাংশ দূষণ কমানো সম্ভব/ছবি-জাগো নিউজ কামরুজ্জামান মজুমদার: ঢাকার বায়ুদূষণ এলাকাভেদে ভিন্ন হওয়ার পেছনে স্থানীয় পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা ও ভূখণ্ডগত বৈশিষ্ট্য কাজ করে। যেমন- বাড্ডা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রগতি সরণির তীব্র যানজট ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির ধোঁয়ার কারণে দূষিত। অন্যদিকে গুলশান পরিকল্পিত বাণিজ্যিক হাব হলেও সেখানে ‘আর্বান ক্যানিয়ন ইফেক্ট’র কারণে বহুতল ভবনের মাঝখানের বাতাস আটকে থাকে এবং ধোঁয়া ও ধূলিকণা সহজে সরতে পারে না। এছাড়া গুলশানে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক গাড়ির উচ্চ ঘনত্ব থেকে প্রচুর নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত হয়। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে বাড্ডা ও সাঁতারকুল এলাকার উন্মুক্ত ধুলোবালি বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে সহজেই গুলশানের বাতাস দূষিত করে তোলে। জাগো নিউজ: শীত মৌসুমের পরে চলতি বছর মার্চ-এপ্রিলেও বেশ কয়েকদিন ঢাকার বাতাস অনেক বেশি দূষিত ছিল, এমন হওয়ার কারণ কী? কামরুজ্জামান মজুমদার: সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে বৃষ্টি ও বাতাসের গতি বাড়লে দূষণ কমে, তবে সাম্প্রতিক উচ্চ দূষণের পেছনে কিছু আবহাওয়াগত কারণ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এবার বিলম্বিত ও কম বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার কারণে বাতাসে ঝুলে থাকা ধূলিকণা নিচে থিতিয়ে পড়তে পারেনি। এছাড়া তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বাতাসের উদ্বায়ী জৈব যৌগ ও নাইট্রোজেন অক্সাইড রাসায়নিক বিক্রিয়া করে ক্ষতিকর গ্রাউন্ড-লেভেল ওজন এবং সেকেন্ডারি পার্টিকুলেট ম্যাটার তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা ও বাতাসের গতি কম থাকায় দূষকগুলো সরতে পারেনি এবং বৃষ্টি না হওয়ায় ঢাকার চারপাশের ইটভাটাগুলো এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত পুরোদমে চালু থাকায় দূষণের সময়সীমা দীর্ঘায়িত হয়েছে। জাগো নিউজ: আপনি বায়ুদূষণ মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক সমাধান নিয়েও কাজ করছেন। বাংলাদেশে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান হিসেবে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত? এক দশকে দেশের বায়ুর মানের মারাত্মক অবক্ষয়/ছবি-জাগো নিউজ কামরুজ্জামান মজুমদার: বায়ুদূষণ রোধে সাময়িক ব্যবস্থা ছেড়ে উৎসভিত্তিক বৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে। প্রথমত, সনাতন ইটভাটা বন্ধ করে ২০২৮ সালের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি নির্মাণে শতভাগ কংক্রিট ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং ২০ বছরের পুরোনো যানবাহন রাস্তা থেকে অপসারণ করে বৈদ্যুতিক গণপরিবহন চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্মাণ সামগ্রী ঢেকে রাখা, নিয়মিত পানি ছিটানো, শহরের ফাঁকা জায়গায় ধূলিকণা শোষণকারী উদ্ভিদের নগর বনায়ন এবং কারখানায় আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। জাগো নিউজ: পরিবেশ আইন ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে কোথায় ঘাটতি দেখেন? কামরুজ্জামান মজুমদার: বাংলাদেশে শক্তিশালী আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও প্রধান ঘাটতি হলো পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব। দেশের বিশাল সংখ্যক শিল্পকারখানা ও ইটভাটা নিয়মিত তদারকি করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক ল্যাব ও লজিস্টিকসের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা দূষণের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো টেকসই হয় না। আইনে দূষণকারী বড় প্রতিষ্ঠানকে যে নামমাত্র জরিমানা করা হয়, তা দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সচল রাখার খরচের চেয়ে কম হওয়ায় অনেকে জরিমানা দেওয়াকেই লাভজনক মনে করে। উপরন্তু, প্রভাবশালী মালিকদের কারণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও আইন বাস্তবায়নে বড় বাধা। জাগো নিউজ: উন্নয়ন আর পরিবেশের ভারসাম্য বজায় হবে কীভাবে? ছবি/সংগৃহীত কামরুজ্জামান মজুমদার: ‘আগে উন্নয়ন, পরে পরিবেশ’ এই মানসিকতা বদলাতে হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের শত্রু না ভেবে ‘টেকসই উন্নয়ন’ ধারণাকে জাতীয় নীতিমালার মূলভিত্তি বানাতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নের শুরু থেকেই পরিবেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ‘সবুজ জিডিপি’ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে পরিবেশের ক্ষতি ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় জিডিপি থেকে বাদ দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন হিসাব করা হবে। যে কোনো মেগা প্রজেক্টের আগে নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে বাজেটের ৫-১০ শতাংশ পরিবেশ প্রশমন ও বনায়নে বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে পুরো নির্মাণ এলাকা নেট দিয়ে ঢাকা ও পানি ছিটানোর মতো ‘সবুজ নির্মাণ’ নীতি অনুসরণ করলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত না করেই ৯০ শতাংশ দূষণ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানি কমিয়ে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। জাগো নিউজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। কামরুজ্জামান মজুমদার: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। আরএএস/এমআরএম/ এমএফএ
Go to News Site