Somoy TV
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করতে মাত্র তিন মাস আগেই চালানো হয়েছিল বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান। কিন্তু সেই উচ্ছেদের রেশ কাটতে না কাটতেই, পবিত্র ঈদুল আজহার আগেই আবারও সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে গড়ে উঠেছে শত শত ঝুপড়ি দোকান। ফলে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার বালিয়াড়ি আবারও পরিণত হয়েছে পুরোনো বস্তিতে। জেলা প্রশাসন বলছে, বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন এবং আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।সরেজমিনে দেখা যায়, সুগন্ধা পয়েন্টের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে আশপাশের বালিয়াড়িতে এখন শত শত ঝুপড়ি দোকান, ত্রিপল আর ভ্যানগাড়ি দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী স্থাপনা। সড়কের দুই পাশেও শামুক-ঝিনুক, আচার, চা-পান ও প্রসাধনীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু সুগন্ধা পয়েন্ট নয়, কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়ি ও প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সাগরলতা অঞ্চলেও একই অবস্থা। চারদিকে শুধু দোকানপাটের ছড়াছড়ি।পরিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে চলতি বছরের মার্চে কক্সবাজার সফরে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈকতের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেন। এরপর জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে অভিযানে উচ্ছেদ করা হয় সহস্রাধিক অবৈধ দোকান ও স্থাপনা। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে আবারও সেই বালিয়াড়িতে গড়ে উঠেছে স্থাপনা।সুগন্ধা পয়েন্টের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে আশপাশের বালিয়াড়িতে এখন শত শত ঝুপড়ি দোকান। সড়কের দু’পাশেও শামুক-ঝিনুক, আচার, চা-পান ও প্রসাধনীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।তবে দোকানিদের দাবি, উচ্ছেদের পর তাদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়নি। জীবিকার তাগিদেই তারা আবারও সৈকতে ফিরে এসেছেন এবং উচ্চ আদালতে রিট করেছেন।সুগন্ধা পয়েন্টের ব্যবসায়ী আজিজুল হাকিম তারেক বলেন, দীর্ঘ সময় উচ্ছেদের পর তারা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কিন্তু কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।তিনি জানান, বাধ্য হয়েই তারা মহামান্য হাইকোর্টে রিট করেছেন এবং পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। কেন তাদের সরিয়ে দেওয়া হলো এবং কেনই বা পুনর্বাসন করা হচ্ছে না, এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে পর্যটন খাতে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করলেও তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জেলা প্রশাসন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান, যাতে বিষয়টির ন্যায়সঙ্গত সমাধান হয়।আরও পড়ুন: সৈকতের বালিয়াড়ি বস্তিমুক্ত করতে নতুন নিদের্শনা: ঝুপড়ি দোকানের অনুমতি বাতিলসুগন্ধা পয়েন্টের ব্যবসায়ী ফরিদুল আলম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশাসনকে পুনর্বাসনের বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও এখনো সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং কার্ড নবায়ন না করার বিষয়ে একটি নোটিশ জারি করা হয়েছে। এই কারণে আমরা যারা ব্যবসায়ীরা রয়েছি, সবাই এখন আতংকে মধ্যে রয়েছি।শুধু সুগন্ধা পয়েন্ট নয়, কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়ি ও প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সাগরলতাতে একই অবস্থা। চারদিকে শুধু দোকানপাট আর দোকানপাট। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, বারবার উচ্ছেদ অভিযান হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না থাকায় আবারও ফিরে আসে দখলদাররা।কলাতলীস্থ সী ক্রাউন হোটেলের ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে প্রশাসনের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তবে ঈদের আগে আবারও এসব দোকান বসে যেতে দেখা যায়।তিনি জানান, এতে পর্যটকদের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে এবং সমুদ্রসৈকতে যাতায়াতেও বাধা তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, সমুদ্রসৈকতে কোনোভাবেই বস্তির মতো অবৈধ স্থাপনা থাকা উচিত নয়। তার মতে, পৃথিবীর কোনো উন্নত পর্যটন এলাকায় এ ধরনের দৃশ্য দেখা যায় না।আরও পড়ুন: সম্ভাবনা সত্ত্বেও দেশের পর্যটন খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই কেন?তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অন্যত্র পুনর্বাসন করে পরিকল্পিত একটি দৃষ্টিনন্দন মার্কেট গড়ে তোলা উচিত, যাতে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আগের রূপ ফিরিয়ে আনা যায়।তিনি আরও জানান, সৈকতে অব্যবস্থাপনার কারণে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং কক্সবাজার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে, যা পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতিকর।হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, কিছু পক্ষের হঠকারী সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যটন এলাকার শৃঙ্খলা ফেরাতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা তারা স্বাগত জানিয়েছেন। একইসঙ্গে মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক চিঠিপত্রের উদ্যোগকেও তিনি সাধুবাদ জানান।তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারকে কোনোভাবেই পুনর্বাসন এলাকা হিসেবে নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ও পরিচ্ছন্ন পর্যটন নগরী হিসেবেই ধরে রাখতে চান তারা।কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্যোগে সৈকত ব্যবস্থাপনায় যে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা হয়েছিল, তা আবারও ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। সৈকত এলাকায় পুনরায় দখল ও অব্যবস্থাপনা পর্যটন খাতের জন্য ইতিবাচক নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।তিনি বলেন, কক্সবাজারে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন। আইনগত ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদেরও নিয়মের মধ্যে রেখে সৈকতকে আরও পর্যটকবান্ধব ও আকর্ষণীয় করা সম্ভব।তিনি আরও জানান, এ পরিস্থিতি সাময়িকভাবে হলেও একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে কক্সবাজারের পর্যটন পরিবেশ সুন্দর ও টেকসই থাকে।পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বহু বছর ধরে বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে সৈকত আবার প্রকৃত রূপে ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় দখল হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বালিয়াড়িকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।এদিকে জেলা প্রশাসন বলছে, বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, এ বিষয়ে তারা একটি রিটের জবাব প্রস্তুত করেছেন এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এদিকে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর জন্য ইস্যুকৃত সব সাময়িক কার্ড বাতিল করেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে নতুন করে আর কোন অনুমতি প্রদান না করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে।কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে একের পর এক ঝুপড়ি দোকান স্থাপন করে বস্তিতে রূপ নেয়া ঠকাতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলা হয়েছে।গত সোমবার (১ জুন) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পর্যটন সেলের সহকারী কমিশনার স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।আদেশে বলা হয়, সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে নতুন কোনো সাময়িক কার্ড ইস্যু করা হবে না। পাশাপাশি ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ইস্যুকৃত ও নবায়নকৃত সব কার্ড ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আর নবায়ন করা হবে না। কার্ডধারীরা নির্ধারিত শর্তাবলী যথাযথভাবে প্রতিপালন না করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সুপারিশের আলোকে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
Go to News Site