Jagonews24
স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক রোগী ভবিষ্যতে কেমোথেরাপি ছাড়াই চিকিৎসা নিতে পারবেন বলে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, বিশেষ ধরনের একটি ডিএনএভিত্তিক জিন পরীক্ষা নির্ধারণ করতে সক্ষম যে কোন রোগী কেমোথেরাপি থেকে প্রকৃত উপকার পাবেন এবং কার ক্ষেত্রে এই চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষকে কেমোথেরাপি না দিয়েও সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে হরমোন থেরাপিই যথেষ্ট কার্যকর ছিল, ফলে কেমোথেরাপির নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, কেমোথেরাপির ফলে অনেক রোগীর ক্লান্তি, বমিভাব, চুল ঝরে যাওয়া, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস এবং প্রজননসংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি এড়ানোর সুযোগ চিকিৎসা বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দেয় ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)। এতে যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ডের ৪০ বছরের বেশি বয়সী সদ্য শনাক্ত হওয়া ৪ হাজারেরও বেশি স্তন ক্যানসার রোগী অংশ নেন। গবেষণায় ‘প্রোসিগনা’ নামের একটি জিন পরীক্ষার ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষাটি স্তন ক্যানসারের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত ৫০টি জিনের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যতে রোগটি পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটা, তা নির্ণয় করে। যেসব রোগীর ঝুঁকির স্কোর কম ছিল, তাদের কেমোথেরাপি দেওয়া হয়নি। এই নিম্ন-ঝুঁকির রোগীরাই গবেষণায় অংশ নেওয়া মোট রোগীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলাফলে দেখা যায়, কেমোথেরাপি ছাড়া চিকিৎসা পাওয়া এই রোগীদের পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৯৪ দশমিক ৯ শতাংশ। দুই দলের ফলাফলের পার্থক্য খুবই সামান্য। বর্তমানে স্তন ক্যানসারের প্রধান চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ। পরবর্তীতে রোগ পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে অনেক ক্ষেত্রেই কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের সেইসব রোগীদের ক্ষেত্রে, যাদের ক্যানসার নিকটবর্তী লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসকদের একটি অংশের মধ্যে ধারণা ছিল যে স্তন ক্যানসারের সবচেয়ে প্রচলিত ধরনে সব রোগীর জন্য কেমোথেরাপি সমানভাবে উপকারী নাও হতে পারে। নতুন গবেষণাটি সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। আরও পড়ুন: বেশি মাংস খেয়ে বদহজম? জেনে নিন দ্রুত সমাধান জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে যা করতে হবে চিনি ছাড়ার পর দ্রুত ওজন কমার রহস্য গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতি চালু হলে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসের আওতায় প্রতিবছর ৫ হাজারের বেশি রোগী অপ্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি থেকে রেহাই পেতে পারেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া কার্ডিফের বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী ক্যারেন বনহ্যামও এর সুফল পেয়েছেন। প্রোসিগনা পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি কেমোথেরাপি ছাড়াই চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তার চিকিৎসার অংশ হিসেবে রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়, যা তিনি আট বছর ধরে গ্রহণ করেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ক্যারেন বলেন, ক্যানসার ধরা পড়া এবং চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটি মানুষের জীবনে বড় ধরনের মানসিক ধাক্কা সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতিতে এই পরীক্ষার ফলাফল তার জন্য স্বস্তি ও আশার বার্তা নিয়ে এসেছিল। গবেষণাটির ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যানসারবিষয়ক সম্মেলন-আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (এএসসিও) বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হবে। গবেষণার প্রধান এবং ইউসিএল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ব্রেস্ট অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক রব স্টেইন বলেন, এই গবেষণা রোগীদের জন্য আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও নির্ভুল চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র প্রচলিত ক্লিনিক্যাল তথ্যের ওপর নির্ভর না করে টিউমারের জৈবিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা চিকিৎসার মান উন্নত করতে সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, এর ফলে অনেক রোগী কেমোথেরাপির শারীরিক ও মানসিক চাপের পাশাপাশি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও মুক্ত থাকতে পারবেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্পদের আরও কার্যকর ও তথ্যনির্ভর ব্যবহার নিশ্চিত হবে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই ফলাফল ৪০ বছরের কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও কয়েক বছর গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। তথ্যসূত্র: বিবিসি জেএস/
Go to News Site