Somoy TV
ভারতবর্ষ যার ৮’শ বছর শাসন করেছে মুসলমানরা। এরমধ্যে ৪’শ বছর শাসন করে মোঘলরা। ইতিহাস বলছে: দীর্ঘ মুসলমান শাসনে ধর্মান্তর হলেও সনাতন হিন্দুদের ধর্ম নিঃশেষ হয়ে যায়নি। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর ২’শ বছরের ইংরেজ শাসন; তখনও বহাল তবিয়তে টিকে ছিল হিন্দু ধর্ম। তারপর স্বাধীন ভারতে নেহরু ইন্দিরাসহ চার দশকের কংগ্রেস শাসনে কখনও এতো জোরালো হয়নি হিন্দুত্ববাদ। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে কেন্দ্রে বাড়তে থাকে গুজরাটি লবিং বলে পরিচিত বলয়ের প্রভাব। এরপর থেকে বিজেপির একের পর এক রাজ্য জয়ে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণার দাবি জোরালো হতে থাকে। একটু বাড়িয়ে কোনো কোনো নেতা বলেছেন মুসলিমদের ঘুষপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারী। দিল্লির এনআরসি বিরোধী বিক্ষোভের সময় বিজেপি চাণক্য নামে পরিচিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ভারতের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানাবেন মুসলমানদের। উত্তর প্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্র, বিহার, দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিজেপি সরকার গঠনের পর জোরালো হতে থাকে মুসলিম বিদ্বেষ। গুজরাটের দুই দশক দখলে রাখা মোদি শাহর জুটির বিজেপি- আসামের পর সবশেষ পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায়। সবশেষ দেশটির ১২টি রাজ্যে সরকার পরিচালনায় বিজেপি। বিধান সভার গুলোতে আঞ্চলিক দলগুলোর পরাজয়ের পর থেকে দেশটির মুসলিমরা পড়ছেন নানা সমস্যায়। এনআরসি থেকে সিএএ এর পর বিধানসভা নির্বাচনের আগে নাগরিক সংশোধন আইন বা এসআইআর। নিজেদের ভারতীয় প্রমাণে দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিমদের বারবার দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের পরীক্ষা। ভোটার কার্ড আছে। আধার কার্ড আছে। রেশন কার্ড আছে। বাবা ভারতবর্ষের মাটিতেই জন্মেছিলেন। তার সন্তানও ভারতেই জন্ম নিয়েছে। কিন্তু একদিন হঠাৎ পুলিশ এসে তাকে বলে প্রমাণ করো তুমি এই দেশের নাগরিক। সে বলে, “আমি ভারতীয়”। কিন্তু তার কথা কেউ শুনতে চায় না। তার ভাষা বাংলা। তার ধর্ম ইসলাম। আর এই দুই পরিচয়ই যেন তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন বহু ঘটনার খবর সামনে এসেছে। যেখানে বাংলাভাষী মুসলিমদের অবৈধ বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, আটক করা হয়েছে, ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে কিংবা সীমান্তে ঠেলে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকার বলছে, তারা কেবল অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে। প্রশ্ন উঠছে, বাংলাভাষী মুসলিমদের ঘিরে কেন এত বিতর্ক? কেন নাগরিকত্ব প্রশ্নে ভারতের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি তৈরি হয়েছে? আর এর প্রভাব বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ওপর কতটা গভীর হতে পারে? ভাষা, ধর্ম এবং সন্দেহের রাজনীতি ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটির কাছাকাছি। দেশটির অন্যতম বৃহৎ ভাষা বাংলা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক মানবাধিকার কর্মী ও গবেষক দাবি করছেন, বাংলাভাষী মুসলিম পরিচয়কে ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। ভারতের বহু শ্রমজীবী মুসলিম পরিবার এখন কেবল বাংলায় কথা বলার কারণেই সন্দেহের চোখে দেখা হওয়ার ভয় নিয়ে বেঁচে আছে। মুম্বাইয়ে কর্মরত বহু শ্রমিক অভিযোগ করেছেন, বাংলা ভাষা, লুঙ্গি বা খাদ্যাভ্যাসকেও অনেক সময় "বাংলাদেশি" পরিচয়ের সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানেই মূল প্রশ্ন। কোনো ভাষা কি নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারে? কোনো পোশাক কি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রমাণ? বিজেপির রাজনীতি এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’বিতর্ক ভারতের রাজনীতিতে "বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী" ইস্যু নতুন নয়। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে এটি বহু দশক ধরে নির্বাচনী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, অবৈধ অভিবাসন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাকরি, সম্পদ এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। দলটির শীর্ষ নেতারা প্রায়ই বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তৃতায় তুলে ধরেন। বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গি হলো ভারতের নাগরিকত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কার করা প্রয়োজন। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, বাস্তবে এই অভিযানের বড় অংশ গিয়ে পড়ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর। তাদের দাবি, অভিবাসন প্রশ্নকে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও ভাষাগত জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করা হচ্ছে।বুলডোজার রাজনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে "বুলডোজার নীতি" শব্দটি বহুল আলোচিত। বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বুলডোজার অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সরকারের দাবি- এগুলো আইনবহির্ভূত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ- আইন প্রয়োগে দ্বৈত মানদণ্ড দেখা যাচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একই মাত্রার অভিযান দেখা যায় না। এই বিতর্ক ভারতের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং গণতন্ত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্রহীনতার ভয় বিশ্বের ইতিহাসে রাষ্ট্রহীনতা একটি ভয়াবহ মানবিক সংকট। যখন একজন মানুষকে কোনো রাষ্ট্র তাকে নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না, তখন সে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার- সবকিছু থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জাতিসংঘ বহুবার সতর্ক করেছে যে, রাষ্ট্রহীনতা মানবাধিকার সংকটকে আরও গভীর করে। ভারতের বহু মুসলিম পরিবার আজ যে ভয় অনুভব করছে, সেটি মূলত এই রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। একদিন ঘুম থেকে উঠে যদি জানতে হয়- আপনি আর কোনো দেশের নাগরিক নন? তাহলে তার চেয়ে বড় নিরাপত্তাহীনতা আর কী হতে পারে? এদিকে সরকার এবং বিজেপি বরাবরই বলে আসছে- তাদের লক্ষ্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়। বরং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকারের যুক্তি, প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের শনাক্ত ও বহিষ্কার করার। দক্ষিণ এশিয়ার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ভারত ও বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই পরিস্থিতি যদি আরও জটিল হয়, তাহলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে পুরো অঞ্চলে পড়তে পারে। কারণ রাষ্ট্রহীনতা কখনো কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে থাকে না। এটি মানবিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সব মাত্রাকে স্পর্শ করে। একজন মানুষের পরিচয় কী? তার ভাষা? তার ধর্ম? তার পোশাক? নাকি তার নাগরিকত্বের কাগজ? এই প্রশ্নগুলো আজ কেবল ভারতের কয়েক কোটি বাংলাভাষী মুসলিমের প্রশ্ন নয়। এটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও এক কঠিন পরীক্ষা। কারণ রাষ্ট্র যখন কাউকে সন্দেহের চোখে দেখে, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে সেই মানুষ, যার হাতে ক্ষমতা নেই। যার কাছে দামি আইনজীবী নেই। যার কাছে পুরোনো দলিল নেই। আছে শুধু নিজের পরিচয়ের দাবি।
Go to News Site