Collector
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত? | Collector
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত?
Jagonews24

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ তবে কার জেতা উচিত?

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই মুহূর্তটি ফুটবলপ্রেমীদের মনে আজীবন দাগ কেটে থাকবে। গোল করার পর দি মারিয়ার চোখের জল কিংবা জয়সূচক পেনাল্টি শুট-আউটের পর বুয়েনস আয়ার্সে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের সেই অবিস্মরণীয় উৎসব—ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে শুধু একটি ট্রফি নয়, এটি একটি আবেগ, একটি ধর্মনিরপেক্ষ আনন্দ উৎসব। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ফুটবলের মহাযজ্ঞ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারই প্রথম ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে। এমন সময় প্রশ্ন উঠতেই পারে- কে জিতবে এবারের বিশ্বকাপ? তবে এর চেয়েও বড় এবং সুন্দর একটি প্রশ্ন হতে পারে- বিশ্বকাপ আসলে কার জেতা উচিত? নিজের দেশ যখন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাবে, তখন আপনি কাকে সমর্থন করবেন? এই উত্তর লুকিয়ে আছে বিশ্বকাপের মূল দর্শনের গভীরে। বিশ্বকাপ: ক্ষমতার রাজনীতি বনাম সাধারণ মানুষের আনন্দ বিশ্বক্যাপ কেবল একটি খেলা নয়, এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি অন্যতম বড় মাধ্যম। আয়োজক দেশগুলোর জন্য এটি যেমন ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা, তেমনি অন্য দেশগুলোর জন্য সফট ডিপ্লোম্যাসি বা নরম কূটনীতির হাতিয়ার। অনেক সময় যুদ্ধের বিকল্প হিসেবে মাঠের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় চিরবৈরী দেশগুলো (যেমন ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র)। আরও পড়ুন>>বারে ৩ বার বল লাগলে গোল, চোটের ভান করলেই শাস্তি?ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এবার এত কম কেন?ফুটবলে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ দেশ: সান ম্যারিনো সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য করপোরেট দুনিয়ার অতিমূল্যবান টিকিট, ফিফার কথিত দুর্নীতি কিংবা স্বৈরশাসকদের ‘স্পোর্টস-ওয়াশিং’—এসব খবরের আড়ালে বিশ্বকাপ আসলে সাধারণ মানুষের এক নীরব বিপ্লব। চার বছর পর পর এক মাসের জন্য পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষ সব নিয়ম ভেঙে টেলিভিশনের পর্দায় বুঁদ হয়ে থাকে। কোনো অফিসের বস বা দেশের একনায়কও সাধারণ মানুষের এই আনন্দ কেড়ে নিতে পারে না। বিশ্বকাপ হলো স্মৃতির এক জাদুকরী মেশিন। ভক্তরা মনে রাখেন প্রিয় দলের ঐতিহাসিক জয় কিংবা বেদনাবিধুর পরাজয়ের মুহূর্তগুলো। এটি এক পরম আশার উৎসব, যেখানে শত বছরের ব্যর্থতার গ্লানি মুছে নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্ন দেখে ফুটবলপ্রেমীরা। সাবেক চ্যাম্পিয়নরা বাদ পড়লে লড়াইয়ে কারা? বাস্তবতার নিরিখে, ৪৮টি দলের মধ্যে অর্ধেকেরই ট্রফি ছোঁয়ার কোনো সুযোগ নেই। আবার টুর্নামেন্টের উত্তেজনা ও নতুনত্বের স্বার্থে যদি আগের আটটি চ্যাম্পিয়ন দেশকে (ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, উরুগুয়ে এবং ইংল্যান্ড) তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে কারা থাকে সমীকরণে? ফুটবলবোদ্ধাদের মতে, বাকিদের মধ্যে দাবিদারদের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। জনসংখ্যার দিক থেকে ছোট কিন্তু প্রতিভাবান দেশ এই তালিকায় সবার আগে আসে নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়ার নাম। ক্রোয়েশিয়া তাদের ৩৫ বছরের স্বাধীন ইতিহাসে তিনবার সেমিফাইনালে উঠেছে। তবে আবেগ ও দীর্ঘ অপেক্ষার দিক থেকে সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার হতে পারে পর্তুগাল। একনায়কতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মন্দা কাটানো পর্তুগাল ফুটবল নিয়ে চরম উন্মাদনায় ভোগে। পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিতলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো হয়তো আরও বেশি অহংকারী হয়ে উঠবেন, কিন্তু দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য তা হবে পরম পাওয়া। ফুটবলপাগল বড় দেশ, যারা কখনো ট্রফি জেতেনি এশিয়ায় জাপান একটি বড় নাম হলেও সেখানে ফুটবলের চেয়ে বেসবল বেশি জনপ্রিয়। অন্যদিকে, আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দেশ বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেনি। এবার সেনেগাল বা মরক্কোর সেই সুযোগ রয়েছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা সেনেগালের মানুষ তাদের সব দুঃখ ভুলে যায় জাতীয় দল মাঠে নামলে। মরক্কো গত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তবে ২০৩০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হওয়ায় মরক্কোর জন্য সেবার জেতাটাই হয়তো বেশি মধুর হবে। লাতিন আমেরিকার দাবি এবং মেক্সিকোর ‘আসল ধর্ম’ ফুটবলীয় আবেগ ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, লাতিন আমেরিকার কোনো নতুন দেশের হাতে ট্রফি উঠলে তা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষকে আনন্দ দেবে। কলম্বিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ফুটবলই একমাত্র ঐক্যের প্রতীক। তবে এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে ১৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দেশ মেক্সিকো। মেক্সিকান কলামিস্ট লিওন ক্রাউজের কথায়, আমরা সবাই ‘আওয়ার লেডি অব গুয়াদালুপে’ (ধর্মীয় বিশ্বাস)-এ বিশ্বাস করি, কিন্তু আমাদের একমাত্র সত্যিকারের ধর্ম হলো ফুটবল।’ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লাখ লাখ মেক্সিকান অভিবাসীর জন্য এই ফুটবল দলটাই তাদের মাতৃভূমির শেষ সংযোগ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হওয়া মেক্সিকোর জন্য বিশ্বকাপ জয় হবে এক যুগান্তকারী চড়। ট্রাম্প যদি মেক্সিকোর অধিনায়কের হাতে ট্রফি তুলে দেন, সেই দৃশ্যটি হবে কবিতার মতো সুন্দর। ফাইনালের সম্ভাব্য সমীকরণ বাস্তবতার মাঠে হয়তো কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্স কিংবা পেদ্রি-গাভিদের স্পেনই ট্রফি জেতার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে। তবে রেফারির একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা পেনাল্টি শুট-আউটের একটি মিস পুরো দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। কিন্তু ফুটবলের কাব্যিক বিচার এবং সর্বোচ্চ নাটকীয়তার স্বার্থে আগামী ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে যদি মেক্সিকো ও পর্তুগাল মুখোমুখি হয় এবং মেক্সিকো চ্যাম্পিয়ন হয়—তবেই হয়তো বিশ্বকাপের আসল সার্থকতা মিলবে। যতক্ষণ না মাঠের শেষ বাঁশি বাজছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এমন স্বপ্ন দেখতেই পারেন ফুটবলপ্রেমীরা! সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/

Go to News Site