Collector
Giriş Yap
সমকালীন সাহিত্য-ডিসকোর্সে ‘নাগরিক চোখ’ | Collector
সমকালীন সাহিত্য-ডিসকোর্সে ‘নাগরিক চোখ’

সমকালীন সাহিত্য-ডিসকোর্সে ‘নাগরিক চোখ’

আবদুল্লাহ মজুমদার ‘নাগরিক চোখ’ সমকালীন বাংলা সাময়িকী-সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে কেবল একটি প্রকাশনা নয়; বরং এটি সময়, সমাজ ও সভ্যতার অন্তঃপ্রবাহকে পাঠের ভিন্নতর পরিসরে পুনর্গঠনের সচেতন সাহিত্য-প্রয়াস। দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালে নিহিত ক্ষমতা-সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক সংকট ও মানবিক অভিঘাতকে এখানে কেবল উপস্থাপন করা হয়নি; বরং বহুস্তরীয় পাঠ-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা ব্যাখ্যা ও পুনর্ব্যাখ্যার জটিল বৌদ্ধিক কাঠামো নির্মাণ করেছে। নবপর্যায়ের তৃতীয় সংখ্যাটি শুরু থেকেই স্মৃতি, মনন ও পাঠ-অন্বেষণের আন্তঃসম্পর্কিত পরিসর নির্মাণ করে। এর কেন্দ্রীয় অনুষঙ্গে সুকুমার বড়ুয়াকে ঘিরে আহমাদ মাযহারের স্মৃতিনির্ভর বিশ্লেষণ, তাঁর ছড়ার স্বভাব ও নান্দনিক সামর্থ্য বিষয়ক পাঠ, অরুণ শীলের বিদায়ী মূল্যায়ন এবং উৎপল কান্তি বড়ুয়ার আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক পাঠ মিলিতভাবে একটি স্তরায়িত সাহিত্যিক প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছে। এই পর্বে সুকুমার বড়ুয়া কেবল ব্যক্তিমানুষ নন; বরং তিনি রূপান্তরিত হয়েছেন একটি সাংস্কৃতিক প্রতিস্বর ও ঐতিহ্য-নির্ভর সাহিত্যিক সত্তায়। এরপর ‘স্মৃতির ফ্রেমে যিনি ছবি হয়ে গেলেন’ পর্বে প্রয়াত শিশুসাহিত্যিক এমরান চৌধুরীর পুনঃপাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি-রাজনৈতিক পাঠ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। রাশেদ রউফের গবেষণামূলক অনুসন্ধান, বাসুদেব খাস্তগীরের মানবিক স্মৃতিচিন্তা এবং সুপ্রতিম বড়ুয়ার মূল্যায়ন মিলিয়ে এখানে এমরান চৌধুরী স্মৃতির সীমা অতিক্রম করে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। সব্যসাচী লেখক মোস্তফা হায়দারকে কেন্দ্র করে গঠিত বিশেষ পর্বটি এ সংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনামূলক কেন্দ্রবিন্দু। আহমাদ জসিম, আরকানুল ইসলাম, শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকী, ফজলুল মল্লিক, ইলিয়াস বাবর, মিজান মনির, নাজমুল ইসলাম সজীব ও খোরশেদ মুকুলের নিবন্ধসমূহ তাঁর সাহিত্যিক নির্মাণ ও সৃজন-পরিসরকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে উন্মোচন করেছে। লক্ষণীয় যে, এই লেখকেরাও সমকালীন সাহিত্যক্ষেত্রে স্বতন্ত্র অবস্থানধারী; ফলে এ পর্বটি কেবল স্মারক নয়, বরং একটি পারস্পরিক পাঠ-সংলাপের জটিল নেটওয়ার্ক। আরও পড়ুন ছোটকাগজ পর্যালোচনা / সারেঙ: অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সংখ্যা সংখ্যাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অন্তর্ভুক্ত বহুস্বরিকতা। দেশবরেণ্য সাহিত্যিক, শিশুসাহিত্যিক এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকদের অংশগ্রহণে ‘নাগরিক চোখ’ এক বিস্তৃত সম্পাদকীয় ও বৌদ্ধিক পরিসরে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিটি লেখাই পৃথক অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করলেও সম্মিলিতভাবে এটি একটি সমকালীন সাহিত্য-ডিসকোর্স নির্মাণ করে। সলিমুল্লাহ খানের ‘বাজে জসীম উদ্‌দীন’ প্রবন্ধে লোকজ ঐতিহ্য ও আধুনিক সমালোচনাতত্ত্বের মধ্যে তীব্র পুনর্বিচারমূলক সংলাপ গড়ে ওঠে। ড. ফোরকান আলীর ‘বর্তমান প্রেক্ষাপট ও নজরুল’ এবং হাফিজ রশিদ খানের ‘লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ ও সম্পাদনা বিষয়ে কথকতা’ সমকালীন সাহিত্যচিন্তা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও বিকল্প প্রকাশনার সংকট-সম্ভাবনার তাত্ত্বিক মানচিত্র নির্মাণ করে। শওকত এয়াকুবের ‘আহসান হাবীব বৈচিত্র্যময় শিশুসাহিত্যিক’ শিশুসাহিত্যের নান্দনিক পরিসরকে পুনর্মূল্যায়নের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করে। কবি ও কবিতা পর্বে নূরুল হক, মির্জা শহীদুল্লাহ বাবুল ও তাওহীদুর রহমানের রচনায় কবিতার ভাষা কখনো স্বচ্ছ, কখনো ইঙ্গিতময় ও ভাঙাচোরা প্রতীকে নির্মিত হয়ে অর্থের বহুবিধ সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। অনুগল্প পর্বে সুমাইয়া খানম ও নাঈমুল মাসুমের ‘বিমূর্ত’ ক্ষুদ্র পরিসরে অস্তিত্বের অন্তর্গত সংকটকে ঘনীভূত আকারে প্রকাশ করে। ছড়া বিভাগে মাহমুদ হাসান, জাহেদুল ইসলাম বাঁধন ও মুনাজউর রহমান আরুফ লোকছন্দ ও সমকালীন ব্যাঙ্গাত্মক সংবেদনার মধ্যে সেতুবন্ধন নির্মাণ করেন। গল্পে মোহাম্মদ হোসেন ও অভিলাষ মাহমুদের রচনায় জীবনের দৈনন্দিন টানাপোড়েন, সম্পর্কের ভাঙন ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিস্তৃত কবিতা পর্বে রুহুল কাদের বাবুল, আনোয়ারুর রহমান, মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, আরিফ মোর্শেদ, নিঃশব্দ আহমাদ, প্রদীপ প্রোজ্জ্বল, এম জসিম উদ্দিন, করিম উল্লাহ ইমন, রিদুয়ান আলী, জহির সিদ্দিকী, নাসের ভুট্টো, জিএম সামদানী, জসিম উদ্দিন মনছুরি, আকলিমা আঁখি, ইকবাল আলম ও আবদুল্লাহ মজুমদারের কাব্যভাষা সমকালীন কবিতার বহুকণ্ঠিক ও বহুকেন্দ্রিক প্রবণতাকে নির্দেশ করে। আরও পড়ুন সেবুলের ছোটকাগজ / লিটল ম্যাগাজিনের বৈপ্লবিক জাগরণ শিল্প-অর্থনীতি পর্বে সাইয়্যিদ মঞ্জুর ‘পোয়া মাছ শিল্পের বিবর্তন: অতীত, বর্তমান ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ’ স্থানীয় উৎপাদন-সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। প্রকাশক-সম্পাদক কবি মিজান মনিরের নিরলস পরিশ্রমে প্রকাশিত ‘নাগরিক চোখ’র তৃতীয় সংখ্যাটি তাই একটি সুসংগঠিত সাহিত্য-নথি; যেখানে সম্পাদনার শ্রম, চিন্তার গভীরতা এবং নান্দনিক বিন্যাস একত্রে একটি সময়-সচেতন বৌদ্ধিক দলিল নির্মাণ করেছে। এর প্রচ্ছদ ও নামলিপি করেছেন আজিজুল কদির, যার দৃশ্যভাষিক নির্মাণ সমগ্র সংখ্যাটিকে একটি স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল পরিচয় প্রদান করেছে। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা সমকালীন সাহিত্য-চিন্তা, ইতিহাসবোধ ও নান্দনিক অভিজ্ঞতার এক ঘনীভূত, বহুস্বরিক ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিচ্ছবি। লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম। এসইউ

Go to News Site