Collector
নীরব ঘাতক বায়ুদূষণ, বেশি ঝুঁকিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ | Collector
নীরব ঘাতক বায়ুদূষণ, বেশি ঝুঁকিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ
Jagonews24

নীরব ঘাতক বায়ুদূষণ, বেশি ঝুঁকিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ

বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় ঘুরেফিরে যে দুইটি দেশের নাম সবার আগে আসে তা হলো বাংলাদেশ আর পাকিস্তান। বায়ুদূষণ যেনো দেশ দুইটির নিত্যসঙ্গী। অনেক দেশ এক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিকার পেলেও স্বস্তি নেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষের। দূষণের কারণে প্রতিবছর দেশ দুইটির হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত দেশের তালিকায় পাকিস্তান প্রথমে রয়েছে। দেশটি স্কোর ১৫৯। একই বছরে বাংলাদেশ ১৫৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আসে। ২০২৪ সালেও বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বায়ুদূষণের দেশ ছিল বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের গড় মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে ১৫ গুণেরও বেশি ছিল। ২০২৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত তিন দেশের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত। এ তালিকায় বাংলাদেশ ও ভারত আগের বছরের চাদ ও ইরানের স্থান দখল করে। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ক্ষতিকর বায়ুকণা পিএম ২.৫-এর গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭৯ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম। পাকিস্তানে এ হার ছিল ৭৩ দশমিক ৭ মাইক্রোগ্রাম। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী এই মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের বায়ুদূষণের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, ইটভাটার দূষণ এবং ধুলাবালি দেশের বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় উৎস। দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক গাড়ি, বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেল থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত হচ্ছে ক্ষতিকর ধোঁয়া। পরিবহন খাতে পুরোনো ও নিম্নমানের যানবাহনের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত পুরোনো যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া, সালফার ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে বায়ুর মানের অবনতি ঘটাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শিল্পকারখানা ও ইটভাটাও দূষণের অন্যতম বড় উৎস। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইট উৎপাদনের জন্য ইটভাটাগুলোতে কয়লা, কাঠ, পুরোনো টায়ার, এমনকি প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ পোড়ানো হয়। এর ফলে বাতাসে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া নির্মাণকাজ, ভাঙাচোরা সড়ক এবং অন্যান্য উৎস থেকে সৃষ্ট ধুলাবালিও বায়ুদূষণে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে পিএম ২.৫ ও পিএম ১০ নামে পরিচিত সূক্ষ্ম ধূলিকণা বায়ুর মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের বাতাসে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও ওজোনের মতো দূষক। আরও পড়ুন>বিশ্বের ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ’ থেকে কী শিখতে পারে বাংলাদেশ?দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ ডিজেলচালিত যানবাহন থেকে এসব গ্যাসের পাশাপাশি ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বনও নির্গত হয়, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এছাড়া বেনজিন, ফরমালডিহাইড ও অন্যান্য উদ্বায়ী জৈব যৌগ বাতাসে মিশে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ইটভাটা ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত ডাইঅক্সিন, ফিউরান, সিসা, পারদ এবং বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসে জমে গিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পিএম ২.৫ কণা এতটাই ছোট যে তা ফুসফুস থেকে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, বিশেষ করে হৃদপিণ্ড, যকৃত ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিশুরা বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও বায়ুদূষণ গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণের কারণে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, অপরিণত শিশুর জন্ম এবং কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বায়ুদূষণজনিত কারণে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উঠে আসে। এসব মৃত্যুর ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, ডায়াবেটিস এবং ডিমেনশিয়ার মতো রোগ উল্লেখযোগ্য। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণের কারণে মোট ৭৯ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা ওই বছরের প্রতি আটটি মৃত্যুর মধ্যে প্রায় একটি। এর মধ্যে ৪৯ লাখ মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ছিল বাতাসে থাকা ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণা পিএম ২.৫–এর দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ। আরও পড়ুন>বিশ্বের ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ’ থেকে কী শিখতে পারে বাংলাদেশ?দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। এসব মৃত্যুর প্রায় ৮৯ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই অঞ্চলের দূষণপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম। ২০২০ সালে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকের জন্য দায়ী ছিল গৃহস্থালি দূষণ। বিশেষ করে কয়লা, কাঠ বা বায়োমাসচালিত চুলায় রান্নার ফলে ঘরের ভেতরে তৈরি হওয়া দূষিত বাতাস এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। এমএসএম

Go to News Site