Jagonews24
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে এমন এক নতুন ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা বিস্তৃত পরিসরের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে এবং ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, এটিই বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন যার মূল উপাদান সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নকশা করা হয়েছে এবং পরে মানুষের ওপর পরীক্ষাও চালানো হয়েছে। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি ভ্যাকসিন তৈরি করা, যা করোনাভাইরাস পরিবারের সব ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর হবে। এর মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯-এর বিভিন্ন ধরন, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম ভাইরাস এবং ভবিষ্যৎ মহামারির সম্ভাব্য উৎসগুলো। যদিও গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) ও ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে একই ধরনের ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছেন। কীভাবে কাজ করে এই ভ্যাকসিন? সাধারণত ভ্যাকসিন তৈরি করা হয় কোনো ভাইরাসের বিদ্যমান ধরন বা স্ট্রেইনকে ভিত্তি করে। কিন্তু ক্যামব্রিজের গবেষকরা ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তারা বিভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাসের জেনেটিক তথ্য সংগ্রহ করেন, যেগুলো সম্ভাব্য ভাইরাসজনিত হুমকি শনাক্ত করার নজরদারি কর্মসূচিতে পাওয়া গিয়েছিল। এই জেনেটিক তথ্যগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর এআই এমন একটি ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ তৈরি করে, যা মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারে যাতে পুরো করোনাভাইরাস পরিবারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা গড়ে ওঠে—এমনকি ভাইরাসের নতুন ধরন সৃষ্টি হলেও বা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটলেও। অ্যান্টিজেন হলো ভ্যাকসিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কারণ এটিকেই লক্ষ্য করে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী জোনাথন হেনি বলেন, মানুষের ওপর পরীক্ষিত কোনো এআই-নকশাকৃত অ্যান্টিজেনের এটি প্রথম উদাহরণ। তিনি বলেন, আমরা সবসময় ভাইরাসের পেছনে ছুটি। এবার আমরা পরিস্থিতির আগেই প্রস্তুত থাকতে চাই। এমনকি নতুন মহামারি শুরু হওয়ার আগেই সুরক্ষা গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। তার ভাষায়, এটি শুধু আজকের ভাইরাস থেকে সুরক্ষার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মহামারি ঠেকানোর প্রস্তুতি। মহামারি মোকাবিলার পদ্ধতিতে এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন। মানুষের ওপর পরীক্ষা ভ্যাকসিনটির প্রথম ধাপের পরীক্ষায় ৩৯ জন স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেন। এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভ্যাকসিনটি নিরাপদ কি না তা যাচাই করা। বর্তমানে প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের গবেষণা চলছে, যার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হবে ভ্যাকসিনটি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কতটা কার্যকরভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ইনফেকশনে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত বা ‘মডেস্ট’। তবে বিজ্ঞানীরা এটিকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। গবেষণার কিছু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা পরিচালনা করা সল ফৌসট বলেন, এআই-ভিত্তিক এই পদ্ধতির নিশ্চিতভাবেই সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। তার মতে, ভাইরাস যখন দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তখন সম্ভাব্য মহামারির জন্য ভ্যাকসিন নকশা করতে এই প্রযুক্তি অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। গবেষক দল এরই মধ্যে এমন একটি সার্বজনীন মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করছে, যা প্রতিবছর নতুন করে হালনাগাদ করার প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে তারা এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু এবং ইবোলা-সদৃশ ভাইরাসজনিত হেমোরেজিক জ্বরের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন নিয়েও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের ‘গেম চেঞ্জার’? গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা অ্যানডি পোলার্ড বলেন, প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণাগুলো এরই মধ্যে এই পদ্ধতির পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ দিচ্ছে। তার মতে, এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় তথ্য। আগে কেউ ভাবেনি যে এ ধরনের রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন গবেষণার ক্ষেত্রে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এআই আগেভাগেই অনুমান করতে পারবে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কোনো ভ্যাকসিনে কীভাবে সাড়া দেবে। এতে ভ্যাকসিন তৈরির সময় কমবে এবং আরও বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। সূত্র: বিবিসি এমএসএম
Go to News Site