Collector
শেকড়ের টানে ‘রইদ’ | Collector
শেকড়ের টানে ‘রইদ’
Jagonews24

শেকড়ের টানে ‘রইদ’

মেজবাউর রহমান সুমন ‌‘হাওয়া’ জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি ছবি বানাতে এসেছেন তবে সেটা অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাস এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের ছবি হবে। ছবির গল্প হবে আমাদের গল্প, ছবির ভাষা হবে আমাদের ভাষা, ছবির জীবনযাত্রা হবে আমাদের জীবনযাপন, ছবির দৃশ্যায়নে থাকবে আমাদের দেশের পরিবেশ। হাওয়ার গল্প ছিল আমাদের প্রচলিত চাঁদ সওদাগরের গল্প। আর রইদ এর গল্প আমাদের প্রচলিত আদম হাওয়ার গল্প? আমি যেহেতু সিনেমা বুদ্ধিজীবী না তাই আমার কাছে মনে হয়েছে এটা আমাদের দেশের চিরায়ত প্রেমেরই গল্প। যে প্রেম কখনও মসৃণ নয়। নেই সেইভাবে তার কোন প্রকাশ। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা সেটা অন্যপক্ষকে বুঝিয়ে থাকি। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রকাশ না থাকলেও দু’পক্ষই এটা টের পায়। রইদ’র সাধু আর তার বউয়ের রসায়ন মনে করিয়ে দেয় আমাদের আটপৌরে প্রেমকে। আমাদের গ্রামীণ বাবা-মা’কে কখনও দেখিনি একজন অন্যজনকে ভালোবাসার কথা বলছেন। বরং যতটা পারা যায় রাখঢাক করে রাখছেন বিষয়টা যাতে করে কেউ টের না পেয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ যেমন বহুব্রীহিতে কাদেরের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন - ভালোবাসা একটা শরমের ব্যাপার তয় দরকার আছে। হুবহু একই কথা খাটে আমাদের প্রেমের ক্ষেত্রে। অবশ্য একবিংশ শতাব্দীতে এসে এখন সবকিছুই প্রচার সর্বস্ব হয়ে গেছে। কে কতটা প্রলেপ মাখিয়ে সেটাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে সবাই সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আমি বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি আগেরদিন স্বামী স্ত্রী গদগদ ভালোবাসার পোস্ট দিয়েছেন। পরেরদিনই একে অপরের বিষোদগার করছেন। তৃতীয় দিনের দিন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। সুমন মনে হয় একেবারে সজ্ঞানে এইসবের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করেছেন। এরপর আসি রইদ’র চিত্রকল্পের কথায়। সুমন যেন বারবার আমাদের আমাদের শেকড়ের কথা মনেকরিয়ে দিতে চাইছেন। আসলে যার শেকড় যত মজবুত তার বাড় ততই দৃঢ়, শক্তিশালী এবং স্থায়ী। রইদ\'র চিত্রকল্পের কোন বিষয়টা নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলবো। মেঠোপথ, ছনের ঘর, মাটির মেঝে এবং দেয়াল, গাছের ডালের জানালা, চৌকি, কাঁসার আসবাব না কি একই ঘরের মধ্য মানুষ এবং গবাদিপশুর সহাবস্থান। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের চৌকির নিচে থাকতো নতুন ছানা ফোটানো মুরগীটা। আর মায়ের সাথে একই বিছানায় ঘুমাতো ছাগলের বাচ্চাগুলো। আবার দিনের বেলার গরমের সময় চৌকির ওপরে আব্বার পিঠের সাথে পিঠ লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকতো ছাগলটা। সাধুর বউয়ের ছাগলের যে একটা নাম আছে সেটা তাই আমাকে মোটেই অবাক করেনি। কুলসুম যেন সাধুর বউয়ের আত্মা। ঠিক যে-মন আমরা আমাদের রূপকথায় পড়তাম। দত্যের আত্মা লুকানো আছে টিয়াপাখির মধ্যে। বাড়ির পাশের কাশের বন বা তালের জংগল এত আবহমান গ্রাম বাংলার প্রতিচ্ছবি। বাড়ি থেকে একটু দুরের কলাপাতায় ঘেরা টয়লেট। বদনা হাতে নিয়ে সেখানে যেতে হয়। গবাদিপশুর গা গরম হলে আমাদের এলাকায় বলা হতো ডাক এসেছে। ছাগলের ডাক আসলে পাড়ায় যার বাড়িতে ভোগড়া (পাঁঠা) আছে তার বাড়ি থেকে পাল খাইয়ে নিয়ে আসা হতো। আর গরুর ডাক আসলে সেটাকে নিয়ে যাওয়া হতো যার বাড়িতে আঁড়ি (এঁড়ে) গরু আছে তার বাড়িতে। সাঁতার না জানা আমাদের জন্য গরুর লেজ ধরে নদী পাড়ি দেওয়া ছিল এক বিশাল অ্যাডভেঞ্চার। গবাদিপশুকে নিয়মিত গোসল দেওয়া, শীতের সময় বাড়তি কাপড় পরানো এগুলো এখনো আছে গ্রাম বাংলায়। গ্রামের হাঁটের মেলায় এখনো সার্কাস আসে। সেখানে বসে পালা গানের আসর। বৃষ্টি হলে এখনো ঘরে ভিড় করে কুনোব্যাঙের দল। টিনের প্লেটে এখনো খাওয়া দাওয়া করা হয়। খাবারে একটু লবণ বেশি হয়ে গেলে তার মধ্যে একটু পানি ঢেলে নিলেই হয়। ঝড়ের রাতের পরের সকালে এখনো শিশুরা তাল গাছের তলায় পাকা তাল খুঁজতে যায় কি না জানি না। আমাদের পাড়ায় অনেকগুলো তাল গাছ ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে মিষ্টি তাল ছিল মুনা পালের গাছের। আর সালামদের পুকুরের পাড়ের বাঁশঝাড়ের ভিতরের তাল গাছ থেকে কতজনকে যে ভুতে ধরতো। এর কোন তাল গাছই আজ আর নেই। সুমনকে ধন্যবাদ আমাদের অকৃত্রিম শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি জানি না যারা এই সিনেমার যারা চিত্রনাট্য লিখেছেন তাদের কারো বাড়ি কুষ্টিয়ার গ্রামাঞ্চলে কি না? বহুদিন বাদে একেবারে আমার শৈশবের ভাষার এমন আন্তর্জাতিক প্রয়োগ দেখলাম। গ্রামের দাদারা নাতিদের কান ধরে বলতেন, এই শালা দুলাভাই বল নাহলে কান ছাড়বো না। কি মিষ্টি একটা সম্বোধন। শহরে এসে জানলাম, শালা একটা গালি। গ্রামের একটা চরম গালি অনেকদিন পর রইদ এ শুনলাম। শালা আঁড়িচুদা তুমি এটাই বুঝতি পারছো না। ভোদাই\'ও শুনলাম বহুদিন পর। আমাদের এলাকায় কথা কে বলা হয় কতা। কোথায় যাবা কে বলা কঅনে যাবা। ঔষধের বোতলের ছিপি কে বলা হয় কাগ। কতদিন পর শুনলাম মিঞেভাই ডাক। আমাকে আমার মেজো এবং ছোটভাইদের বন্ধুরা এখনো এই নামেই ডাকে। কুকুরকে আমাদের এলাকায় বলে কুত্তো। এবার আসি অভিনয়ের কথায়। ছবির চরিত্রগুলোকে আমার মনে হয়েছে একেবারে বাস্তবের চরিত্র। মনে হয়নি আমি অভিনয় দেখছি। আমার মনে হয়েছে আমি একটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আর ঘটনাগুলো সত্যিকার অর্থেই আমার সামনে ঘটে যাচ্ছে। তুষি নিজেকে দিনে দিনে নিজেই ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। হাওয়া, প্রেসার কুকার, রইদ দিয়ে জানিয়ে দিলেন তিন সব চরিত্রেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। আমি সবচেয়ে অবাক হয়ে তুষির পোশাক পরিচ্ছদ এবং সাজগোছ এবং চলাফেরা দেখে। এতটা নিখুঁত এর আগে কোন ছবিতে দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। হুমায়ূন আহমেদ এর একটা লেখায় পড়েছিলাম। সুন্দরী প্রতিযোগিতা জিতে আসা এক মেয়েকে পুরস্কার স্বরূপ তার চলচ্চিত্রের নায়িকা বানাতে হয়েছিল। তিনি সেই নায়িকাকে দৃশ্য বুঝিয়ে দিয়ে সেই মোতাবেক মেক আপ করিয়ে তৈরি করতেন। তারপর দৃশ্যের সময় দেখা যেত সেই নায়িকা আবারও বাড়তি মেক আপ নিয়ে তিনি যে সবচেয়ে সুন্দর সেটা প্রমাণের তালে আছেন। সেই ছবি আমরা যখন টিভির পর্দায় দেখেছিলাম তখন টের পেয়েছিলাম, পানিতে ডুবে মরার পরও নায়িকার মুখের কয়েক পরত মেক তখনও জ্বলজ্বল করছে। তুষির পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পুরোটাই ছিল চরিত্রের সাথে একেবারে মানানসই। কথা বলা, চলাফেরা, ওঠাবসা সবই নিখুঁতভাবে করেছেন তিনি। আর সাধুকে দেখে অনেকদিন পর নিজের ছোটবেলার খেলার সাথীর কথা মনেপড়ে গেলো। আমাদের বাড়িতে বছর ঠিকা হিসাবে একজন আমারই বয়সী রাখাল ছিল। এছাড়াও হুবহু সাধুর বয়সী আরও একজন রাখাল ছিল। যার আসল নাম আমরা জানতাম না। আমরা সবাই ডাকতাম বৃটিশ বলে কারণ উনার জন্ম হয়েছিল বৃটিশ আমলে। তার শারিরীক গঠন, লুঙ্গি উঁচু করে বাঁধা, একটু কুঁজো হয়ে হাঁটা। সবই কি সুন্দরভাবেই সাধু করলেন। বাকিদের মধ্যে সাধুর সহকর্মীও দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। তার মুখের ভাষাও আমার খুবই পরিচিত। সুমনের কথার প্রতিধ্বনি করেই লেখাটা শেষ করি। আমাদের ছবি হবে আমাদের মতো। সেটা হলিউড, বলিউড, টালিউড, মলিউড কারো মতো হবে না। আমরা তাদের কাছে থেকে অভিজ্ঞতা নিতে পারি কিন্তু আমাদের ছবির গল্প থেকে শুরু করে চিত্রকল্প, চরিত্র নির্মাণ পুরোটাই হবে আমাদের মতো করে। তাহলেই না আমাদের ছবি বিশ্ব দরবারে আলাদা আসন করে নিবে। সবাই বুঝতে পারবে এটা বাংলাদেশের ছবি। রইদ\'র সবকিছু নিয়েই কথা হোক, হোক সেটা ভালো কিংবা মন্দ। আমি বিশ্বাস করি আমাদের ছবি নিয়ে যত আলোচনা হবে ততই সেটা চলচ্চিত্র শিল্পকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এগিয়ে দেবে। রইদ দেখে আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই ছবি একদিন ইতিহাস হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ছবির রেফারেন্স দিয়ে ভবিষ্যতে কথা বলবে। প্রত্যেকটা দৃশ্য নিয়ে তারা আলাপ আলোচনা করবে। জীবনানন্দ দাশের কবিতা যেমন সমসাময়িকদের মাথার উপর দিয়ে গেলেও সময়ের সাথে সেটা বোধগম্য হয়েছে এবং জনপ্রিয়ও হচ্ছে। রইদ নিয়েও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক গবেষণা করবে বলেই আমার বিশ্বাস। পরিশেষে এমন ছবি আরও তৈরি হোক। বাংলাদেশের শহুরে এবং গ্রামীণ জনপদের অলীক কিন্তু দুর্ভেদ্য পর্দা উঠে যাক। বাংলাদেশটা সত্যিকার অর্থেই সকলের বাংলাদেশ হয়ে উঠুক। পরিশেষে স্ক্রিনস্কোপ এবং দেশি ইভেন্টস\'কে ধন্যবাদ ছবিটা অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। তবে ঠিক সময় ছবি শুরু করা এবং বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যাপারে আরও একটু সংযমিতা অবলম্বন মনেহয় করা যেতেই পারে। এমআরএম

Go to News Site