Jagonews24
দেশে বায়ুদূষণ, নদীদূষণ, অবৈধ ইটভাটা, জলাশয় ভরাট ও পাহাড় কাটার মতো পরিবেশগত অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। তবে এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে গঠিত বিশেষায়িত পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা সেই তুলনায় অত্যন্ত কম। আইনজীবী ও পরিবেশবিদদের মতে, এর অন্যতম কারণ পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০-এর বিভিন্ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। ফলে আইনটি সংস্কার করে নাগরিকদের জন্য বিচারপ্রাপ্তির পথ সহজ করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বর্তমান আইনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবেশবাদী সংগঠন সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারে না। অভিযোগ জানাতে হয় পরিবেশ অধিদপ্তরে, আর তাদের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আদালত মামলা গ্রহণ করতে পারে। বিচারপ্রাপ্তির এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকার চাওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত ক্ষতি শুধু কোনো ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রভাবিত করে। তাই পরিবেশ আদালতে প্রবেশাধিকার সহজ করা, জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ বাড়ানো এবং আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল আর্থিক লাভের তুলনায় বিদ্যমান শাস্তির বিধানও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। আরও পড়ুনদূষণে জর্জরিত দেশ, পরিবেশ আদালতে মামলার খরাসব জেলায় হবে পরিবেশ আদালত, বিভাগে আপিল‘মামলায় আগ্রহ নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের’বছরজুড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান, তবু কমে না দূষণ পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ আইন, কিন্তু কতটা কার্যকর? বাংলাদেশে পরিবেশগত অপরাধের দ্রুত বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার নিশ্চিত করতে ২০১০ সালে পরিবেশ আদালত আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী পরিবেশ আদালত আইন, ২০০০ বাতিল করে নতুন বিচারিক কাঠামো চালু করা হয়। আইন অনুযায়ী পরিবেশ আদালত, স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং পরিবেশ আপিল আদালত গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। পরিবেশ আদালত পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করতে পারে, দোষী ব্যক্তিকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিতে পারে, অপরাধে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা যানবাহন বাজেয়াপ্ত করতে পারে এবং পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধ বা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিতে পারে। আইনে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। পরিবেশগত ক্ষতির কারণে কেউ আর্থিক বা অন্য কোনো ক্ষতির শিকার হলে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে অভিযোগ গঠনের পর ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে আরও ৯০ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পরিবেশ আপিল আদালতে আপিল করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে আইনটির উদ্দেশ্য ও কাঠামো শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে পরিবেশ আদালতের ব্যবহার এবং কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। দূষণের মাত্রা বাড়ছে, কিন্তু আদালতে মামলা কমছে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীদূষণ, শিল্পবর্জ্য, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট এবং অবৈধ ইটভাটার মতো অপরাধ দেশের প্রায় সর্বত্র ঘটছে। কিন্তু পরিবেশ আদালতের পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঢাকার মূল পরিবেশ আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ২৩১টি। এর মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা মাত্র ১৩২টি। অর্থাৎ আদালতের মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৯৮ শতাংশই অন্য ধরনের মামলা। ২০২৪ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে করা মাত্র দুটি মামলা ঢাকার পরিবেশ আদালতে পাঠানো হয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনটিতে। পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় ২৩ বছরে মোট মামলা হয়েছে ৫৯২টি, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৭৬টি। পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার দুই দশকেরও বেশি সময় পরেও মোট মামলার সংখ্যা দেশের পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দূষণের ঘটনা বাড়লেও আদালতে মামলা বাড়ছে না। অর্থাৎ পরিবেশগত অপরাধের বড় একটি অংশ বিচারিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারেন না। বর্তমান আইনে কোনো ব্যক্তি যদি শিল্পকারখানার বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হন, কোনো নদী বা জলাশয় দখল কিংবা দূষণের শিকার হতে দেখেন অথবা বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন, তাহলেও তিনি সরাসরি আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ পান না। প্রথমে তাকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ করতে হয়। এরপর তদন্ত শেষে অধিদপ্তরের পরিদর্শক একটি প্রতিবেদন দাখিল করবেন। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আদালত মামলা গ্রহণ করতে পারে। বাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাভেদ জাহান, ছবি: এআই দিয়ে তৈরি এটিকে আইনটির অন্যতম বড় সমস্যা বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাভেদ জাহান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আদালতে যেতে চাইলে তাকে আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমতি বা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। এটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একজন নাগরিক যদি পরিবেশ ধ্বংস, দূষণ বা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতির বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাইতে চান, তাহলে তাকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক বাধার মুখোমুখি হতে হবে কেন? এই প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর নেই। জাভেদ জাহান বলেন, দেশের প্রায় সব ধরনের আদালতে নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একজন নাগরিক সরাসরি মামলা করতে পারেন। কিন্তু পরিবেশ আদালতের ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রম থাকবে, সেটি বোধগম্য নয়। পরিবেশের ক্ষতি তো শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থ ও মানুষের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। সেখানে সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ সীমিত রাখা একটি স্পষ্ট অসঙ্গতি। অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব, ছবি: সংগৃহীত ঢাকা মহানগর আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব জাগো নিউজকে বলেন, পরিবেশ দূষণ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। কিন্তু যে বিচারিক কাঠামো পরিবেশ রক্ষার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে, তা এখনও জনগণের জন্য পুরোপুরি সহজলভ্য নয়। তার মতে, একজন ব্যক্তি যদি কোনো শিল্পকারখানার বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হন কিংবা কোনো নদী, খাল বা জলাশয় দূষণের শিকার হতে দেখেন, তাহলেও তিনি সরাসরি আদালতে প্রতিকার চাইতে পারেন না। তাকে প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বিচারপ্রাপ্তির পথ দীর্ঘ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা হতাশ হয়ে আইনি প্রক্রিয়া থেকে সরে যান। পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর অতিনির্ভরশীল ব্যবস্থা বর্তমান আইনি কাঠামোয় পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যত মামলার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং আদালতে উপস্থাপনের ভিত্তি তৈরির প্রায় পুরো প্রক্রিয়াই অধিদপ্তরনির্ভর। অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, ছবি: সংগৃহীত বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান এবং স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, পরিবেশ আদালতের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো মামলা করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তার মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে যেতে হয়। এতে বিচারপ্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত একটি প্রশাসনিক ধাপ তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ আদালতকে কার্যকর করতে হলে নাগরিকদের আদালতে প্রবেশাধিকার আরও সহজ করতে হবে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে পরিবেশ ধ্বংস করে অনেক প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা অর্জন করছে। সেই তুলনায় শাস্তি খুবই কম দেওয়া হয়। পরিবেশগত অপরাধের ফলে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়, তার তুলনায় বিদ্যমান শাস্তির বিধান পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। আরও পড়ুনঢাকায় বায়ুদূষণ কমছে না, দায়ী নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতানাকের ডগায় ৩০০ অবৈধ ইটভাটা, জরিমানায় দায় সারছে প্রশাসন১৩ বছরের জানুয়ারিতে একদিনও নির্মল বাতাস পায়নি রাজধানীবাসীঅতিমাত্রায় শব্দ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে পরিবেশ অধিদপ্তর বর্তমানে পরিবেশ আইন প্রয়োগে মূলত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর নির্ভরশীল। অবৈধ ইটভাটা, কালো ধোঁয়া, পলিথিন ব্যবহার, শব্দদূষণ কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের ঘটনায় নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তি সীমাবদ্ধ থাকে জরিমানার মধ্যে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক জরিমানা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। কারণ আদালতের রায় ভবিষ্যতের জন্য নজির তৈরি করে এবং অপরাধীদের মধ্যে স্থায়ী ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। ঢাকার পরিবেশ আদালত, ছবি: জাগো নিউজ আদালতের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বর্তমানে কার্যকর পরিবেশ আদালত রয়েছে মাত্র তিনটি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে। এছাড়া ঢাকায় একটি পরিবেশ আপিল আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে কার্যকর পরিবেশ আদালতের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, ঢাকার বাইরে অধিকাংশ মানুষকে পরিবেশ সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য দূরবর্তী আদালতের ওপর নির্ভর করতে হয়। সময়, অর্থ ও যাতায়াত ব্যয়ের কারণে অনেক ভুক্তভোগী আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তিনি মনে করেন, ধাপে ধাপে প্রতিটি জেলা পর্যায়ে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পরিবেশবিদরাও একই মত পোষণ করে বলছেন, পরিবেশগত অপরাধ এখন শুধু বড় শহরের সমস্যা নয়; জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও দূষণের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ঢাকার রাস্তায় উড়ছে ধুলোবালি। নাক-মুখ চেপে চলতে হয় পথচারীদের, ফাইল ছবি প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতাও বড় বাধা পরিবেশ অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রমাণ সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ কিংবা বর্জ্য পোড়ানোর মতো অপরাধগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষণস্থায়ী। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় দূষণের আলামত হারিয়ে যায়। ফলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, প্রতিটি উপজেলায় পরিবেশ কর্মকর্তা নিয়োগ, আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। সচেতনতার অভাবও দায়ী বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ আদালত সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই। অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠিত হলেও অধিকাংশ মানুষ জানেন না কীভাবে এই আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া যায়। ফলে পরিবেশগত ক্ষতির শিকার হলেও অনেকেই আইনি পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হন না। তিনি বলেন, গণসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব নয়। আরও পড়ুনধুলিকণায় বিষাক্ত খুলনার বাতাসশীতে খুসখুসে কাশি, ঠান্ডা লাগার সমস্যা নাকি দূষণের প্রভাবদূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ায় বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন ১০ লাখ মানুষতামাকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি টাকা জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ বাড়ানোর দাবি আইনজীবী ও পরিবেশবাদীরা মনে করেন, পরিবেশগত ক্ষতি প্রায়ই ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে। তাই জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে সরাসরি মামলা করার সুযোগ দিলে পরিবেশ আদালত আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবিষয়ক মামলার জন্য বিশেষায়িত বিচারক এবং দ্রুত নিষ্পত্তির পৃথক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ঢাকার রাস্তায় উড়ছে ধুলোবালি। নাক-মুখ চেপে চলতে হয় পথচারীদের, ফাইল ছবি আইনের সংস্কার ও সংশোধন জরুরি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাভেদ জাহান বলেন, বর্তমান পরিবেশ আদালত আইনের মধ্যে অনেকগুলো বৈষম্যমূলক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান রয়েছে। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এই আইন সংস্কার করা জরুরি। এ নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আওয়াজ তোলা দরকার, যাতে সরকার বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। দীর্ঘদিনের পরিবেশ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ আদালত আইনকে যুগোপযোগী ও জনবান্ধব করতে হলে পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন এমন ব্যক্তি, পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আইনের কোথায় কোথায় অসঙ্গতি রয়েছে, কোন বিধানগুলো নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বাধা সৃষ্টি করছে এবং কীভাবে সেগুলো সংশোধন করা যায়। এসব বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে দ্রুত সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। পরিবেশগত সংকট দিন দিন বাড়ছে, তাই কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।’ আইন সংস্কারে সরকারের উদ্যোগের অপেক্ষা যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (আইন) খন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরিবেশ আদালত আইন সংস্কারের জন্য ২০২৪ সালে আমরা একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তবে সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। আশা করছি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হবে।’ তিনি জানান, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যাতে মহাপরিচালকের পূর্বানুমতি ছাড়াই সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধের দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা, মামলা পরিচালনায় সরকারি কৌঁসুলির পাশাপাশি প্রয়োজনে পৃথক আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং মিথ্যা মামলা বা অভিযোগের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাবও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। খন্দকার তাহাজ্জুত আলী আরও জানান, প্রস্তাবিত খসড়া বিলটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আইন অনুবিভাগ থেকে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বিলটি প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, যাতে তা মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিষয়টি সরকারের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপন ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা সময়ের দাবি। আইনটি সংশোধিত হলে পরিবেশগত ক্ষতির শিকার ব্যক্তি ও জনগণের জন্য বিচারপ্রাপ্তির পথ আরও সহজ এবং কার্যকর হবে।’ এমডিএএ/এমএমএআর
Go to News Site