Jagonews24
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। রোববার (৭ জুন) ঘোষিত এ রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়েছে। তবে এখনই সম্পন্ন হচ্ছে না আইনি লড়াই। এমন রায়ের ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের দেওয়া দণ্ড কার্যকর করতে সামনে একাধিক বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শেষে মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার পর্যায়ে প্রবেশ করবে। সেখানে হবে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও রিভিউ শুনানি এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে তা কার্যকর করা সম্ভব হবে। এ নিয়ে কথা হয় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাস্তবায়িত নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট ফাহমিদা আক্তার রিংকির সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও এটি চূড়ান্ত রায় নয়। আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের অনুমোদন ছাড়া এ রায় কার্যকর করা যায় না।’ রায় ঘোষণার জন্য পুলিশের কড়া নিরাপত্তায় সোহেল রানাকে আদালতে আনা হয়/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ দ্রুত বিচার শেষে ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায় ঘোষণা করেন। এতে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। একই সঙ্গে সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গত ১৯ মে নিজ বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী। ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০ মে শিশুটির বাবার করা মামলা পুলিশ তদন্ত করে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি এবং ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত। অর্থাৎ মাত্র ১৭ দিনের বিচারিক কার্যক্রম শেষে বহুল আলোচিত এ মামলার রায় দেওয়া হয়। আরও পড়ুন পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুহত্যা: সোহেল-স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, মামলাটি শুধু একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি একটি গভীর পরীক্ষা। তিনি উল্লেখ করেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যখন যৌন নির্যাতন বা হত্যার মতো অপরাধের শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিচারক জানান, ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মামলা বিচারাধীন। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর যন্ত্রণা এবং একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের অপেক্ষা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ মামলার দ্রুত তদন্ত ও বিচার ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতনের অন্যান্য মামলার জন্যও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হবে। রায় ঘোষণার জন্য আদালতে পুলিশের ভ্যান থেকে নামানো হচ্ছে স্বপ্না আক্তারকে/ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ ৭ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ অ্যাডভোকেট ফাহমিদা বলেন, ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার পর আসামিপক্ষকে উচ্চ আদালতে যাওয়ার জন্য সাতদিনের সময় দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে আসামিরা চাইলে জেল আপিল অথবা নিয়মিত আপিল করতে পারবেন। এটি তাদের আইনগত অধিকার। তিনি জানান, মৃত্যুদণ্ডের মামলার ক্ষেত্রে আসামির আপিলের পাশাপাশি বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার রায়ও উচ্চ আদালতের পর্যালোচনার জন্য যাবে। আরও পড়ুন রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত / এটি শুধু একটি বিচার নয়, সমাজের বিবেকেরও পরীক্ষা কী এই ডেথ রেফারেন্স বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইকোর্ট বিভাগে পাঠাতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে ডেথ রেফারেন্স বলা হয় বলে জানান অ্যাডভোকেট ফাহমিদা। তিনি উল্লেখ করেন, ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে হাইকোর্ট শুধু রায় দেখেন না। মামলার পুরো বিচারিক কার্যক্রম, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ডিএনএ প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, জব্দ আলামত, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ- সবকিছু পর্যালোচনা করেন। তার ভাষায়, এটি মূলত মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ওপর উচ্চ আদালতের বাধ্যতামূলক বিচারিক নজরদারি। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার/ ছবি: সংগৃহীত হাইকোর্ট কেমন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন এই আইনজীবী জাগো নিউজকে বলেন, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে হাইকোর্ট কয়েক ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। চাইলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন। আবার পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অন্য কোনো সাজাও দিতে পারেন। কোনো ক্ষেত্রে প্রমাণের ঘাটতি পাওয়া গেলে খালাসের আদেশও দিতে পারেন। ‘তাই ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পরও মামলার ভাগ্য পুরোপুরি নির্ধারিত হয়ে যায় না। হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,’ যোগ করেন তিনি। আরও পড়ুন ধর্ষণ ও হত্যা / শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারে দয়ার সুযোগ নেই: রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এরপর যাবে আপিল বিভাগে হাইকোর্টের রায়ের পরও মামলাটির বিচারিক পথ শেষ হবে না। এতে দেওয়া সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপক্ষ কিংবা আসামিপক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে তারা আপিল বিভাগে যেতে পারবেন। সেখানে মামলার আইনগত ও বিচারিক বিষয়গুলো পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে বলে জানান অ্যাডভোকেট ফাহমিদা। তিনি বলেন, আপিল বিভাগের রায়ই সাধারণত মামলার চূড়ান্ত বিচারিক অবস্থান নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট ফাহমিদা আক্তার রিংকি/ছবি: জাগো নিউজ রিভিউয়ের সুযোগও থাকবে আইন অনুযায়ী আপিল বিভাগের রায়ের পরও দণ্ডিত ব্যক্তির সামনে আরেকটি সুযোগ থাকে। এই ধাপটি সম্পর্কে ফাহমিদা আক্তার রিংকি বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায়। আদালত সেই আবেদন শুনে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারেন কিংবা প্রয়োজন হলে নতুন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। শেষ সুযোগ প্রাণভিক্ষা বিচারিক সব ধাপ শেষ হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সামনে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও রিভিউ নিষ্পত্তির পর দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রাখেন বলে জানান অ্যাডভোকেট ফাহমিদা। আরও পড়ুন ৪১ মিনিট ধরে রায় পড়ে শোনান বিচারক, এজলাসে নীরব সোহেল-স্বপ্না সব ধাপ শেষ হলেই কার্যকর হবে রায় এই আইনজীবী উল্লেখ করেন, বিচারিক এবং সাংবিধানিক সব প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সুযোগ নেই। হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স, আপিল বিভাগে আপিল ও রিভিউ আবেদন এবং প্রাণভিক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত- সব কিছু সম্পন্ন হওয়ার পরই দণ্ড কার্যকরের আইনগত পথ উন্মুক্ত হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পল্লবীর শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত এ মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালতেও দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। এমডিএএ/একিউএফ
Go to News Site