Jagonews24
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেক্সিকো। এবার কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে দেশটি। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপ আয়োজনের অনন্য কীর্তি গড়বে মেক্সিকো। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম নিয়মিত অংশগ্রহণকারী দেশ মেক্সিকো এবার খেলতে যাচ্ছে তাদের ১৮তম বিশ্বকাপ। স্বাগতিক হিসেবে মাঠে নামার বাড়তি সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইতিহাসের সেরা সাফল্য অর্জনের স্বপ্ন দেখছে ‘এল ত্রিকোলর’। কোয়ার্টার ফাইনালই এখন পর্যন্ত সেরা অর্জন বিশ্বকাপে মেক্সিকোর সেরা সাফল্য এসেছে নিজেদের মাটিতেই। ১৯৭০ ও ১৯৮৬- দুই আসরেই তারা পৌঁছেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। ১৯৭০ সালে রাউল কার্দেনাসের অধীনে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর শেষ আটে ইতালির কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়। আর ১৯৮৬ সালে বোরা মিলুতিনোভিচের কোচিংয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ১২০ মিনিট গোলশূন্য ড্র করার পর টাইব্রেকারে হারতে হয়েছিল মেক্সিকানদের। এবার স্বাগতিক সমর্থকদের উন্মাতাল সমর্থনকে পুঁজি করে সেই কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পেরিয়ে আরও দূরে যাওয়ার লক্ষ্য তাদের। অভিজ্ঞ আগুইরের কাঁধে দায়িত্ব বর্তমান কোচ হাভিয়ের আগুইরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৃতীয়বারের মতো মেক্সিকো জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ২০০২ ও ২০১০ বিশ্বকাপেও দলটির কোচ ছিলেন। ২০০২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২-০ গোলে এবং ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তার দলকে। ২০২৫ সালের মার্চে আগুইরে বলেছিলেন, `আমাদের সবার লক্ষ্য একটাই- মেক্সিকোর ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ উপহার দেওয়া।‘ `এল ভাসকো‘ নামে পরিচিত এই অভিজ্ঞ কোচ শুধু মাঠের সাফল্য নয়, জাতীয় দলের জার্সির প্রতি খেলোয়াড়দের আবেগ ও গর্বও ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন। তার সহকারী হিসেবে আছেন মেক্সিকোর কিংবদন্তি সাবেক অধিনায়ক রাফায়েল মার্কেজ। বিশ্বকাপের বিশাল অভিজ্ঞতা এবং বার্সেলোনার রিজার্ভ দলের কোচ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা দিয়ে দলকে সহায়তা করছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্বও পেতে পারেন মার্কেজ। বিশ্বকাপ ২০২৬-এ মেক্সিকোর গ্রুপ ও সূচি গ্রুপ ‘এ’-তে খেলবে মেক্সিকো। গ্রুপে বাকি তিন প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। ম্যাচগুলোর সূচি * ১১ জুন, বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা, ভেন্যু: মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম (আজতেকা)* ১৮ জুন, বনাম দক্ষিণ কোরিয়া, ভেন্যু: এস্তাদিও গুয়াদালাহারা* ২৪ জুন, বনাম চেক প্রজাতন্ত্র, ভেন্যু: মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম (আজতেকা) দলে একসঙ্গে দুই প্রজন্ম হাভিয়ের আগুইরের ঘোষিত স্কোয়াডে সবচেয়ে আলোচিত দুটি নাম দুই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছে। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গুইলার্মো ওচোয়া খেলতে যাচ্ছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, যা মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে বিরল অর্জন। অন্যদিকে মাত্র ১৭ বছর বয়সী গিলবার্তো মোরা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মেক্সিকোর ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার। কিভাবে বিশ্বকাপে জায়গা পেল মেক্সিকো? ২০২৬ বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ হিসেবে সরাসরি জায়গা পেয়েছে মেক্সিকো। তাদের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল পর্বে খেলবে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রও। এবারের বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে এই টুর্নামেন্টে। বিশ্বকাপে মেক্সিকোর ইতিহাস * কনফেডারেশন: কনকাকাফ* প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০* সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২* সেরা ফলাফল: কোয়ার্টার ফাইনাল (১৯৭০ ও ১৯৮৬)* মোট অংশগ্রহণ: ১৮ বার (১৯৩০, ১৯৫০, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬)।* টানা বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড: ১৯৯৪ সাল থেকে টানা ৯টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। বিশ্বকাপে মোট রেকর্ড:* ম্যাচ: ৬০* জয়: ১৭* ড্র: ১৫* হার: ২৮* গোল করেছে: ৬২* গোল হজম: ১০১ প্রথম বিশ্বকাপের গল্প ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল মেক্সিকো। ফ্রান্স, চিলি ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচই হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। তবে সেই আসরেই ইতিহাস গড়েন হুয়ান কারেনিও। ফ্রান্সের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানে হারের ম্যাচে তিনি করেন মেক্সিকোর প্রথম বিশ্বকাপ গোল। কাতার বিশ্বকাপের হতাশা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল মেক্সিকোর জন্য হতাশার। গ্রুপ ‘সি’-তে পোল্যান্ডের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করার পর আর্জেন্টিনার কাছে ২-০ গোলে হারে তারা। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবকে ২-১ গোলে হারালেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। ১৯৭৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরোতে ব্যর্থ হয় মেক্সিকো। বিশ্বকাপে মেক্সিকোর সর্বোচ্চ গোলদাতা বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে আছেন দুই ফুটবলার- লুইস হার্নান্দেজ: ৪ গোল। ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন ‘এল মাতাদর’ খ্যাত লুইস হার্নান্দেজ। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল এবং জার্মানির বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা চারটিতে নিয়ে যান। হাভিয়ের ‘চিচারিতো’ হার্নান্দেজ : ৪ গোল। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোল করে আলোচনায় আসেন চিচারিতো। ২০১৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এবং ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা চারটিতে নিয়ে যান তিনি। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড মেক্সিকোর হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কিংবদন্তি ডিফেন্ডার রাফায়েল মার্কেজ। তিনি বিশ্বকাপে মোট ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন। ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ এবং ২০১৮- পাঁচটি বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন মার্কেজ। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি। স্মরণীয় মুহূর্ত: ১৯৮৬ বিশ্বকাপ মেক্সিকান ফুটবল সমর্থকদের কাছে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ আজও বিশেষ আবেগের। স্বাগতিক হিসেবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল দলটি। শেষ ষোলোতে বুলগেরিয়াকে ২-০ গোলে হারানোর ম্যাচে ম্যানুয়েল নেগ্রেতের অসাধারণ সিজর কিক গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের। ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২০ মিনিটের মধ্যেই ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল মেক্সিকো। ম্যাচের ৭৫ মিনিটে রিকার্দো পেলায়েজ ব্যবধান কমান। এরপর যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে লুইস হার্নান্দেজ গোল করে ২-২ সমতা ফেরান। নাটকীয় সেই ড্রয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছিল মেক্সিকো। বিশ্বকাপে মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় জয় বিশ্বকাপে মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় জয় আসে ১৯৭০ সালে নিজেদের মাঠে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে এল সালভাদরকে ৪-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। হ্যাভিয়ের ভালদিভিয়া করেছিলেন জোড়া গোল। এছাড়া গোল করেছিলেন হাভিয়ের ফ্রাগোসো ও ইগনাসিও বাসাগুরেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়। ২০২৬-এ নতুন ইতিহাসের অপেক্ষা তিনবারের বিশ্বকাপ আয়োজক হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়তে যাওয়া মেক্সিকোর সামনে এবার আরও বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাগতিক সমর্থন, অভিজ্ঞ কোচ হাভিয়ের আগুইরে এবং তরুণ-অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া দল নিয়ে ‘এল ত্রিকোলর’ এবার ভাঙতে চায় কোয়ার্টার ফাইনালের অভিশাপ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল, এমনকি শিরোপার স্বপ্নও দেখছে উত্তর আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তিটি।
Go to News Site