Jagonews24
শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। এদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতি। শিশুরা যেমন বড় হয়ে পরিবারের হাল ধরে এবং বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটায়, তেমনি একটা জাতির ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ঠিক সে রকমই। ভবিষ্যতে বড় হয়ে তারা জাতির মুখ উজ্জ্বল করবে এটাই সবার কামনা। তবে সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার আগে তাদেরকে শরীর-স্বাস্থ্যে, জ্ঞান-গরিমায় ও মন-মননে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠতে হবে। শিশুদের পক্ষে নিজে নিজে এভাবে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়, এজন্য চাই বাবা-মা, পরিবারের সদস্যবর্গ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা। শিশুদের ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য দরকার তাদের পরিমিত খাবার, খেলাধুলার সুব্যবস্থা, শিক্ষা-দীক্ষার জন্য ভালো স্কুল ও শিক্ষাকার্যক্রম এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য আইন ও তার বাস্তবায়ন। আমাদের দেশে এসব ক্ষেত্রে নানা ঘাটতি তো রয়েছেই, এমনকি তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনেও রয়েছে অন্তরায়। এর সঙ্গে ইদানীং যোগ হয়েছে শিশু নির্যাতন-নিপীড়ন। আর তাতে জীবন যাচ্ছে অনেকের। ইদানীং দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু নির্যাতনের এমন কিছু লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে যা ভাষায় বর্ণনা করাও কঠিন। শরীর-স্বাস্থ্যে কচিপ্রাণ, বুদ্ধিতে অপরিণত এবং প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন শিশুরা সহজেই সমাজের বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রাণও হারাচ্ছে। শিশুরা সমাজে নির্যাতিত হয় নানাভাবে। পরিবারের কলহ, সামাজিক ঝগড়া-বিবাদ ও পিতা-মাতার সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে, দুশ্চরিত্র ও মানসিক বিকারগ্রস্ত বড়দের লালসার শিকার হয়ে, দারিদ্র্যের কারণে অন্যের বাসা-বাড়ি বা কলকারখানায় কাজ করতে গিয়ে এবং অপহরণের শিকার হয়ে শিশুরা প্রাণ হারায়। পাঠকদের অবগতির জন্য নিচে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো- রাজধানী পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। এই শিশুটিসহ মে মাসেই দেশে ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী ও শিশু। নিষ্পাপ হাসি আর এক বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠছিল শিশুটি। তার হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন পেনসিল আর রূপকথার বই। কিন্তু এক নির্মম হিংস্রতা কেড়ে নেয় ছোট্ট এই শিশুর জীবন। ২৪ মে চার্জশিট দাখিলের পর মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যেই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। দ্রুত মামলাটি নিষ্পত্তি করে বিচারিক আদালত। গত রোববার (৭ জুন) সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয় পল্লবী শিশু হত্যা মামলার দুই আসামিকে। পরে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামিকেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। মামলার রায় এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী এ মামলার পরবর্তী কার্যক্রম হাইকোর্ট বিভাগে যাবে। এরপর আপিল বিভাগে যাবে। পরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে কি না, সেটিও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ।’ আরও পড়ুন ২০০ বছর আগের এক দুর্ঘটনা থেকেই দেয়াশলাইর আবিষ্কার আর কত ইরা, আছিয়া, রামিসা গেলে বিচার পাবো? বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ জানান, আসামি সোহেল রানা এর আগে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘বিচারকার্য চলাকালে ৩৪২ ধারার জবানবন্দি গ্রহণের পর্যায়ে আদালত আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেন। এ সময় তার পক্ষে কোনো সাক্ষী উপস্থাপন করা হবে কি-না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ১ম আসামি নিজেকে দোষী বলে স্বীকার করেন এবং আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।’ আদালতের রায় সম্পর্কে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী জানান, সোহেল যে অপরাধ করেছে সেজন্য আদালত তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। একই অপরাধে অপরাধীকে বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। রায়ের পর সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করেন আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি দাবি করেন, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সবাই চাই আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন হোক যেন এ ধরনের জঘন্যতম অপরাধকে আমরা রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে ফেলতে পারি।’ অটর্নি জেনারেল জানান, মামলাটি উচ্চ আদালতে আসলে দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবে রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, রায়ের নথি বা রেকর্ড হাতে পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ে মামলার শুনানির ব্যবস্থা করাই অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের অবস্থান। তিনি বলেন, ‘এ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হলে পেপারবুক প্রস্তুত করা হবে, যাতে উচ্চ আদালতে মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়। পল্লবী শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ দমনে মাইলফলক হয়ে টিকে থাকবে বলেও জানান রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা। অপরদিকে জজের বাসায় কাজের মেয়ে নির্যাতনের ঘটনায় দেখা যায়, যিনি বিচারের মানদন্ড নিয়ে তার পেশায় নিয়োজিত আছেন, তিনি নিজেও শিশুটিকে নির্যাতন করেছেন এবং তার স্ত্রীর এ রকম অপরাধকর্মে প্রতিবন্ধক হননি। সমাজের কারো কাছে এটা প্রত্যাশিত নয়। মাগুরায় শিশু মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দেখা যায়, রাজনৈতিক গোলযোগের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন মা ও গর্ভের শিশু। গুলিবর্ষণকারীরা বিবেকবান হলে এই ঘটনা এড়ানো যেতো। জানা যায়, জেনে বুঝেই এই অপরাধীরা শিশুটির মাকে গুলি করে। পরিশেষে বলা যায়, আমাদের সমাজ এখনও শিশুর জন্য পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কিন্তু কীভাবে এই বিশ্বে শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া যায়? এ নিয়ে ভাবতে হবে সমাজবিজ্ঞানী ও সমাজপতিদের। বন্ধ করতে হবে সব ধরনের শিশু নির্যাতন। তবে এ ক্ষেত্রে একেবারে সাদামাটাভাবে যা বলা যায় তাহলো মানুষের মধ্যে সুকুমারবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। এটা ঘটাতে হলে চাই আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক বন্ধন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সর্বোপরি মানুষের মধ্যে শেষ বিচারক ও মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ব্যাপারে ভয় সৃষ্টি করা, কেননা আমাদের ছোট-বড় সব কাজের জন্য মহান আল্লাহর কাছে একদিন জবাবদিহি করতে হবে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী শুধু চলতি বছরের মে মাসেই ৮৩ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যার মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী ও শিশুই বয়স ১৮ বছরের নিচে। তবে ‘পল্লবী শিশু হত্যা’ অভিযোগ গঠনের পর থেকে মাত্র পাঁচ কার্যদিবস পরই আলোচিত এ হত্যা মামলার রায়। যা দেশের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সবার চাওয়া পল্লবী নির্যাতিত শিশুর মতো অন্যান্য মামলাগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। কেএসকে
Go to News Site